১ম অধ্যায়: ৩য় পরিচ্ছেদ: ১. (হাদিসে কুদসি, মারফু’, মাওকুফ ও মাকতু’) | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

اَلْفَصْلُ الثَّالِثُ: خَبَرُ الْآحَادِ الْمُشْتَرَكُ بَيْنَ الْمَقْبُوْلِ وَالْمَرْدُوْدِ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: মাকবূল ও মারদূদ উভয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত খবরে আহাদ

অনুবাদকের কথা

পূর্ববর্তী দুটি পরিচ্ছেদে আমরা খবরকে দুটি দিক থেকে ভাগ করেছি: প্রথমত রাবী সংখ্যার ভিত্তিতে (মাশহূর, আযীয, গরীব), দ্বিতীয়ত গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে (মাকবূল ও মারদূদ)। এই তৃতীয় পরিচ্ছেদে এমন কিছু প্রকারের হাদীস আলোচিত হবে যেগুলো মাকবূল বা মারদূদ উভয়ই হতে পারে; অর্থাৎ এগুলো কোনো একটি শ্রেণিতে নির্দিষ্ট নয়। এই পরিচ্ছেদে দুটি মাবহাস:

প্রথম মাবহাস: হাদীসকে যাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে তার ভিত্তিতে প্রকারভেদ (কুদসী, মারফূ’, মাওকূফ, মাকতূ’)।

দ্বিতীয় মাবহাস: কবুল (গ্রহণযোগ্য) এবং মারদুদ (বর্জনীয়) উভয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য প্রকারভেদ। (মুসনাদ, মুত্তাসীল, যিয়াদাতুস সিকাত)।

اَلْمَبْحَثُ الْأَوَّلُ: تَقْسِيْمُ الْخَبَرِ بِالنِّسْبَةِ إِلَى مَنْ أُسْنِدَ إِلَيْهِ

প্রথম মাবহাস: যাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে তার ভিত্তিতে খবরের প্রকারভেদ


হাদীসে কুদসী

اَلْحَدِيْثُ الْقُدْسِيّ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: قُدْسِيّ কুদসী শব্দটি اَلْقُدْس কুদস-এর দিকে সম্বন্ধিত, যার অর্থ পবিত্রতা।[১৪৩] অর্থাৎ পবিত্র সত্তা, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে সম্বন্ধিত হাদীস।

(খ) পারিভাষিক অর্থ: নবী ﷺ থেকে বর্ণিত সেই হাদীস যা তিনি তাঁর রব আযযা ওয়া জাল্লার দিকে সম্বন্ধ করেছেন।[১৪৪]

কুরআন ও হাদীসে কুদসীর পার্থক্য

اَلْفَرْقُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْقُرْآنِ

উভয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ পার্থক্যগুলো:

বিষয় কুরআন হাদীসে কুদসী
শব্দ ও অর্থ শব্দ ও অর্থ উভয়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে, শব্দ নবী ﷺ-এর পক্ষ থেকে
তিলাওয়াতে ইবাদত তিলাওয়াত করলে ইবাদত হয় তিলাওয়াত করলে ইবাদত হয় না
প্রমাণিত হওয়ার শর্ত তাওয়াতুর শর্ত তাওয়াতুর শর্ত নয়

হাদীসে কুদসীর সংখ্যা

عَدَدُ الْأَحَادِيْثِ الْقُدْسِيَّةِ

নাবাবী হাদীসের তুলনায় হাদীসে কুদসীর সংখ্যা বেশি নয়। এর সংখ্যা প্রায় দুইশত।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
হাদীসে কুদসীর উদাহরণ

মুসলিম তাঁর সহীহে আবূ যর রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে, নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেন; তিনি আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ বলেন:

يَا عِبَادِيْ إِنِّيْ حَرَّمْتُ الظُّلْمَ عَلَى نَفْسِيْ، وَجَعَلْتُهُ بَيْنَكُمْ مُحَرَّمًا، فَلَا تَظَالَمُوْا …

“হে আমার বান্দারা! আমি যুলমকে আমার নিজের উপর হারাম করেছি এবং তোমাদের মাঝেও হারাম করেছি, সুতরাং তোমরা পরস্পরের উপর যুলম করো না…”[১৪৫]

বর্ণনার শব্দ (সীগাহ)

صِيَغُ رِوَايَتِهِ

হাদীসে কুদসীর বর্ণনাকারী দুটি শব্দের যে কোনো একটিতে বর্ণনা করতে পারেন:

প্রথম সীগাহ

قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ فِيْمَا يَرْوِيْهِ عَنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ

“রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর রব আযযা ওয়া জাল্ল থেকে যা বর্ণনা করেন তাতে বলেছেন…”

দ্বিতীয় সীগাহ

قَالَ اللهُ تَعَالَى، فِيْمَا رَوَاهُ عَنْهُ رَسُوْلُهُ ﷺ

“আল্লাহ তাআলা বলেন, তাঁর রাসূল ﷺ যা তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন তাতে…”

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আল-ইতহাফাতুস সানিয়্যাহ বিল আহাদীসিল কুদসিয়্যাহ (اَلْإِتْحَافَاتُ السَّنِيَّةُ بِالْأَحَادِيْثِ الْقُدْسِيَّةِ)

আব্দুর রঊফ আল-মুনাবী রহিমাহুল্লাহ

এতে ২৭২টি হাদীস সংকলিত।


মারফূ’

اَلْمَرْفُوْعُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مَرْفُوْع মারফূ’ শব্দটি ইসমে মাফঊল, رَفَعَ (উত্তোলন করা, ওয়াদা’-এর বিপরীত) থেকে উদ্ভূত। উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি, অর্থাৎ নবী ﷺ-এর দিকে সম্বন্ধিত হওয়ার কারণে একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।

(খ) পারিভাষিক অর্থ: নবী ﷺ-এর দিকে সম্বন্ধিত কথা, কাজ, তাকরীর (অনুমোদন) বা গুণ-বৈশিষ্ট্য।[১৪৬]

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ যা নবী ﷺ-এর দিকে সম্বন্ধ বা ইসনাদ করা হয়েছে; সেটি তাঁর কথা হোক, কাজ হোক, তাকরীর (অনুমোদন) হোক বা গুণ-বৈশিষ্ট্য হোক। সম্বন্ধকারী সাহাবী হোক বা তাঁর পরবর্তী কেউ হোক; সনদ মুত্তাসিল (সংযুক্ত) হোক বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) হোক। সুতরাং মারফূ’র মধ্যে মাওসূল, মুরসাল, মুত্তাসিল ও মুনকাতি’ সবই অন্তর্ভুক্ত। এটিই মারফূ’র প্রসিদ্ধ পরিচিতি।

প্রকারভেদ ও উদাহরণ

أَنْوَاعُهُ وَأَمْثِلَتُهُ

মারফূ’ কাওলী (কথাগত)

সাহাবী বা অন্য কেউ বলেন: “রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন বলেছেন…”

মারফূ’ ফি’লী (কর্মগত)

সাহাবী বা অন্য কেউ বলেন: “রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন করেছেন…”

মারফূ’ তাকরীরী (অনুমোদনমূলক)

সাহাবী বা অন্য কেউ বলেন: “নবী ﷺ-এর উপস্থিতিতে এমন করা হয়েছে”, এবং তিনি সেই কাজে আপত্তি করেছেন বলে বর্ণনা করেন না।

মারফূ’ ওয়াসফী (গুণগত)

সাহাবী বা অন্য কেউ বলেন: “রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।”


মাওকূফ

اَلْمَوْقُوْفُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مَوْقُوْف মাওকূফ শব্দটি ইসমে মাফঊল, وَقْف (থামানো) থেকে উদ্ভূত। যেন রাবী হাদীসটিকে সাহাবীর কাছে থামিয়ে দিয়েছেন এবং সনদের বাকি শৃঙ্খল অনুসরণ করেননি।

(খ) পারিভাষিক অর্থ: সাহাবীর দিকে সম্বন্ধিত কথা, কাজ বা তাকরীর (অনুমোদন)।[১৪৭]

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ এক বা একাধিক সাহাবীর দিকে সম্বন্ধিত কথা, কাজ বা তাকরীর। তাঁদের দিকে সনদ মুত্তাসিল (সংযুক্ত) হোক বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) হোক।

উদাহরণ

أَمْثِلَة

মাওকূফ কাওলী (কথাগত)

রাবী বলেন: আলী ইবনু আবী তালিব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “حَدِّثُوا النَّاسَ بِمَا يَعْرِفُوْنَ، أَتُرِيْدُوْنَ أَنْ يُكَذَّبَ اللهُ وَرَسُوْلُهُ” “মানুষকে তাই বলো যা তারা বুঝতে পারে। তোমরা কি চাও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মিথ্যা বলা হোক?”[১৪৮]

মাওকূফ ফি’লী (কর্মগত)

বুখারী বলেন: “ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা তায়াম্মুম অবস্থায় ইমামতি করেছেন।”[১৪৯]

মাওকূফ তাকরীরী (অনুমোদনমূলক)

কোনো তাবিঈ বলেন: “আমি কোনো একজন সাহাবীর সামনে এমন কাজ করেছি, তিনি আপত্তি করেননি।”

মাওকূফের অন্য ব্যবহার

اِسْتِعْمَالٌ آخَرُ لَهُ

মাওকূফ নামটি সাহাবী ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়, তবে সীমাবদ্ধ করে। যেমন বলা হয়: “এটি এমন হাদীস যা অমুক যুহরীর উপর মাওকূফ করেছেন”, বা “আতার উপর মাওকূফ করেছেন”[১৫০] ইত্যাদি।

খুরাসানী ফুকাহার পরিভাষা

اِصْطِلَاحُ فُقَهَاءِ خُرَاسَانَ
খুরাসানী ফুকাহার মতে

মারফূ’ = খবর (خَبَر)

মাওকূফ = আসার (أَثَر)

মুহাদ্দিসগণের মতে

মারফূ’ ও মাওকূফ উভয়কেই “আসার” বলা হয়; কারণ এটি “أَثَرْتُ الشَّيْءَ” (আমি বিষয়টি বর্ণনা করলাম) থেকে উদ্ভূত।

হুকমান মারফূ’ (বিধানগতভাবে মারফূ’) সংক্রান্ত শাখা-প্রশাখা

فُرُوْعٌ تَتَعَلَّقُ بِالْمَرْفُوْعِ حُكْمًا

মাওকূফের কিছু আকৃতি শব্দে ও বাহ্যিক রূপে মাওকূফ, কিন্তু সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে প্রকৃতপক্ষে এগুলো মারফূ’ হাদীসের অর্থ বহন করে। তাই উলামায়ে কিরাম এগুলোকে اَلْمَرْفُوْعُ حُكْمًا আল-মারফূ’ হুকমান (বিধানগতভাবে মারফূ’) নামে অভিহিত করেছেন; অর্থাৎ শব্দে মাওকূফ, বিধানে মারফূ’।

এর কিছু আকৃতি:

সাহাবী (যিনি আহলে কিতাব থেকে গ্রহণকারী হিসেবে পরিচিত নন) এমন কথা বলেন যাতে ইজতিহাদের অবকাশ নেই এবং ভাষার ব্যাখ্যা বা দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যার সাথে সম্পর্কিত নয়

যেমন: ১. অতীত বিষয়ে সংবাদ (সৃষ্টির সূচনা ইত্যাদি)। ২. ভবিষ্যৎ বিষয়ে সংবাদ (মালাহিম, ফিতান, কিয়ামতের অবস্থা)। ৩. নির্দিষ্ট আমলে নির্দিষ্ট সওয়াব বা শাস্তির সংবাদ; যেমন: “যে ব্যক্তি অমুক করবে তার জন্য অমুক সওয়াব।”

সাহাবী এমন কাজ করেন যাতে ইজতিহাদের অবকাশ নেই

যেমন: আলী রদিয়াল্লাহু আনহু সূর্যগ্রহণের সালাতে প্রতিটি রাকাআতে দুইয়ের অধিক রুকূ করা।

সাহাবী জানান যে তাঁরা এমন বলতেন বা করতেন

১. নবী ﷺ-এর যুগে বলে উল্লেখ করলে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী মারফূ’; যেমন জাবির রদিয়াল্লাহু আনহুর উক্তি: “আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে আযল (coitus interruptus) করতাম।”[১৫১]

২. নবী ﷺ-এর যুগে বলে উল্লেখ না করলে জমহূরের মতে মাওকূফ; যেমন জাবিরের উক্তি: “আমরা যখন উপরে উঠতাম তাকবীর দিতাম, আর যখন নিচে নামতাম তাসবীহ বলতাম।”[১৫২]

সাহাবী বলেন: “আমাদেরকে এমন আদেশ করা হয়েছে”, বা “আমাদেরকে এমন থেকে নিষেধ করা হয়েছে”, বা “সুন্নাত হলো এমন”

যেমন: “বিলালকে আদেশ করা হয়েছে আযানে জোড়া জোড়া এবং ইকামাতে বেজোড় বলতে।”[১৫৩] “আমাদেরকে জানাযার অনুসরণ থেকে নিষেধ করা হয়েছে, তবে কঠোরভাবে নয়।”[১৫৪] “সুন্নাত হলো কুমারীকে বিয়ে করলে তার কাছে সাত দিন থাকা।”[১৫৫]

রাবী সাহাবী উল্লেখের সময় চারটি শব্দের কোনো একটি ব্যবহার করেন: “ইয়ারফাউহু”, “ইয়ানমীহি”, “ইয়াবলুগু বিহী”, বা “রিওয়ায়াতান”

যেমন: আ’রাজ আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে “রিওয়ায়াতান” শব্দে বর্ণনা করেন: “لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تُقَاتِلُوْا قَوْمًا صِغَارَ الْأَعْيُنِ” “কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না তোমরা ছোট চোখবিশিষ্ট একটি জাতির সাথে যুদ্ধ করবে।”[১৫৬]

সাহাবী এমন তাফসীর করেন যা কোনো আয়াতের নুযূলের কারণের (সাবাবুন নুযূল) সাথে সম্পর্কিত

যেমন জাবির রদিয়াল্লাহু আনহুর উক্তি: “ইয়াহূদীরা বলত: কেউ তার স্ত্রীর সাথে পেছন থেকে সামনে মিলিত হলে সন্তান ট্যারা হয়। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন: {نِسَاؤُكُمْ حَرْثٌ لَكُمْ}…”[১৫৭]

মাওকূফ দিয়ে কি দলীল গ্রহণ করা যায়?

هَلْ يُحْتَجُّ بِالْمَوْقُوْفِ؟

মাওকূফ সহীহ, হাসান বা দঈফ হতে পারে। কিন্তু সিহহাত প্রমাণিত হলেও কি এর উপর আমল করা ওয়াজিব?

মূলনীতি হলো: মাওকূফের উপর আমল করা ওয়াজিব নয়; কারণ এগুলো সাহাবীগণের কথা ও কাজ (নবী ﷺ-এর কথা ও কাজ নয়)। তবে এগুলো প্রমাণিত হলে কিছু দঈফ হাদীসকে শক্তিশালী করে; যেমনটি মুরসালের আলোচনায় এসেছে; কারণ সাহাবীগণের সাধারণ অবস্থা ছিল সুন্নাত অনুযায়ী আমল করা।

তবে যেগুলো “হুকমান মারফূ'” (বিধানগতভাবে মারফূ’), সেগুলো মারফূ’ হাদীসের মতোই হুজ্জত (দলীল) এবং এর উপর আমল করা ওয়াজিব।


মাকতূ’

اَلْمَقْطُوْعُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مَقْطُوْع মাকতূ’ শব্দটি ইসমে মাফঊল, قَطَعَ (কাটা, ওয়াসালা-এর বিপরীত) থেকে উদ্ভূত।

(খ) পারিভাষিক অর্থ: তাবিঈ বা তাঁর পরবর্তী কারো দিকে সম্বন্ধিত কথা বা কাজ।[১৫৮]

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ তাবিঈ, তাবি’ত তাবিঈন বা তাঁদের পরবর্তী কারো দিকে সম্বন্ধিত কথা বা কাজ।

মাকতূ’ ও মুনকাতি’ এক নয়

মাকতূ’ মতনের বিশেষণ (মতন কার কথা বা কাজ), আর মুনকাতি’ সনদের বিশেষণ (সনদ সংযুক্ত কি না)। অর্থাৎ মাকতূ’ হাদীস তাবিঈ বা তাঁর পরবর্তীর কথা; তাবিঈ পর্যন্ত সনদ মুত্তাসিল (সংযুক্ত) হতেই পারে। পক্ষান্তরে মুনকাতি’ মানে সনদ বিচ্ছিন্ন; মতনের সাথে এর সম্পর্ক নেই।

উদাহরণ

أَمْثِلَة

মাকতূ’ কাওলী (কথাগত)

হাসান বাসরী রহিমাহুল্লাহ বিদআতীর পেছনে সালাত সম্পর্কে বলেন: “صَلِّ وَعَلَيْهِ بِدْعَتُهُ” “তুমি সালাত পড়ো, তার বিদআতের দায় তার উপর।”[১৫৯]

মাকতূ’ ফি’লী (কর্মগত)

ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনুল মুনতাশির বলেন: “মাসরূক তাঁর ও তাঁর পরিবারের মধ্যে পর্দা ফেলে দিতেন, তারপর তাঁর সালাতে মনোযোগ দিতেন এবং তাদেরকে তাদের দুনিয়ায় ছেড়ে দিতেন।”[১৬০]

দলীল গ্রহণের হুকুম

حُكْمُ الْاِحْتِجَاجِ بِهِ

মাকতূ’ দিয়ে শরঈ আহকামে দলীল গ্রহণ করা যায় না, যদিও এর নিসবাত (সম্বন্ধ) বক্তার দিকে সঠিকভাবে প্রমাণিত হয়; কারণ এটি কোনো একজন মুসলিমের কথা বা কাজ। তবে যদি মারফূ’ হওয়ার কারীনাহ (সূচক) থাকে, যেমন কোনো রাবী তাবিঈর নাম উল্লেখের সময় “ইয়ারফাউহু” ইত্যাদি বলেন, তাহলে এটি “হুকমান মারফূ’ মুরসাল” (বিধানগতভাবে মারফূ’ মুরসাল) গণ্য হবে।

মুনকাতি’র অর্থে মাকতূ’র ব্যবহার

إِطْلَاقُهُ عَلَى الْمُنْقَطِعِ

কিছু মুহাদ্দিস (যেমন ইমাম শাফিঈ ও তবারানী) “মাকতূ'” শব্দটি ব্যবহার করে “মুনকাতি'” বুঝিয়েছেন, অর্থাৎ যার সনদ সংযুক্ত নয়। এটি অপ্রসিদ্ধ পরিভাষা।

শাফিঈর ক্ষেত্রে বলা যায়: তিনি পরিভাষা স্থিতিশীল হওয়ার আগে কথাটি বলেছেন। তবে তবারানীর ক্ষেত্রে এটি পরিভাষায় শিথিলতা হিসেবে গণ্য হবে।

মাওকূফ ও মাকতূ’র মাযান্ন (প্রাপ্তিস্থান)

مِنْ مَظَنَّاتِ الْمَوْقُوْفِ وَالْمَقْطُوْعِ

মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ (مُصَنَّفُ ابْنِ أَبِيْ شَيْبَةَ)

মুসান্নাফ আব্দির রাযযাক (مُصَنَّفُ عَبْدِ الرَّزَّاقِ)

তাফসীরে ইবনু জারীর, ইবনু আবী হাতিম ও ইবনুল মুনযির

পাদটীকা

[১৪৩] আল-কামূস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪৮।

[১৪৪] আর-রিসালাতুল মুস্তাতরাফাহ, পৃষ্ঠা ৮১; কাওয়াইদুত তাহদীস, পৃষ্ঠা ৬৫।

[১৪৫] মুসলিম, কিতাবুল বিররি ওয়াস সিলাহ; ৪/১৯৯৪, হাদীস নং ৫৫ (এই শব্দে)।

[১৪৬] উলূমুল হাদীস, মা’রিফাতুল মারফূ’, পৃষ্ঠা ৪৫ (অনুরূপ অর্থে)।

[১৪৭] দেখুন: উলূমুল হাদীস, মা’রিফাতুল মাওকূফ, পৃষ্ঠা ৪৬।

[১৪৮] বুখারী, কিতাবুল ইলম; ১/২২৫, হাদীস নং ৪৯ (এই শব্দে)।

[১৪৯] বুখারী, কিতাবুত তায়াম্মুম, অধ্যায়: পবিত্র মাটি মুসলিমের ওযূ; ১/৪৪৬।

[১৫০] যুহরী ও আতা উভয়ে তাবিঈ।

[১৫১] বুখারী, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস নং ৫২০৭। মুসলিম, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস নং ১৩৭।

[১৫২] বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ২৯৯৩ (এই শব্দে)।

[১৫৩] বুখারী, কিতাবুল আযান, হাদীস নং ৬০৭। মুসলিম, কিতাবুস সালাত, হাদীস নং ২।

[১৫৪] বুখারী, কিতাবুল জানাইয, হাদীস নং ১২৭৮। মুসলিম, কিতাবুল জানাইয, হাদীস নং ৩৫।

[১৫৫] বুখারী, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস নং ৫২১৪।

[১৫৬] বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস নং ২৯২৯।

[১৫৭] মুসলিম, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস নং ১১৭ (অনুরূপ অর্থে)।

[১৫৮] দেখুন: আন-নুখবাহ, পৃষ্ঠা ৫৯। তাবিঈ: যিনি সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন মুসলিম অবস্থায় এবং ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ করেছেন।

[১৫৯] বুখারী, কিতাবুল আযান, অধ্যায়: ফিতনায় পড়া ও বিদআতী ব্যক্তির ইমামতি; ২/১৮৮।

[১৬০] আবূ নুআইম, হিলয়াতুল আওলিয়া; খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৯৬।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading