১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: খ. মারদূদ খবর: (সনদে বিচ্ছিন্নতার কারণে) ১. মু’আল্লাক | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

দ্বিতীয় মাকসাদ: সনদে বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রত্যাখ্যাত

اَلْمَقْصَدُ الثَّانِي: اَلْمَرْدُوْدُ بِسَبَبِ سَقْطٍ مِنَ الْإِسْنَادِ

সনদে বিচ্ছিন্নতা বলতে কী বোঝায়?

اَلْمُرَادُ بِالسَّقْطِ مِنَ الْإِسْنَادِ

সনদে বিচ্ছিন্নতা (سَقْط সাকত) বলতে বোঝায়: সনদের শৃঙ্খল থেকে এক বা একাধিক রাবী বাদ পড়ার কারণে সনদের ধারাবাহিকতা ছিন্ন হওয়া। এই বাদ পড়া হতে পারে কোনো রাবীর ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত; সনদের শুরু থেকে, শেষ থেকে বা মাঝখান থেকে; এবং প্রকাশ্যভাবে বা গোপনভাবে।

বিচ্ছিন্নতার প্রকারভেদ

أَنْوَاعُ السَّقْطِ

সনদে বিচ্ছিন্নতা তার প্রকাশ্যতা ও গোপনীয়তার বিবেচনায় দুই প্রকার:

প্রথম প্রকার

প্রকাশ্য বিচ্ছিন্নতা (سَقْطٌ ظَاهِرٌ)

ইমামগণ এবং হাদীস বিষয়ে কর্মরত অন্যান্যরা সকলেই এটি চিনতে পারেন। রাবী ও তাঁর শায়খের মধ্যে সাক্ষাৎ না হওয়া থেকে এটি জানা যায়।

দ্বিতীয় প্রকার

গোপন বিচ্ছিন্নতা (سَقْطٌ خَفِيٌّ)

শুধু সুদক্ষ ইমামগণ, যাঁরা হাদীসের বিভিন্ন সূত্র ও সনদের ইলাল (গূঢ় ত্রুটি) সম্পর্কে অবগত, কেবল তাঁরাই এটি ধরতে পারেন।

এই সাক্ষাৎ না হওয়ার কারণ হয় এই যে, রাবী তাঁর শায়খের যুগ পাননি, অথবা যুগ পেলেও সাক্ষাৎ হয়নি (এবং তাঁর কাছ থেকে ইজাযাহ[৬৫] বা বিজাদাহ[৬৬]ও নেই)। এজন্যই সনদ গবেষককে রাবীগণের ইতিহাস জানা প্রয়োজন; কারণ তাতে তাদের জন্ম, মৃত্যু, ইলম অন্বেষণের সময়কাল, সফরের সময় ইত্যাদি বিবরণ থাকে।

সনদে বিচ্ছিন্নতার প্রকারভেদ ও নামসমূহ
সাকত (বিচ্ছিন্নতা)
প্রকাশ্য বিচ্ছিন্নতা (৪ প্রকার)
  • ১. মু’আল্লাক (مُعَلَّق)
  • ২. মুরসাল (مُرْسَل)
  • ৩. মু’দাল (مُعْضَل)
  • ৪. মুনকাতি’ (مُنْقَطِع)
গোপন বিচ্ছিন্নতা (২ প্রকার)
  • ১. মুদাল্লাস (مُدَلَّس)
  • ২. মুরসালে খফী (مُرْسَل خَفِيّ)

এবার এই ছয়টি প্রকার পর্যায়ক্রমে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।


ক. প্রকাশ্য বিচ্ছিন্নতার প্রকারভেদ

মু’আল্লাক (ঝুলন্ত)

اَلْمُعَلَّقُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُعَلَّق মু’আল্লাক শব্দটি ইসমে মাফঊল (কর্মবাচক বিশেষ্য), عَلَّقَ থেকে উদ্ভূত; যার অর্থ: ঝুলিয়ে রাখা, সংযুক্ত করা। এই সনদকে মু’আল্লাক বলা হয় কারণ এটি শুধু উপরের দিকে (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে) সংযুক্ত, কিন্তু নিচের দিকে (মুসান্নিফের দিকে) বিচ্ছিন্ন। ফলে এটি যেন ছাদ ইত্যাদিতে ঝুলানো কোনো বস্তুর মতো হয়ে গেছে।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

مَا حُذِفَ مِنْ مَبْدَأِ إِسْنَادِهِ رَاوٍ فَأَكْثَرُ عَلَى التَّوَالِي

যে হাদীসের সনদের শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে এক বা একাধিক রাবী বাদ দেওয়া হয়েছে।[৬৭]

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

সনদের مَبْدَأ মাবদা’ (শুরু) হলো আমাদের দিকের প্রান্ত, অর্থাৎ মুসান্নিফের (গ্রন্থকারের) শায়খ। একে “সনদের প্রথম” বলা হয়; এবং “মাবদা'” বলার কারণ হলো আমরা হাদীস পড়া এখান থেকেই শুরু করি।

এর কিছু আকৃতি

مِنْ صُوَرِهِ

সম্পূর্ণ সনদ বাদ দেওয়া

অতঃপর সরাসরি বলা হয়: “রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন বলেছেন।”

সাহাবী ব্যতীত সকল রাবী বাদ দেওয়া, অথবা সাহাবী ও তাবিঈ ব্যতীত সকল রাবী বাদ দেওয়া[৬৮]

অনুবাদকের টীকা

মু’আল্লাক বোঝার সহজ উপায়: মু’আল্লাকে বাদ পড়ে সনদের নিচের দিক থেকে (মুসান্নিফের শায়খ থেকে)। মনে রাখার জন্য: “আল্লাক” মানে ঝুলানো; ঝোলে উপর থেকে, নিচে ফাঁকা থাকে; তেমনি এই সনদ উপরের দিকে (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে) সংযুক্ত, কিন্তু নিচের দিকে (মুসান্নিফের দিকে) ফাঁকা।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
মু’আল্লাক হাদীসের উদাহরণ

ইমাম বুখারী “উরানের (ঊরুর) বিষয়ে যা উল্লেখ করা হয়” শিরোনামের ভূমিকায় বলেন:

وَقَالَ أَبُوْ مُوْسَى: غَطَّى النَّبِيُّ ﷺ رُكْبَتَيْهِ حِيْنَ دَخَلَ عُثْمَانُ

“আবূ মূসা বলেন: উসমান রদিয়াল্লাহু আনহু প্রবেশ করলে নবী ﷺ তাঁর দুই হাঁটু ঢেকে নিলেন।”[৬৯]

এটি মু’আল্লাক হাদীস; কারণ বুখারী সাহাবী আবূ মূসা আল-আশআরী রদিয়াল্লাহু আনহু ব্যতীত সনদের সকল রাবী বাদ দিয়েছেন।

হুকুম (বিধান)

حُكْمُهُ

মু’আল্লাক হাদীস মারদূদ (প্রত্যাখ্যাত); কারণ এতে গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম শর্ত, অর্থাৎ সনদের ইত্তিসাল (সংযুক্ততা) অনুপস্থিত। সনদ থেকে এক বা একাধিক রাবী বাদ পড়ায় এবং সেই বাদ পড়া রাবীর অবস্থা আমাদের অজানা থাকায় হাদীসটি গ্রহণযোগ্য হয় না।

সহীহায়নে মু’আল্লাকাতের বিধান

حُكْمُ الْمُعَلَّقَاتِ فِي الصَّحِيْحَيْنِ

মু’আল্লাক মারদূদ হওয়ার এই বিধান সাধারণভাবে সকল মু’আল্লাক হাদীসের জন্য। তবে যেসব গ্রন্থ সিহহাতের অঙ্গীকার করেছে (যেমন সহীহায়ন) সেগুলোতে মু’আল্লাক থাকলে তার বিশেষ বিধান রয়েছে, যা সহীহ হাদীসের আলোচনায় পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। সেটি সংক্ষেপে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো:

জাযম (নিশ্চিত) ভাষায় উল্লেখিত

যেমন: قَالَ, ذَكَرَ, حَكَى (তিনি বলেছেন, উল্লেখ করেছেন); তাহলে এটি যাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে তাঁর থেকে সহীহ বলে হুকুম।

তামরীদ (অনিশ্চিত) ভাষায় উল্লেখিত

যেমন: قِيْلَ, ذُكِرَ, حُكِيَ (বলা হয়েছে, উল্লেখ করা হয়েছে); তাহলে এতে সম্বন্ধকৃত ব্যক্তি থেকে সহীহ হওয়ার হুকুম নেই।

দ্বিতীয় প্রকারে সহীহ, হাসান ও দঈফ সবই থাকতে পারে, তবে একেবারে নিতান্ত দুর্বল (ওয়াহিন) হাদীস নেই; কারণ এটি “সহীহ” নামের কিতাবে রয়েছে।[৭০] সহীহ ও অন্যান্য চেনার উপায় হলো: এই হাদীসের মুত্তাসিল সনদ খোঁজা এবং সেই অনুযায়ী যথাযথ হুকুম দেওয়া।[৭১]

পাদটীকা

[৬৫] ইজাযাহ (إِجَازَة) হলো: বর্ণনার অনুমতি। কখনো রাবী এমন শায়খের কাছ থেকেও ইজাযাহ পেতে পারেন যাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয়নি; যেমন কোনো শায়খ বলেন: “আমার যুগের সকল মানুষকে আমার শ্রুত হাদীস বর্ণনার অনুমতি দিলাম।” ইজাযাহ ও বিজাদাহর বিস্তারিত আলোচনা তাহাম্মুল ও আদা’ (হাদীস গ্রহণ ও প্রদানের পদ্ধতি) অধ্যায়ে আসবে।

[৬৬] বিজাদাহ (وِجَادَة, ওয়াও-তে কাসরাহ সহ) হলো: রাবী কোনো শায়খের পরিচিত হস্তলিপিতে লেখা কিতাব পেয়ে তা থেকে বর্ণনা করা।

[৬৭] উলূমুল হাদীস (عُلُوْمُ الْحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ২৪।

[৬৮] শরহুন নুখবাহ (شَرْحُ النُّخْبَةِ), পৃষ্ঠা ৪২।

[৬৯] বুখারী, কিতাবুস সালাত; খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯০।

[৭০] উলূমুল হাদীস, পৃষ্ঠা ২৪-২৫।

[৭১] উলামায়ে কিরাম সহীহুল বুখারীর মু’আল্লাকাত নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং সেগুলোর মুত্তাসিল সনদ উল্লেখ করেছেন। এই কাজ সবচেয়ে ভালোভাবে করেছেন হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ তাঁর “তাগলীকুত তা’লীক” (تَغْلِيْقُ التَّعْلِيْقِ) গ্রন্থে।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading