১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: খ. মারদূদ খবর: (সনদে গোপনে বিচ্ছিন্নতার কারণে) ২. মুরসালে খফী + মু’আনআন-মু’আন্নান| তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

মুরসালে খফী (গোপন মুরসাল)

اَلْمُرْسَلُ الْخَفِيّ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُرْسَل মুরসাল শব্দটি ইসমে মাফঊল, إِرْسَال (ছেড়ে দেওয়া) থেকে উদ্ভূত; যেন মুরসিল সনদকে মুক্ত ছেড়ে দিয়েছেন এবং সংযুক্ত করেননি। আর خَفِيّ খফী হলো جَلِيّ জালী-এর (প্রকাশ্য) বিপরীত; কারণ এই ধরনের ইরসাল প্রকাশ্য নয়, গবেষণা ছাড়া ধরা পড়ে না।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

أَنْ يَرْوِيَ الرَّاوِي عَمَّنْ لَقِيَهُ، أَوْ عَاصَرَهُ، مَا لَمْ يَسْمَعْ مِنْهُ، بِلَفْظٍ يَحْتَمِلُ السَّمَاعَ وَغَيْرَهُ كَـ “قَالَ”

রাবী এমন ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যাঁর সাক্ষাৎ পেয়েছেন বা যাঁর সমসাময়িক ছিলেন, অথচ তাঁর কাছ থেকে (কিছুই) শোনেননি; এবং শ্রবণ ও অ-শ্রবণ উভয় সম্ভাবনাপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেন, যেমন “قَالَ”[৯৬]

অনুবাদকের টীকা

মুদাল্লাস ও মুরসালে খফীর পার্থক্য পুনরায় স্মরণ:

মুদাল্লাস: রাবী সেই শায়খ থেকে অন্য কিছু হাদীস শুনেছেন, কিন্তু এই নির্দিষ্ট হাদীসটি শোনেননি।

মুরসালে খফী: রাবী সেই শায়খ থেকে কোনো কিছুই শোনেননি; শুধু তাঁর সমসাময়িক ছিলেন বা তাঁর সাক্ষাৎ পেয়েছেন।

উভয় ক্ষেত্রেই রাবী সম্ভাবনাপূর্ণ শব্দ (যেমন “عَنْ” বা “قَالَ”) ব্যবহার করেন।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
মুরসালে খফীর উদাহরণ

ইবনু মাজাহ উমার ইবনু আব্দিল আযীযের সূত্রে, উকবাহ ইবনু আমির রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফূআন বর্ণনা করেন:

رَحِمَ اللهُ حَارِسَ الْحَرَسِ

“আল্লাহ প্রহরীদের প্রহরীকে রহম করুন।”[৯৭]

উমার ইবনু আব্দিল আযীয উকবাহর সাক্ষাৎ পাননি, যেমনটি মিযযী আল-আতরাফে বলেছেন।

ইরসালে খফী কীভাবে চেনা যায়?

بِمَ يُعْرَفُ الْإِرْسَالُ الْخَفِيّ؟

ইরসালে খফী তিনটি বিষয়ের যে কোনো একটি দ্বারা চেনা যায়:

কোনো ইমামের বক্তব্য

কোনো ইমাম স্পষ্ট বলে দেন যে, এই রাবী যাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন তাঁর সাক্ষাৎ পাননি, অথবা তাঁর কাছ থেকে কিছুই শোনেননি।

রাবীর নিজের স্বীকৃতি

রাবী নিজেই জানান যে, তিনি যাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন তাঁর সাক্ষাৎ পাননি, অথবা তাঁর কাছ থেকে কিছু শোনেননি।

অন্য সূত্রে হাদীসটি পাওয়া যাওয়া, যেখানে এই রাবী ও তাঁর শায়খের মধ্যে অতিরিক্ত একজন রাবী রয়েছে

তবে এই তৃতীয় বিষয়ে উলামাদের মতভেদ আছে; কারণ এটি اَلْمَزِيْدُ فِيْ مُتَّصِلِ الْأَسَانِيْدِ আল-মাযীদ ফী মুত্তাসিলিল আসানীদ (সংযুক্ত সনদে অতিরিক্ত সংযোজন) প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

হুকুম (বিধান)

حُكْمُهُ

মুরসালে খফী দঈফ; কারণ এটি মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। এর বিচ্ছিন্নতা প্রকাশ পেলে মুনকাতি’র হুকুমই প্রযোজ্য হবে।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আত-তাফসীল লিমুবহামিল মারাসীল (اَلتَّفْصِيْلُ لِمُبْهَمِ الْمَرَاسِيْلِ)

খতীব বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ


মুনকাতি’ হাদীসের সংযোজন: মু’আনআন ও মু’আন্নান

مُلْحَقَاتُ الْحَدِيْثِ الْمُنْقَطِعِ: اَلْمُعَنْعَنُ، وَالْمُؤَنَّنُ

ভূমিকা

تَمْهِيْد

সনদে বিচ্ছিন্নতার কারণে মারদূদ হাদীসের ছয়টি প্রকারের আলোচনা শেষ হলো। তবে যেহেতু মু’আনআন ও মু’আন্নান নিয়ে মতভেদ রয়েছে (এগুলো মুনকাতি’ না মুত্তাসিল), তাই এদেরকে সনদে বিচ্ছিন্নতার কারণে মারদূদ প্রকারের সাথে সংযোজন হিসেবে আলোচনা করা সমীচীন মনে হলো।

মু’আনআনের সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُ الْمُعَنْعَنِ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُعَنْعَن মু’আনআন শব্দটি ইসমে মাফঊল, عَنْعَنَ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ: “عَنْ، عَنْ” (থেকে, থেকে) বলা।

(খ) পারিভাষিক অর্থ: রাবীর এই বলা: “অমুক, অমুক থেকে” (فُلَانٌ عَنْ فُلَانٍ)।[৯৮]

উদাহরণ

مِثَالُهُ
মু’আনআন হাদীসের উদাহরণ

ইবনু মাজাহ বলেন: “আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন উসমান ইবনু আবী শায়বাহ, তিনি বলেন: আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন মুআবিয়াহ ইবনু হিশাম, তিনি বলেন: আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন সুফিয়ান, উসামাহ ইবনু যায়দ থেকে, উসমান ইবনু উরওয়াহ থেকে, উরওয়াহ থেকে, আইশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে।” তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى مَيَامِنِ الصُّفُوْفِ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ কাতারের ডান দিকে (দাঁড়ানো ব্যক্তিদের) উপর রহমত বর্ষণ করেন।”[৯৯]

এখানে সুফিয়ান থেকে আইশা পর্যন্ত “عَنْ” দিয়ে বর্ণিত; এটিই আনআনাহ।

এটি কি মুত্তাসিল না মুনকাতি’?

هَلْ هُوَ مِنَ الْمُتَّصِلِ أَمِ الْمُنْقَطِعِ؟

উলামাদের দুটি মত:

প্রথম মত: মুনকাতি’ (গৃহীত নয়)

ইত্তিসাল (সংযুক্ততা) প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটি মুনকাতি’।

দ্বিতীয় মত: শর্তসাপেক্ষে মুত্তাসিল (সঠিক মত)

জমহূর মুহাদ্দিসীন, ফুকাহা ও উসূলবিদগণের মত এবং যার উপর আমল প্রতিষ্ঠিত: শর্তপূরণ সাপেক্ষে মু’আনআন মুত্তাসিল।

সর্বসম্মত দুটি শর্ত (ইমাম মুসলিম শুধু এই দুটিতেই তুষ্ট):

মু’আনআনকারী মুদাল্লিস না হওয়া

উভয়ের সাক্ষাৎ সম্ভব হওয়া

অর্থাৎ মু’আনআনকারী ও যাঁর থেকে আনআনাহ করেছেন তাঁদের পরস্পরের সাক্ষাৎ সম্ভবপর হওয়া।

যেসব অতিরিক্ত শর্তে মতভেদ রয়েছে:

সাক্ষাৎ প্রমাণিত হওয়া (ثُبُوْتُ اللِّقَاءِ)

এটি বুখারী, ইবনুল মাদীনী ও মুহাক্কিকগণের মত।

দীর্ঘ সাহচর্য (طُوْلُ الصُّحْبَةِ)

এটি আবুল মুযাফফর আস-সামআনীর মত।

তাঁর থেকে বর্ণনা করেন বলে পরিচিত হওয়া (مَعْرِفَتُهُ بِالرِّوَايَةِ عَنْهُ)

এটি আবূ আমর আদ-দানীর মত।

অনুবাদকের টীকা

বুখারী ও মুসলিমের পার্থক্য: ইমাম বুখারী মু’আনআন মুত্তাসিল (সংযুক্ত) বলার জন্য সাক্ষাৎ প্রমাণিত হওয়া শর্ত করেন। ইমাম মুসলিম শুধু সাক্ষাৎ সম্ভব হওয়াকেই যথেষ্ট মনে করেন। এই পার্থক্যটি বুখারী ও মুসলিমের সনদ গ্রহণের মানদণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

মু’আন্নানের সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُ الْمُؤَنَّنِ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُؤَنَّن মু’আন্নান শব্দটি ইসমে মাফঊল, أَنَّنَ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ: “أَنَّ، أَنَّ” (নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই) বলা।

(খ) পারিভাষিক অর্থ: রাবীর এই বলা: “আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন অমুক, নিশ্চয়ই অমুক বলেছেন…” (حَدَّثَنَا فُلَانٌ أَنَّ فُلَانًا قَالَ)।

মু’আন্নানের হুকুম

حُكْمُ الْمُؤَنَّنِ
প্রথম মত: মুনকাতি’ (গৃহীত নয়)

ইমাম আহমাদ ও একদল উলামার মতে ইত্তিসাল (সংযুক্ততা) প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটি মুনকাতি’।

দ্বিতীয় মত: মু’আনআনের মতোই (সঠিক মত)

জমহূরের মতে “أَنَّ” শব্দটি “عَنْ”-এর মতোই এবং বিনা শর্তে এটি ইত্তিসাল ও সামা’র উপর প্রযোজ্য; মু’আনআনে বর্ণিত একই শর্তগুলো এতেও প্রযোজ্য।

সারকথা

মু’আন্নানের হুকুম মু’আনআনের মতোই এবং একই শর্তগুলো প্রযোজ্য।

পাদটীকা

[৯৬] শরহু আলফিয়্যাতিল ইরাকী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮০; “বায়ানুল ওয়াহমি ওয়াল ঈহাম” থেকে আবুল হাসান ইবনুল কাত্তানের নকল।

[৯৭] ইবনু মাজাহ, কিতাবুল জিহাদ; খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৯২৫, হাদীস নং ২৭৬৯।

[৯৮] উলূমুল হাদীস, পৃষ্ঠা ৬১।

[৯৯] ইবনু মাজাহ, কিতাবু ইকামাতিস সালাত ওয়াস সুন্নাতি ফীহা; খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২১, হাদীস নং ১০০৫ (এই শব্দে)।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading