১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: ক.মাকবুল হাদিস: (সহীহ লিগয়রিহী ও হাসান লিগয়রিহী) | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

সহীহ লিগয়রিহী (অন্যের সহায়তায় সহীহ)

اَلصَّحِيْحُ لِغَيْرِهِ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

হাসান লিযাতিহী হাদীস যদি তার সমপর্যায়ের বা তার চেয়ে শক্তিশালী অন্য সূত্রেও বর্ণিত হয়, তাহলে সেটি সহীহ লিগয়রিহী।[৪৪]

একে “সহীহ লিগয়রিহী” বলা হয় কারণ সিহহাত (বিশুদ্ধতা) মূল সনদ থেকে আসেনি, বরং এসেছে অন্য সনদের যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে।

সূত্র

হাসান লিযাতিহী + হাসান লিযাতিহী = সহীহ লিগয়রিহী

মর্যাদা

مَرْتَبَتُهُ

এটি হাসান লিযাতিহীর চেয়ে উচ্চ মর্যাদার এবং সহীহ লিযাতিহীর চেয়ে নিম্ন মর্যাদার।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
সহীহ লিগয়রিহীর উদাহরণ

মুহাম্মাদ ইবনু আমর, আবূ সালামাহ থেকে, তিনি আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَوْلَا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِيْ لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلَاةٍ

“আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হলে আমি তাদেরকে প্রতি সালাতের সময় মিসওয়াক করার আদেশ দিতাম।”[৪৫]

ইবনুস সালাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন: “মুহাম্মাদ ইবনু আমর ইবনু আলকামাহ সততা ও ধার্মিকতায় প্রসিদ্ধ, কিন্তু তিনি ইতকান (নিখুঁত সংরক্ষণ)-এর অধিকারী ছিলেন না। এমনকি কিছু মুহাদ্দিস তাঁকে স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে দঈফ বলেছেন, আবার কিছু মুহাদ্দিস তাঁর সততা ও মর্যাদার কারণে সিকাহ বলেছেন। তাই এই দিক থেকে তাঁর হাদীস হাসান। কিন্তু যখন এর সাথে যুক্ত হলো যে, হাদীসটি অন্যান্য সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে, তখন তাঁর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে যে আশঙ্কা ছিল তা দূর হয়ে গেল এবং এই সামান্য ত্রুটি পূরণ হয়ে গেল। ফলে এই সনদটি সহীহ হয়ে গেল এবং সহীহের মর্যাদায় উন্নীত হলো।”[৪৬]

অনুবাদকের টীকা

এই হাদীসটি বুখারীও বর্ণনা করেছেন, তবে ভিন্ন সূত্রে: আবুয যিনাদ ← আ’রাজ ← আবূ হুরায়রা। এই দ্বিতীয় সূত্রটি সহীহ লিযাতিহী। সুতরাং মুহাম্মাদ ইবনু আমরের সূত্রটি একক থাকলে হাসান লিযাতিহী ছিল, কিন্তু বুখারীর সূত্রটি যুক্ত হওয়ায় এটি সহীহ লিগয়রিহীতে উন্নীত হয়েছে।

পাদটীকা

[৪২] গ্রন্থের পূর্ণ নাম “মাসাবীহুস সুন্নাহ” (مَصَابِيْحُ السُّنَّةِ)। এতে মুসান্নিফ সহীহায়ন, সুনানে আরবা’আহ ও সুনানুদ দারিমী থেকে নির্বাচিত হাদীস সংকলন করেছেন। পরবর্তীকালে খতীব তাবরীযী রহিমাহুল্লাহ এতে সংযোজন ও সম্পাদনা করে নাম দেন “মিশকাতুল মাসাবীহ” (مِشْكَاةُ الْمَصَابِيْحِ)।

Also Read:  ১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: (ক. মাকবুল হাদিস: হাসান লিযাতিহী) | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

[৪৩] মাযান্নাত (مَظَنَّات) হলো মাযিন্নাহ (مَظِنَّة)-এর বহুবচন (যা-তে কাসরাহ সহকারে)। মাযিন্নাহ অর্থ: কোনো কিছুর মূল উৎস ও প্রাপ্তিস্থান। সুতরাং শিরোনামের অর্থ: “যেসব গ্রন্থে হাসান হাদীস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।”

[৪৪] দেখুন: নুখবাতুল ফিকার (نُخْبَةُ الْفِكَرِ) সহ নুযহাতুন নাযার শরাহ, পৃষ্ঠা ৩৪।

[৪৫] তিরমিযী, কিতাবুত তাহারাহ, অধ্যায়: মিসওয়াক সংক্রান্ত; ১/৩৪, হাদীস নং ২২ (এই শব্দে)। বুখারীও আবুয যিনাদ ← আ’রাজ ← আবূ হুরায়রা সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন।

[৪৬] উলূমুল হাদীস (عُلُوْمُ الْحَدِيْثِ), ইবনুস সালাহ রহিমাহুল্লাহ।

হাসান লিগয়রিহী (অন্যের সহায়তায় হাসান)

اَلْحَسَنُ لِغَيْرِهِ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

দঈফ হাদীস যদি একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয় এবং এর দুর্বলতার কারণ রাবীর ফিসক (পাপাচার) বা মিথ্যাচার না হয়, তাহলে সেটি হাসান লিগয়রিহী।[৪৭]

এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, দঈফ হাদীস দুটি শর্ত পূরণ হলে হাসান লিগয়রিহীর মর্যাদায় উন্নীত হয়:

অন্য সূত্রে বর্ণিত হওয়া

হাদীসটি অন্য এক বা একাধিক সূত্রে বর্ণিত হতে হবে, তবে শর্ত হলো সেই অন্য সূত্রটি এর সমপর্যায়ের বা এর চেয়ে শক্তিশালী হতে হবে।

দুর্বলতার কারণ সীমিত প্রকারের হওয়া

হাদীসের দুর্বলতার কারণ হতে হবে: হয় রাবীর স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা, অথবা সনদে বিচ্ছিন্নতা, অথবা রাবীর পরিচয় অজানা থাকা (জাহালাহ)।

গুরুত্বপূর্ণ

যদি দুর্বলতার কারণ রাবীর ফিসক বা মিথ্যাচার হয়, তাহলে একাধিক সূত্রে বর্ণিত হলেও হাদীসটি হাসান লিগয়রিহীতে উন্নীত হবে না।

এই নামকরণের কারণ

سَبَبُ تَسْمِيَتِهِ بِذَلِكَ

একে “হাসান লিগয়রিহী” বলা হয় কারণ হাসান হওয়ার মর্যাদা মূল সনদ থেকে আসেনি, বরং এসেছে অন্য সনদের যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে।

সূত্র

দঈফ + দঈফ = হাসান লিগয়রিহী

অনুবাদকের টীকা

সহীহ লিগয়রিহী ও হাসান লিগয়রিহীর মধ্যে পার্থক্য:

সহীহ লিগয়রিহী: হাসান লিযাতিহী + হাসান লিযাতিহী (অর্থাৎ মূল হাদীস স্বয়ং হাসান ছিল, অন্য সূত্রে উন্নীত হয়ে সহীহ হলো)।

হাসান লিগয়রিহী: দঈফ + দঈফ (অর্থাৎ মূল হাদীস স্বয়ং দঈফ ছিল, অন্য সূত্রে উন্নীত হয়ে হাসান হলো)।

উভয় ক্ষেত্রেই মূলনীতি একই: একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় দুর্বলতা দূর হয় এবং হাদীস উচ্চতর মর্যাদায় উন্নীত হয়।

মর্যাদা

مَرْتَبَتُهُ

হাসান লিগয়রিহী হাসান লিযাতিহীর চেয়ে নিম্ন মর্যাদার। ফলে এই দুটি পরস্পর বিরোধী হলে হাসান লিযাতিহীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

Also Read:  দ্বিতীয় অধ্যায়: রাবীর বৈশিষ্ট্য ও জারহ-তা'দীল | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

হুকুম (বিধান)

حُكْمُهُ

এটি মাকবূল (গ্রহণযোগ্য) হাদীসের অন্তর্ভুক্ত এবং এর দ্বারা দলীল গ্রহণ করা যায়।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
হাসান লিগয়রিহীর উদাহরণ

তিরমিযী শু’বাহর সূত্রে বর্ণনা করেন এবং হাসান বলেন: আসিম ইবনু উবায়দিল্লাহ, আব্দুল্লাহ ইবনু আমির ইবনু রবীআহ থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন:

أَنَّ امْرَأَةً مِنْ بَنِيْ فَزَارَةَ تَزَوَّجَتْ عَلَى نَعْلَيْنِ، فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ: “أَرَضِيْتِ مِنْ نَفْسِكِ وَمَالِكِ بِنَعْلَيْنِ؟” قَالَتْ: نَعَمْ، قَالَ: فَأَجَازَ

“বনূ ফাযারার এক মহিলা দুটি জুতার বিনিময়ে বিবাহ করলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: ‘তুমি কি তোমার নিজের ও তোমার সম্পদের বিনিময়ে দুটি জুতায় সন্তুষ্ট?’ সে বলল: হ্যাঁ। তখন তিনি (বিবাহ) জায়েয করলেন।”

তিরমিযী বলেন: “এই বিষয়ে উমার, আবূ হুরায়রা, সাহল ইবনু সা’দ, আবূ সাঈদ, আনাস, আইশা, জাবির এবং আবূ হাদরাদ আল-আসলামী রদিয়াল্লাহু আনহুম থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে।”[৪৮]

এখানে আসিম ইবনু উবায়দিল্লাহ স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে দঈফ। তিরমিযী এই হাদীসটিকে হাসান বলেছেন, কারণ এটি অন্যান্য সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে।


অনুবাদকের টীকা

মাকবূল খবরের চারটি প্রকারের মর্যাদাক্রম (উচ্চ থেকে নিম্ন):

১. সহীহ লিযাতিহী: পাঁচটি শর্ত পূর্ণরূপে পূরণ। এটি সর্বোচ্চ।

২. সহীহ লিগয়রিহী: মূলত হাসান লিযাতিহী, একাধিক সূত্রে উন্নীত। সহীহ লিযাতিহীর নিচে।

৩. হাসান লিযাতিহী: দবতে সামান্য ঘাটতি ছাড়া বাকি চার শর্ত পূর্ণ।

৪. হাসান লিগয়রিহী: মূলত দঈফ, একাধিক সূত্রে উন্নীত। এটি সর্বনিম্ন।


কারাইনযুক্ত মাকবূল খবরে আহাদ

خَبَرُ الْآحَادِ الْمَقْبُوْلُ الْمُحْتَفُّ بِالْقَرَائِنِ

ভূমিকা

تَوْطِئَة

মাকবূল খবরের প্রকারভেদ আলোচনার শেষে اَلْمَقْبُوْلُ الْمُحْتَفُّ بِالْقَرَائِنِ কারাইনযুক্ত মাকবূল খবর সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। কারাইনযুক্ত বলতে বোঝায়: সেই খবর যার সাথে মাকবূল হওয়ার শর্তগুলোর অতিরিক্ত কিছু বিষয় সংযুক্ত ও পরিবেষ্টিত হয়েছে।

এই অতিরিক্ত বিষয়গুলো মাকবূল খবরকে আরও শক্তিশালী করে, অন্যান্য মাকবূল খবরের (যেগুলোতে এই অতিরিক্ত বিষয় নেই) উপর এটিকে বিশেষ মর্যাদা দেয় এবং সেগুলোর উপর প্রাধান্য দেয়।

Also Read:  ১ম অধ্যায়: খবর - ১ম পরিচ্ছেদ (মুতাওয়াতির ও আহাদ হাদিস) | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

প্রকারভেদ

أَنْوَاعُهُ

কারাইনযুক্ত মাকবূল খবরের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রকারগুলো হলো:

শায়খায়ন সহীহায়নে যা সংকলন করেছেন (মুতাওয়াতির পর্যায়ে না পৌঁছলেও)

এতে যেসব কারীনাহ (সহায়ক বিষয়) সংযুক্ত হয়েছে:

১. এই বিষয়ে (হাদীস যাচাই-বাছাইয়ে) তাঁদের উভয়ের সুমহান মর্যাদা।
২. সহীহ নির্বাচনে অন্য সকলের উপর তাঁদের অগ্রগামিতা।
৩. উলামায়ে কিরাম কর্তৃক তাঁদের গ্রন্থদ্বয় গ্রহণযোগ্য বলে গৃহীত হওয়া। এই গ্রহণযোগ্যতা একাই তাওয়াতুরের সীমায় না পৌঁছা বহু সূত্রের চেয়ে ইলম (নিশ্চিত জ্ঞান) প্রদানে অধিক শক্তিশালী।

মাশহূর হাদীস যার সূত্রগুলো বিভিন্ন এবং সবগুলো রাবীর দুর্বলতা ও ইল্লত (গূঢ় ত্রুটি) থেকে মুক্ত

মুসালসাল বিল আইম্মাতিল হুফফাযিল মুতকিনীন (ইমাম, হাফিয ও মুতকিন রাবীগণের ধারাবাহিক সূত্রে বর্ণিত হাদীস, যা গরীব নয়)

যেমন: এমন হাদীস যা ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন ইমাম শাফিঈ থেকে, ইমাম শাফিঈ বর্ণনা করেন ইমাম মালিক থেকে; এবং ইমাম আহমাদের সাথে অন্যরাও ইমাম শাফিঈ থেকে বর্ণনা করেন, আবার ইমাম শাফিঈর সাথে অন্যরাও ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করেন।

হুকুম (বিধান)

حُكْمُهُ

এটি খবরে আহাদের অন্যান্য যে কোনো মাকবূল খবরের চেয়ে প্রাধান্যপ্রাপ্ত। সুতরাং কারাইনযুক্ত খবর অন্য কোনো মাকবূল খবরের সাথে সাংঘর্ষিক হলে কারাইনযুক্ত খবরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

পাদটীকা

[৪৭] আন-নুখবাহ সহ নুযহাতুন নাযার শরাহ, পৃষ্ঠা ৫৪ (মর্মার্থ অনুযায়ী)।

[৪৮] তিরমিযী, আবওয়াবুন নিকাহ, অধ্যায়: মহিলাদের মোহর সংক্রান্ত; হাদীস নং ১১১৩, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪২০-৪২১।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading