দ্বিতীয় মাতলাব: মারদূদ (প্রত্যাখ্যাত) খবর
পূর্ববর্তী মাতলাবে আমরা মাকবূল (গ্রহণযোগ্য) খবরের বিস্তারিত আলোচনা শেষ করেছি। এখন মারদূদ (প্রত্যাখ্যাত) খবরের আলোচনা শুরু হচ্ছে। এই মাতলাবে তিনটি মাকসাদ রয়েছে:
প্রথম মাকসাদ: الضَّعِيْف দঈফ (দুর্বল হাদীস); এটি মারদূদের সাধারণ নাম ও পরিচিতি।
দ্বিতীয় মাকসাদ: সনদে বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রত্যাখ্যাত হাদীসের প্রকারভেদ। এতে মু’আল্লাক, মুরসাল, মু’দাল, মুনকাতি’ ইত্যাদি আলোচিত হবে।
তৃতীয় মাকসাদ: রাবীর ত্রুটির কারণে প্রত্যাখ্যাত হাদীসের প্রকারভেদ। এতে মাওদূ’, মাতরূক, মুনকার, মুদরাজ, মাকলূব ইত্যাদি আলোচিত হবে।
মারদূদ খবর ও প্রত্যাখ্যানের কারণসমূহ
اَلْخَبَرُ الْمَرْدُوْدُ، وَأَسْبَابُ رَدِّهِ
সংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُمَرْدُوْد মারদূদ হলো সেই খবর, যার বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতা প্রাধান্য পায়নি।
এটি ঘটে সহীহ হাদীসের আলোচনায় আমরা যেসব গ্রহণযোগ্যতার শর্ত জেনেছি, সেগুলোর কোনো একটি বা একাধিক অনুপস্থিত হলে।
প্রকারভেদ ও প্রত্যাখ্যানের কারণ
أَقْسَامُهُ، وَأَسْبَابُ رَدِّهِউলামায়ে কিরাম মারদূদ খবরকে অনেক প্রকারে ভাগ করেছেন[৫৯] এবং অনেকগুলোর জন্য নির্দিষ্ট নাম দিয়েছেন। কিছু প্রকারের জন্য নির্দিষ্ট নাম দেওয়া হয়নি, বরং একটি সাধারণ নামে অভিহিত করা হয়েছে: “দঈফ” (দুর্বল)।
হাদীস প্রত্যাখ্যানের কারণ অনেক, তবে সামগ্রিকভাবে সেগুলো দুটি প্রধান কারণে ফিরে যায়:
সনদে বিচ্ছিন্নতা (سَقْطٌ مِنَ الْإِسْنَادِ)
সনদ থেকে কোনো রাবী বাদ পড়া।
রাবীর ত্রুটি (طَعْنٌ فِي الرَّاوِي)
রাবীর চরিত্র বা সংরক্ষণ ক্ষমতায় ত্রুটি থাকা।
এই উভয় কারণের অধীনে বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। ইনশাআল্লাহ তাআলা, এগুলো তিনটি স্বতন্ত্র মাকসাদে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। প্রথমে “দঈফ” নিয়ে আলোচনা শুরু করব, যা মারদূদ প্রকারের সাধারণ নাম।
প্রথম মাকসাদ: দঈফ
اَلْمَقْصَدُ الْأَوَّلُ: اَلضَّعِيْفُ
সংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُ(ক) শাব্দিক অর্থ: ضَعِيْف দঈফ শব্দটি قَوِيّ কবী-এর (শক্তিশালী) বিপরীত। দুর্বলতা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যও হতে পারে, আবার ভাবগতও হতে পারে। এখানে ভাবগত দুর্বলতা উদ্দেশ্য।
(খ) পারিভাষিক অর্থ:
যে হাদীসে হাসানের গুণাবলি একত্রিত হয়নি, এর কোনো একটি শর্ত অনুপস্থিত হওয়ার কারণে।
وَكُلُّ مَا عَنْ رُتْبَةِ الْحَسَنِ قَصُرْ … فَهُوَ الضَّعِيْفُ وَهُوَ أَقْسَامٌ كُثُرْ
“হাসানের মর্যাদা থেকে যা পিছিয়ে পড়ে, সেটিই দঈফ; এবং এর প্রকারভেদ বহু।”
দুর্বলতার তারতম্য
تَفَاوُتُهُসহীহ হাদীসের যেমন মর্যাদার তারতম্য রয়েছে, তেমনি দঈফ হাদীসেরও দুর্বলতার তারতম্য রয়েছে; রাবীগণের দুর্বলতার তীব্রতা ও মৃদুতা অনুযায়ী। দঈফের মধ্যে রয়েছে:
সবচেয়ে দুর্বল সনদ
أَوْهَى الْأَسَانِيْدِসহীহ হাদীসের আলোচনায় যেমন “সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ” উল্লেখ করা হয়েছে, তেমনি দঈফ হাদীসের আলোচনায় উলামায়ে কিরাম أَوْهَى الْأَسَانِيْدِ আওহাল আসানীদ (সবচেয়ে দুর্বল সনদ) উল্লেখ করেছেন। হাকিম নিসাবূরী রহিমাহুল্লাহ[৬১] কিছু সাহাবী বা কিছু অঞ্চল ও শহরের সাপেক্ষে অনেকগুলো “সবচেয়ে দুর্বল সনদ” উল্লেখ করেছেন। কয়েকটি উদাহরণ:
আবূ বকর সিদ্দীক রদিয়াল্লাহু আনহুর সাপেক্ষে সবচেয়ে দুর্বল সনদ[৬১]
সাদাকাহ ইবনু মূসা আদ-দাকীকী ← ফারকাদ আস-সাবাখী ← মুররাহ আত-তায়্যিব ← আবূ বকর
শামবাসীদের সবচেয়ে দুর্বল সনদ[৬১]
মুহাম্মাদ ইবনু কায়স আল-মাসলূব ← উবায়দুল্লাহ ইবনু যাহর ← আলী ইবনু ইয়াযীদ ← কাসিম ← আবূ উমামাহ
ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমার সাপেক্ষে সবচেয়ে দুর্বল সনদ
আস-সুদ্দী আস-সগীর মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান ← আল-কালবী ← আবূ সালিহ ← ইবনু আব্বাস
হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ এই সনদ সম্পর্কে বলেন: “এটি মিথ্যার শৃঙ্খল, স্বর্ণশৃঙ্খল নয়।”[৬২]
উদাহরণ
مِثَالُهُতিরমিযী “হাকীম আল-আসরাম” এর সূত্রে আবূ তামীমাহ আল-হুজায়মী থেকে, তিনি আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, নবী ﷺ বলেছেন:
তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনার পর বলেন: “আমরা এই হাদীসটি শুধু হাকীম আল-আসরামের সূত্রে আবূ তামীমাহ আল-হুজায়মী থেকে, তিনি আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত হিসেবেই জানি।” অতঃপর তিনি বলেন: “মুহাম্মাদ (অর্থাৎ বুখারী) এই হাদীসটিকে সনদের কারণে দঈফ বলেছেন।”[৬৩]
এই হাদীস দঈফ হওয়ার কারণ: সনদে হাকীম আল-আসরাম রয়েছেন, যাঁকে উলামায়ে কিরাম দঈফ বলেছেন। হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ তাকরীবুত তাহযীবে (تَقْرِيْبُ التَّهْذِيْبِ) তাঁর সম্পর্কে বলেন: “فِيْهِ لِيْنٌ” (তাঁর মধ্যে দুর্বলতা আছে)।
গ্রন্থকার এই হাদীসটি দঈফের উদাহরণ হিসেবে এনেছেন এবং তিরমিযীর সূত্র অনুযায়ী হাকীম আল-আসরামের কারণে বুখারী এটিকে দঈফ বলেছেন। তবে পাঠকের জন্য এই হাদীসের সার্বিক অবস্থা জানা জরুরি, কারণ বিষয়টি শুধু এই একটি সনদে সীমাবদ্ধ নয়।
১. এই হাদীসের তাখরীজ (উৎসসমূহ): হাদীসটি শুধু তিরমিযীতে নয়, আবূ দাঊদ (৩৯০৪), নাসাঈ সুনানুল কুবরায় (৯০১৭), ইবনু মাজাহ (৬৩৯), আহমাদ (১০১৬৭), দারিমী, তাহাবী, ইবনুল জারূদ এবং বায়হাকী, সকলেই হাম্মাদ ইবনু সালামাহ ← হাকীম আল-আসরাম ← আবূ তামীমাহ ← আবূ হুরায়রা সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
২. হাকীম আল-আসরাম নিয়ে মতভেদ:
যারা দঈফ বলেছেন: বুখারী বলেন “এতে তাকে অনুসরণ করা হয়নি” এবং “আবূ তামীমাহর আবূ হুরায়রা থেকে শ্রবণ জানা যায় না।” বাযযার বলেন “হাদীসটি মুনকার।” নববী বলেন “সনদ দঈফ।”
যারা সিকাহ বা শক্তিশালী বলেছেন: ইবনুল মাদীনী তাঁকে সিকাহ বলেছেন। আবূ দাঊদ ও নাসাঈ বলেন “তাঁর মধ্যে সমস্যা নেই।” ইবনু হিব্বান তাঁকে সিকাতে (নির্ভরযোগ্যদের তালিকায়) উল্লেখ করেছেন। হাফিয ইরাকী তাঁর আমালীতে বলেন “হাদীসটি সহীহ।” যাহাবী বলেন “সনদ শক্তিশালী।”
৩. আলবানী রহিমাহুল্লাহর অবস্থান: তিনি সহীহ আবী দাঊদে (৩৯০৪) হাদীসটিকে সহীহ এবং সিলসিলাতুস সহীহাহতে (৭/১১৩০) এর সনদকে “জাইয়্যিদ” (উত্তম) বলেছেন। তাঁর যুক্তি হলো: আবূ তামীমাহ (তারীফ ইবনু মুজালিদ) বুখারীর রাবী এবং সিকাহ; আর হাকীম আল-আসরামকে ইবনুল মাদীনী সিকাহ বলেছেন, তাই বুখারীর “তাকে অনুসরণ করা হয়নি” উক্তি ক্ষতিকর নয়।
৪. শুআইব আল-আরনাঊতের অবস্থান: তিনি হাদীসটিকে “حائضا” (ঋতুবতী মহিলা) অংশ ব্যতীত সহীহ বলেছেন।
৫. শাওয়াহিদ (সমর্থক বর্ণনা): এই মতনের মূল বিষয়বস্তু (দুবুরে সহবাস ও গণকের কাছে যাওয়ার নিষিদ্ধতা) অসংখ্য সাহাবী থেকে বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত। যেমন: “মালঊন (অভিশপ্ত) সে যে তার স্ত্রীর দুবুরে সহবাস করে” (আহমাদ, আবূ দাঊদ); “আল্লাহ কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির দিকে তাকাবেন না যে তার স্ত্রীর দুবুরে সহবাস করে” (নাসাঈ, ইবনু মাজাহ)। এছাড়া উমার, আলী, ইবনু মাসঊদ, জাবির, ইবনু উমার, ইবনু আব্বাস প্রমুখ সাহাবী থেকেও নিষেধাজ্ঞার বর্ণনা এসেছে।
৬. সারকথা: হাকীম আল-আসরামের সূত্রে এই নির্দিষ্ট শব্দটি নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মতভেদ রয়েছে: কেউ দঈফ, কেউ সহীহ বলেছেন। তবে এই হাদীসের মতনের মূল বিষয়বস্তু, অর্থাৎ দুবুরে সহবাসের নিষিদ্ধতা ও গণকের কাছে যাওয়ার নিষিদ্ধতা, একাধিক সহীহ ও হাসান সূত্রে প্রমাণিত এবং উম্মতের ইজমা দ্বারা সমর্থিত। সুতরাং এই নির্দিষ্ট সনদ দঈফ হলেও মতনের বিধান (হারাম হওয়া) সুপ্রতিষ্ঠিত।
দঈফ হাদীস বর্ণনার বিধান
حُكْمُ رِوَايَتِهِমুহাদ্দিসীন ও অন্যান্য উলামাদের মতে দঈফ হাদীস বর্ণনা করা এবং এর সনদে শিথিলতা দেখানো জায়েয, দুর্বলতা স্পষ্ট না করেও। তবে মাওদূ’ (বানোয়াট) হাদীসের ক্ষেত্রে বানোয়াট হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা ছাড়া বর্ণনা করা জায়েয নয়। এটি দুটি শর্তসাপেক্ষ:
আকীদা (বিশ্বাস) সংক্রান্ত না হওয়া
যেমন আল্লাহ তাআলার সিফাত (গুণাবলি) সংক্রান্ত বিষয়।
শরঈ আহকাম (হালাল-হারাম) সংক্রান্ত না হওয়া
অর্থাৎ দঈফ হাদীস বর্ণনার অনুমতি শুধু ওয়ায-নসীহত, তারগীব (উৎসাহ দান), তারহীব (ভয় প্রদর্শন), কিসসা-কাহিনী ইত্যাদি ক্ষেত্রে। সুফিয়ান সাওরী, আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী এবং ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রহিমাহুমুল্লাহ থেকে এই শিথিলতার কথা বর্ণিত আছে।
দঈফ হাদীস সনদ ছাড়া বর্ণনা করলে “قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ كَذَا” (রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন বলেছেন) বলবেন না। বরং বলবেন: “رُوِيَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ كَذَا” (রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এমন বর্ণিত আছে), অথবা “بَلَغَنَا عَنْهُ كَذَا” (আমাদের কাছে তাঁর থেকে এমন পৌঁছেছে); যাতে দুর্বলতা জানা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে নিশ্চিতভাবে সম্বন্ধ করা না হয়।
দঈফ হাদীসে আমলের বিধান
حُكْمُ الْعَمَلِ بِهِদঈফ হাদীসে আমল করার ব্যাপারে উলামাদের মতভেদ রয়েছে। জমহূর (অধিকাংশ) উলামাদের মত হলো: ফাদাইলুল আ’মালে (নেক আমলের ফযীলত সংক্রান্ত বিষয়ে) দঈফ হাদীসে আমল করা মুস্তাহাব (উত্তম), তবে তিনটি শর্তসাপেক্ষে। হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ[৬৪] এই শর্তগুলো স্পষ্ট করেছেন:
- হাদীসের দুর্বলতা যেন মারাত্মক পর্যায়ের না হয়।
- হাদীসটি এমন একটি শরঈ মূলনীতির অধীনে পড়তে হবে যার উপর আমল প্রতিষ্ঠিত।
- আমলের সময় হাদীসটি প্রমাণিত বলে বিশ্বাস না করা; বরং সতর্কতামূলক (ইহতিয়াত) মনে করা।
দঈফ হাদীসের মাযান্ন (প্রাপ্তিস্থান)
أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ الَّتِيْ هِيَ مَظِنَّةُ الضَّعِيْفِদুর্বল রাবী চিহ্নিতকরণে রচিত গ্রন্থাবলি
যেমন: ইবনু হিব্বানের আদ-দুআফা (اَلضُّعَفَاء) এবং যাহাবীর মীযানুল ই’তিদাল (مِيْزَانُ الْاِعْتِدَالِ)। এসব গ্রন্থের মুসান্নিফগণ দুর্বল রাবীদের বর্ণিত হাদীসের উদাহরণও উল্লেখ করেন।
দঈফের নির্দিষ্ট প্রকার বিষয়ক গ্রন্থাবলি
যেমন: মারাসীল, ইলাল, মুদরাজ ইত্যাদি বিষয়ে রচিত গ্রন্থ। উদাহরণস্বরূপ: আবূ দাঊদের আল-মারাসীল (اَلْمَرَاسِيْل) এবং দারাকুতনীর আল-ইলাল (اَلْعِلَل)।
পাদটীকা
[৫৯] কিছু উলামা এর প্রকারভেদ চল্লিশের কিছু বেশি পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন।
[৬০] দেখুন: উলূমুল হাদীস (عُلُوْمُ الْحَدِيْثِ), মাওদূ’ হাদীসের পরিচিতি, পৃষ্ঠা ৮৯।
[৬১] মা’রিফাতু উলূমিল হাদীস (مَعْرِفَةُ عُلُوْمِ الْحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ৭১-৭২।
[৬২] দেখুন: তাদরীবুর রাবী (تَدْرِيْبُ الرَّاوِي), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৮১।
[৬৩] তিরমিযী সহ তুহফাতুল আহওয়াযী শরাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪১৯-৪২০।
[৬৪] দেখুন: তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৮-২৯৯ এবং ফাতহুল মুগীস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৬৮।
Discover more from Debunking Misguidance
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
