১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: খ. মারদূদ খবর: (সনদে বিচ্ছিন্নতার কারণে) ২. মুরসাল | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

মুরসাল

اَلْمُرْسَلُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُرْسَل মুরসাল শব্দটি ইসমে মাফঊল (কর্মবাচক বিশেষ্য), أَرْسَلَ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ: ছেড়ে দেওয়া, মুক্ত করা। যেন মুরসিল (প্রেরণকারী রাবী) সনদকে মুক্ত ছেড়ে দিয়েছেন এবং কোনো পরিচিত রাবী দ্বারা আবদ্ধ করেননি।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

هُوَ مَا سَقَطَ مِنْ آخِرِ إِسْنَادِهِ مَنْ بَعْدَ التَّابِعِيّ

যে হাদীসের সনদের শেষ থেকে তাবিঈর পরের রাবী বাদ পড়েছে।[৭২]

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ সেই হাদীস যার সনদ থেকে তাবিঈর পরের রাবী বাদ পড়েছে। তাবিঈর পরের রাবী হলেন সাহাবী। আর সনদের শেষ হলো সেই প্রান্ত যেখানে সাহাবী রয়েছেন।

এর আকৃতি

صُوْرَتُهُ

মুরসালের আকৃতি হলো: তাবিঈ (ছোট হোক বা বড়) বলেন: “রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন বলেছেন”, অথবা “এমন করেছেন”, অথবা “তাঁর উপস্থিতিতে এমন করা হয়েছে।” এটিই মুহাদ্দিসগণের নিকট মুরসালের আকৃতি।

অনুবাদকের টীকা

মু’আল্লাক ও মুরসালের পার্থক্য সহজ করে বললে:

মু’আল্লাক: সনদের নিচ থেকে (মুসান্নিফের দিক থেকে) রাবী বাদ পড়ে।

মুরসাল: সনদের উপর থেকে (রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিক থেকে) রাবী বাদ পড়ে; অর্থাৎ তাবিঈ সাহাবীর নাম না বলে সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে সম্বন্ধ করেন।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
মুরসাল হাদীসের উদাহরণ

ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ গ্রন্থে কিতাবুল বুয়ূতে বলেন:

আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু রাফি’, তিনি বলেন: আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন হুজাইন, তিনি বলেন: আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করেছেন লাইস, উকায়ল থেকে, তিনি ইবনু শিহাব থেকে, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব থেকে:

أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ نَهَى عَنْ بَيْعِ الْمُزَابَنَةِ

“রাসূলুল্লাহ ﷺ মুযাবানাহ (শুকনো খেজুরের বিনিময়ে গাছের তাজা খেজুর) বিক্রি থেকে নিষেধ করেছেন।”[৭৩]

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব একজন বড় তাবিঈ। তিনি এই হাদীস রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে সরাসরি বর্ণনা করেছেন, তাঁর ও নবী ﷺ-এর মধ্যে কোনো মাধ্যম উল্লেখ করেননি। সুতরাং তিনি সনদের শেষ থেকে তাবিঈর পরের অংশ বাদ দিয়েছেন। এই বাদ পড়া সর্বনিম্ন একজন সাহাবী হতে পারেন, আবার সম্ভাবনা আছে যে তাঁর সাথে অন্য কেউও বাদ পড়েছেন, যেমন আরেকজন তাবিঈ।

ফুকাহা ও উসূলবিদগণের নিকট মুরসাল

اَلْمُرْسَلُ عِنْدَ الْفُقَهَاءِ وَالْأُصُوْلِيِّيْنَ

উপর্যুক্ত আকৃতিটি মুহাদ্দিসগণের নিকট মুরসাল। তবে ফুকাহা ও উসূলবিদগণের নিকট মুরসালের পরিধি এর চেয়ে ব্যাপক: তাদের মতে যেকোনো মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) হাদীসই মুরসাল, বিচ্ছিন্নতা যে স্থানেই ঘটুক না কেন। খতীব বাগদাদী রহিমাহুল্লাহও এই মত পোষণ করেন।

হুকুম (বিধান)

حُكْمُهُ

মুরসাল মূলত দঈফ ও মারদূদ; কারণ এতে গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম শর্ত, অর্থাৎ সনদের ইত্তিসাল (সংযুক্ততা) অনুপস্থিত এবং বাদ পড়া রাবীর অবস্থা অজানা; কারণ সম্ভাবনা আছে যে বাদ পড়া রাবী সাহাবী নন, আর সেক্ষেত্রে তিনি দঈফ হতে পারেন।

তবে এই ধরনের বিচ্ছিন্নতা সনদের অন্যান্য বিচ্ছিন্নতা থেকে ভিন্ন; কারণ এখানে বাদ পড়া রাবী সাধারণত সাহাবী হন, আর সকল সাহাবী ন্যায়পরায়ণ (আদিল); তাই তাঁদের পরিচয় অজানা থাকলেও ক্ষতি হয় না।

এ কারণেই মুরসালের হুকুমে উলামাদের তিনটি মত রয়েছে:

প্রথম মত: দঈফ ও মারদূদ

এটি জমহূর মুহাদ্দিসীন, অনেক উসূলবিদ ও ফুকাহার মত। তাঁদের যুক্তি: বাদ পড়া রাবী সাহাবী ব্যতীত অন্য কেউ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দ্বিতীয় মত: সহীহ ও দলীলযোগ্য

এটি তিন ইমাম: আবূ হানীফা, মালিক এবং আহমাদ (তাঁর প্রসিদ্ধ মত) ও একদল উলামার মত। শর্ত হলো: মুরসিল (যিনি মুরসাল করেছেন) সিকাহ হতে হবে এবং তিনি শুধু সিকাহ রাবী থেকেই ইরসাল (বাদ দেওয়া) করেন। তাঁদের যুক্তি: সিকাহ তাবিঈ “রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন” বলার সাহস করবেন না, যদি না তিনি কোনো সিকাহ ব্যক্তি থেকে শুনে থাকেন।

তৃতীয় মত: শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য (ইমাম শাফিঈর মত)

ইমাম শাফিঈ রহিমাহুল্লাহ ও কিছু আলিমের মতে মুরসাল শর্তসাপেক্ষে সহীহ। এই শর্ত চারটি: তিনটি মুরসিল রাবীর ক্ষেত্রে এবং একটি মুরসাল হাদীসের ক্ষেত্রে।

ইমাম শাফিঈর শর্তাবলি[৭৪]
মুরসিল রাবীর ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত
  • ১. মুরসিল কিবারুত তাবিঈনের (বড় তাবিঈগণের) অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।
  • ২. তিনি যাঁর নাম বাদ দিয়েছেন, তাঁর নাম জিজ্ঞাসা করা হলে একজন সিকাহ রাবীর নাম বলেন।
  • ৩. বিশ্বস্ত হাফিযগণ যখন তাঁর সাথে একই বর্ণনায় অংশ নেন, তখন তাঁর বিরোধিতা করেন না। অর্থাৎ তিনি পূর্ণ দবতসম্পন্ন।
হাদীসের ক্ষেত্রে একটি শর্ত: নিচের যে কোনো একটি পাওয়া যেতে হবে
  • ক. হাদীসটি অন্য সূত্রে মুসনাদ (সংযুক্ত সনদে) বর্ণিত হওয়া।
  • খ. ভিন্ন সূত্রে মুরসাল হিসেবে বর্ণিত হওয়া, তবে সেই মুরসিল প্রথম মুরসিলের শায়খদের ব্যতীত অন্যদের থেকে ইলম গ্রহণ করেছেন।
  • গ. কোনো সাহাবীর কওল (উক্তি) এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া।
  • ঘ. অধিকাংশ আহলে ইলম এর মর্মানুযায়ী ফতোয়া দেওয়া।

এই শর্তগুলো পূরণ হলে মুরসাল হাদীসের উৎস সহীহ বলে প্রমাণিত হয় এবং যা একে সমর্থন করেছে তাও সহীহ। এমতাবস্থায় যদি এই দুটি (মুরসাল ও তার সমর্থক) একটি একক সূত্রে বর্ণিত সহীহ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হয় এবং সমন্বয় সম্ভব না হয়, তাহলে সূত্রের বহুত্বের কারণে এদেরকে সেই সহীহ হাদীসের উপর প্রাধান্য দেওয়া হবে।

সূত্র

ইমাম শাফিঈর শর্তানুযায়ী:

ক. মুরসাল হাদীস + মুসনাদ হাদীস = সহীহ

খ. মুরসাল হাদীস + (ভিন্ন সূত্রে) মুরসাল হাদীস = সহীহ

গ. মুরসাল হাদীস + সাহাবীর উক্তি = সহীহ

ঘ. মুরসাল হাদীস + অধিকাংশ উলামার ফতোয়া = সহীহ

মুরসালুস সাহাবী (সাহাবীর মুরসাল)

مُرْسَلُ الصَّحَابِيّ

مُرْسَلُ الصَّحَابِيّ মুরসালুস সাহাবী হলো: কোনো সাহাবী রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কোনো কথা বা কাজ সম্পর্কে বর্ণনা করেন, অথচ তিনি তা স্বয়ং শোনেননি বা প্রত্যক্ষ করেননি; হয় অল্প বয়সের কারণে, অথবা বিলম্বে ইসলাম গ্রহণের কারণে, অথবা অনুপস্থিতির কারণে। এই ধরনের হাদীস ছোট সাহাবীগণের মধ্যে পাওয়া যায়, যেমন ইবনু আব্বাস, ইবনুয যুবায়র রদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ।

মুরসালুস সাহাবীর হুকুম

حُكْمُ مُرْسَلِ الصَّحَابِيّ
বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ মত (জমহূরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত)

মুরসালুস সাহাবী সহীহ ও দলীলযোগ্য। কারণ সাহাবীগণ তাবিঈ থেকে বর্ণনা করেন অত্যন্ত বিরলভাবে, এবং করলে স্পষ্ট করে দেন। সুতরাং তাঁরা যখন স্পষ্ট না করে “রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন” বলেন, তখন মূলনীতি হলো তাঁরা অপর একজন সাহাবী থেকে শুনেছেন। আর সাহাবী বাদ পড়লে ক্ষতি হয় না (কারণ সকল সাহাবী ন্যায়পরায়ণ)।

দুর্বল মত

মুরসালুস সাহাবীর হুকুম অন্যান্য মুরসালের মতোই। এই মত দুর্বল ও প্রত্যাখ্যাত।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আল-মারাসীল (اَلْمَرَاسِيْلُ)

ইমাম আবূ দাঊদ রহিমাহুল্লাহ

আল-মারাসীল (اَلْمَرَاسِيْلُ)

ইবনু আবী হাতিম রহিমাহুল্লাহ

জামিউত তাহসীল লিআহকামিল মারাসীল (جَامِعُ التَّحْصِيْلِ لِأَحْكَامِ الْمَرَاسِيْلِ)

আলাঈ রহিমাহুল্লাহ[৭৫]

পাদটীকা

[৭২] নুযহাতুন নাযার (نُزْهَةُ النَّظَرِ), পৃষ্ঠা ৪৩। তাবিঈ হলেন: যিনি সাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন মুসলিম অবস্থায় এবং ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ করেছেন।

[৭৩] মুসলিম, কিতাবুল বুয়ূ’, অধ্যায়: শুকনো খেজুরের বিনিময়ে তাজা খেজুর বিক্রি হারাম (আরায়া ব্যতীত); ৩/১১৬৮, হাদীস নং ৫৯।

[৭৪] দেখুন: ইমাম শাফিঈর আর-রিসালাহ (اَلرِّسَالَة), পৃষ্ঠা ৪৬১।

[৭৫] আর-রিসালাতুল মুস্তাতরাফাহ, পৃষ্ঠা ৮৫-৮৬। আলাঈ হলেন হাফিয, মুহাক্কিক, সালাহুদ্দীন আবূ সাঈদ খলীল ইবনু কায়কালদী আল-আলাঈ। দামিশকে ৬৯৪ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং কুদসে (জেরুজালেমে) ৭৬১ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading