দ্বিতীয় মাবহাছ: শক্তি ও দুর্বলতার বিবেচনায় খবরে আহাদের প্রকারভেদ
পূর্ববর্তী মাবহাছে আমরা খবরে আহাদকে রাবী সংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ করেছি (মাশহূর, আযীয, গরীব)। এই মাবহাছে খবরে আহাদকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ডে ভাগ করা হবে: হাদীছটি গ্রহণযোগ্য না প্রত্যাখ্যানযোগ্য সেই বিচারে। এতে দুটি মাতলাব:
প্রথম মাতলাব: مَقْبُوْل মাকবূল (গ্রহণযোগ্য খবর): এর অধীনে চার প্রকার হাদীছ: ছহীহ লিযাতিহী, ছহীহ লিগয়রিহী, হাসান লিযাতিহী, এবং হাসান লিগয়রিহী।
দ্বিতীয় মাতলাব: مَرْدُوْد মারদূদ (প্রত্যাখ্যাত খবর): এর অধীনে দঈফ হাদীছ এবং এর বিভিন্ন প্রকার।
প্রথম মাতলাব: গ্রহণযোগ্য খবর
এই মাতলাবে দুটি মাকছাদ (উদ্দেশ্য) রয়েছে:
প্রথম মাকছাদ: মাকবূলের প্রকারভেদ
গ্রহণযোগ্য খবর তার মর্যাদার তারতম্য অনুযায়ী দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: صَحِيْح – ছহীহ ও حَسَن হাসান। প্রতিটি আবার দুটি উপভাগে বিভক্ত: لِذَاتِهِ লিযাতিহী (স্বতন্ত্রভাবে) ও لِغَيْرِهِ লিগয়রিহী (অন্যের সহায়তায়)। ফলে মাকবূল খবরের মোট চারটি প্রকার দাঁড়ায়:
- ১. ছহীহ লিযাতিহী (স্বতন্ত্রভাবে ছহীহ)
- ২. ছহীহ লিগয়রিহী (অন্যের সহায়তায় ছহীহ)
- ৩. হাসান লিযাতিহী (স্বতন্ত্রভাবে হাসান)
- ৪. হাসান লিগয়রিহী (অন্যের সহায়তায় হাসান)
এবার এই প্রকারগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
ছহীহ[১৮]
اَلصَّحِيْحُসংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُ(ক) শাব্দিক অর্থ: صَحِيْح ছহীহ শব্দটি سَقِيْم সাকীম-এর (অসুস্থ) বিপরীত। মূলত এটি শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং হাদীছ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়।
(খ) পারিভাষিক অর্থ:
যে হাদীছের সনদ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংযুক্ত (মুত্তাছিল), যেখানে ন্যায়পরায়ণ (আদিল) ও সংরক্ষণক্ষম (যাবিত) রাবী তার সমপর্যায়ের রাবী থেকে বর্ণনা করেন, এবং তাতে কোনো শুযূয (বিচ্ছিন্ন মতানৈক্য) ও ইল্লত (গোপন ত্রুটি) নেই।
সংজ্ঞার ব্যাখ্যা
شَرْحُ التَّعْرِيْفِউপর্যুক্ত সংজ্ঞায় এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা একটি হাদীছে ছহীহ হওয়ার জন্য অবশ্যই বিদ্যমান থাকতে হবে। সেগুলো হলো:
সনদের ইত্তিছাল (সংযুক্ততা) (اِتِّصَالُ السَّنَدِ)
এর অর্থ হলো: সনদের প্রতিটি রাবী তার ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে সরাসরি হাদীছ গ্রহণ করেছেন; সনদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত।
রাবীগণের আদালত (ন্যায়পরায়ণতা) (عَدَالَةُ الرُّوَاةِ)
অর্থাৎ সনদের প্রতিটি রাবী এমন ব্যক্তি যিনি মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগ), সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন (আকিল), ফাসিক নন এবং মুরূওয়াহ (ব্যক্তিত্ব ও শালীনতা) বিবর্জিত নন।
রাবীগণের যবত (সংরক্ষণ ক্ষমতা) (ضَبْطُ الرُّوَاةِ)
অর্থাৎ সনদের প্রতিটি রাবী পূর্ণ যবতের অধিকারী; তা হোক ضَبْطُ صَدْرٍ যবতে সদর (স্মৃতির সংরক্ষণ), অথবা ضَبْطُ كِتَابٍ যবতে কিতাব (লিখিত সংরক্ষণ)।
শুযূযের অনুপস্থিতি (عَدَمُ الشُّذُوْذِ)
অর্থাৎ হাদীছটি شَاذّ শায (বিচ্ছিন্ন) না হওয়া। শুযূয হলো: কোনো ছিকাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবীর বর্ণনা তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া।
ইল্লতের অনুপস্থিতি (عَدَمُ الْعِلَّةِ)
অর্থাৎ হাদীছটি مُعَلَّل মু’আল্লাল (ত্রুটিপূর্ণ) না হওয়া। ইল্লত হলো: এমন একটি গূঢ়/গোপন ও সূক্ষ্ম কারণ যা হাদীছের ছিহহাতে (বিশুদ্ধতায়) ত্রুটি সৃষ্টি করে, অথচ বাহ্যত হাদীছটি ত্রুটিমুক্ত মনে হয়।
শর্তাবলি
شُرُوْطُهُসংজ্ঞার ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, একটি হাদীছ ছহীহ হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত অবশ্যই পূরণ হতে হবে:
গূঢ় ত্রুটি = লুকানো ত্রুটি / সূক্ষ্ম ত্রুটি; অর্থাৎ, এমন ভুল বা দুর্বলতা যা বাহ্যিকভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে ধরা পড়ে।
এই পাঁচটি শর্তের যে কোনো একটি অনুপস্থিত হলে হাদীছটিকে ছহীহ বলা যাবে না।
উদাহরণ
مِثَالُهُইমাম বুখারী তাঁর ছহীহ গ্রন্থে বলেন:
“আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মাগরিবের সালাতে সূরা আত-তূর তিলাওয়াত করতে শুনেছি।”[১৯]
এই হাদীছটি ছহীহ, কারণ:
এর সনদ মুত্তাছিল (সংযুক্ত)
প্রতিটি রাবী তাঁর শায়খ (উস্তায) থেকে সরাসরি শুনেছেন। মালিক, ইবনু শিহাব ও ইবনু জুবায়রের عَنْعَنَة আনআনাহ[২০] সংযুক্ততার উপর প্রযোজ্য; কারণ তাঁরা কেউই মুদাল্লিস নন।
এর রাবীগণ আদিল (ন্যায়পরায়ণ) ও যাবিত (সংরক্ষণক্ষম)
জারহ-তা’দীলের (রাবী মূল্যায়ন শাস্ত্রের) উলামাদের নিকট এই রাবীগণের বিবরণ:
এটি শায নয়
কারণ এর চেয়ে শক্তিশালী কোনো বর্ণনা এর সাথে সাংঘর্ষিক হয়নি।
এতে কোনো ইল্লত (গূঢ় ত্রুটি) নেই
হুকুম (বিধান)
حُكْمُهُছহীহ হাদীছ অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব (অবশ্য পালনীয়); মুহাদ্দিসীন, উসূলবিদ ও ফুকাহাদের মধ্যে যাদের মতামত গ্রহণযোগ্য তাদের সকলের ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা এটি প্রমাণিত। ছহীহ হাদীছ শরীআতের দলীলসমূহের অন্যতম। কোনো মুসলিমের পক্ষে এর উপর আমল পরিত্যাগ করা সমীচীন নয়।
“হাদীছ ছহীহ” বা “হাদীছ গয়র ছহীহ” বলার অর্থ কী
اَلْمُرَادُ بِقَوْلِهِمْ: هَذَا حَدِيْثٌ صَحِيْحٌ“এটি ছহীহ হাদীছ”
এর অর্থ হলো: উপর্যুক্ত পাঁচটি শর্ত এই হাদীছে পূরণ হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, হাদীছটি বাস্তবে সন্দেহাতীতভাবে ছহীহ; কারণ ছিকাহ রাবীরও ভুল বা বিস্মৃতি হওয়া সম্ভব।
“এটি ছহীহ হাদীছ নয়”
এর অর্থ হলো: ছিহহাতের পাঁচটি শর্তের সবকটি বা কিছু এই হাদীছে পূরণ হয়নি। এর অর্থ এই নয় যে, হাদীছটি বাস্তবে মিথ্যা; কারণ অধিক ভুলকারী ব্যক্তিও সঠিক বর্ণনা করতে পারেন।[২১]
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। “ছহীহ” বলা মানে হাদীছটি ছিহহাতের শর্তগুলো পূরণ করেছে বলে গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, আর “গয়র ছহীহ” বলা মানে শর্তগুলো পূরণ হয়নি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই এটি মুহাদ্দিসের গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত (ইজতিহাদ), চূড়ান্ত ও অকাট্য রায় নয়।
কোনো সনদকে কি নিঃশর্তভাবে সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ বলা যায়?
هَلْ يُجْزَمُ فِيْ إِسْنَادٍ أَنَّهُ أَصَحُّ الْأَسَانِيْدِ مُطْلَقًا؟বিশুদ্ধ মত হলো: কোনো নির্দিষ্ট সনদকে নিঃশর্তভাবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ সনদ বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কারণ ছিহহাতের মর্যাদার তারতম্য নির্ভর করে সনদটি ছিহহাতের শর্তগুলো কতটা পরিপূর্ণভাবে পূরণ করেছে তার উপর। সকল শর্তে সর্বোচ্চ মানে পৌঁছানো অত্যন্ত বিরল, তাই কোনো সনদ সম্পর্কে নিঃশর্ত রায় না দেওয়াই উত্তম।
তবে কিছু ইমাম সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন। প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেক ইমাম তাঁর নিকট যা প্রবল মনে হয়েছে তা বলেছেন। সেসব মতামতের কিছু হলো:
পাদটীকা
[১৮] অর্থাৎ ছহীহ লিযাতিহী।
[১৯] বুখারী, কিতাবুল আযান, অধ্যায়: মাগরিবে উচ্চৈঃস্বরে কিরাআত; ২/২৪৭, হাদীছ নং ৭৬৫ (এই শব্দে)।
[২০] আনআনাহ হলো: শায়খ থেকে “عَنْ” শব্দ দিয়ে হাদীছ বর্ণনা করা। আনআনাহর বিধান সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা মু’আনআন প্রকারে আসবে।
[২১] দেখুন: তাদরীবুর রাবী (تَدْرِيْبُ الرَّاوِي), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬।
[২২] তিনি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহুমা।
[২৩] তিনি হলেন আলী ইবনু আবী তালিব রদিয়াল্লাহু আনহু।
[২৪] তিনি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রদিয়াল্লাহু আনহু।
ছহীহ হাদীছের প্রথম স্বতন্ত্র সংকলন কোনটি?
مَا هُوَ أَوَّلُ مُصَنَّفٍ فِي الصَّحِيْحِ الْمُجَرَّدِ؟শুধু ছহীহ হাদীছ সংকলনের উদ্দেশ্যে রচিত প্রথম গ্রন্থ হলো ছহীহুল বুখারী (صَحِيْحُ الْبُخَارِيّ), অতঃপর ছহীহ মুসলিম (صَحِيْحُ مُسْلِم)। কুরআনের পর এই দুটি গ্রন্থ সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব এবং উম্মত ঐকমত্যের সাথে এই দুটি গ্রন্থকে গ্রহণ করেছে।
ছহীহুল বুখারী উভয়ের মধ্যে অধিক বিশুদ্ধ এবং অধিক ফায়দাপূর্ণ। এর কারণ হলো: বুখারীর হাদীছসমূহের সনদ অধিক সংযুক্ত, রাবীগণ অধিক নির্ভরযোগ্য এবং এতে এমন ফিকহী ইস্তিম্বাত (শরঈ বিধান উদ্ঘাটন) ও হিকমতপূর্ণ সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে যা ছহীহ মুসলিমে নেই।
তবে ছহীহুল বুখারী অধিক বিশুদ্ধ হওয়ার এই কথাটি সামগ্রিক বিবেচনায়। অন্যথায় মুসলিমের কিছু হাদীছ বুখারীর কিছু হাদীছের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। কেউ কেউ বলেছেন যে ছহীহ মুসলিম অধিক বিশুদ্ধ, তবে সঠিক মত হলো প্রথম মতটিই।
বুখারী ও মুসলিম তাঁদের ছহীহ গ্রন্থদ্বয়ে সকল ছহীহ হাদীছ সংকলন করেননি এবং তার অঙ্গীকারও করেননি।
ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “আমি আমার কিতাব আল-জামি’তে শুধু ছহীহ হাদীছই অন্তর্ভুক্ত করেছি এবং কিতাব দীর্ঘ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক ছহীহ হাদীছ বাদ দিয়েছি।”[২৫]
ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন: “আমার নিকট যা কিছু ছহীহ তার সবই আমি এখানে অন্তর্ভুক্ত করিনি। বরং আমি শুধু সেগুলোই অন্তর্ভুক্ত করেছি যেগুলোর ব্যাপারে (মুহাদ্দিসগণের) ঐকমত্য রয়েছে।”[২৬]
হাফিয ইবনুল আখরাম বলেন: তাঁদের সামান্যই বাদ পড়েছে। তবে এই মতের সমালোচনা করা হয়েছে।
তাঁদের অনেক ছহীহ হাদীছ বাদ পড়েছে। ইমাম বুখারী নিজেই বলেছেন: “আমি ছহীহ হাদীছসমূহের মধ্য থেকে যা বাদ দিয়েছি তা (এই কিতাবে অন্তর্ভুক্ত করা হাদীছের চেয়ে) বেশি।” তিনি আরও বলেন: “আমি এক লক্ষ ছহীহ হাদীছ এবং দুই লক্ষ গয়র ছহীহ হাদীছ মুখস্থ রাখি” [২৬-খ]
| গ্রন্থ | পুনরাবৃত্তিসহ | পুনরাবৃত্তি বাদে |
|---|---|---|
| ছহীহুল বুখারী | ৭,২৭৫ | প্রায় ৪,০০০ |
| ছহীহ মুসলিম | ১২,০০০ | প্রায় ৪,০০০ |
সেগুলো অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলিতে পাওয়া যাবে, যেমন:
ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ (صَحِيْحُ ابْنِ خُزَيْمَةَ), ছহীহ ইবনু হিব্বান (صَحِيْحُ ابْنِ حِبَّانَ), মুস্তাদরাকুল হাকিম (مُسْتَدْرَكُ الْحَاكِمِ), সুনানে আরবা’আহ (السُّنَنُ الْأَرْبَعَة) (চার সুনান গ্রন্থ), সুনানুদ দারাকুতনী (سُنَنُ الدَّارَقُطْنِيّ), সুনানুল বায়হাকী (سُنَنُ الْبَيْهَقِيّ) প্রভৃতি।
এসব গ্রন্থে হাদীছ থাকলেই তা ছহীহ হয়ে যায় না। বরং ছিহহাতের (বিশুদ্ধতার) স্পষ্ট বিবৃতি থাকতে হবে। তবে যেসব গ্রন্থ শুধু ছহীহ হাদীছ সংকলনের শর্ত করেছে (যেমন ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ), সেগুলো ব্যতিক্রম।
মুস্তাদরাক, ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ ও ছহীহ ইবনু হিব্বান
اَلْكَلَامُ عَلَى مُسْتَدْرَكِ الْحَاكِمِ وَصَحِيْحِ ابْنِ خُزَيْمَةَ وَصَحِيْحِ ابْنِ حِبَّانَক. মুস্তাদরাকুল হাকিম (مُسْتَدْرَكُ الْحَاكِمِ)
এটি হাদীছের বিশাল গ্রন্থসমূহের অন্যতম। এর মুছান্নিফ (লেখক) এতে সেসব ছহীহ হাদীছ উল্লেখ করেছেন যেগুলো বুখারী-মুসলিমের শর্তানুযায়ী অথবা তাঁদের যে কোনো একজনের শর্তানুযায়ী ছহীহ, অথচ তাঁরা সংকলন করেননি। একইসাথে তিনি এমন হাদীছও উল্লেখ করেছেন যেগুলো তাঁর নিকট ছহীহ, যদিও বুখারী-মুসলিম কারোরই শর্তানুযায়ী নয়; এগুলোকে তিনি “ছহীহুল ইসনাদ” (সনদ ছহীহ) বলে উল্লেখ করেছেন। মাঝে মাঝে তিনি কিছু অছহীহ হাদীছও উল্লেখ করেছেন, তবে সেগুলোতে সতর্কতা দিয়েছেন।
তিনি তাছহীহের (ছহীহ বলে রায় দেওয়ার) ক্ষেত্রে মুতাসাহিল (শিথিল)। তাই তাঁর গ্রন্থের হাদীছগুলো অনুসন্ধান করে প্রতিটির যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত। ইমাম যাহাবী রহিমাহুল্লাহ এই কাজ করেছেন এবং অধিকাংশ হাদীছের যথাযথ মূল্যায়ন দিয়েছেন, তবে গ্রন্থটি এখনও আরও অনুসন্ধান ও যত্নের প্রয়োজন।[২৭]
খ. ছহীহ ইবনু হিব্বান (صَحِيْحُ ابْنِ حِبَّانَ)
এই গ্রন্থের বিন্যাস অভিনব; এটি অধ্যায় অনুসারেও সাজানো নয় এবং মুসনাদ আকারেও সাজানো নয়। এজন্যই মুছান্নিফ এর নাম রেখেছেন “আত-তাকাসীম ওয়াল আনওয়া'” (التَّقَاسِيْمُ وَالْأَنْوَاعُ)। এই গ্রন্থ থেকে হাদীছ খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন। পরবর্তীকালে কিছু আলিম[২৮] এটিকে অধ্যায় অনুসারে পুনর্বিন্যস্ত করেছেন।
এর মুছান্নিফও তাছহীহের ক্ষেত্রে মুতাসাহিল (শিথিল), তবে হাকিমের তুলনায় তাঁর শিথিলতা কম।[২৯]
গ. ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ (صَحِيْحُ ابْنِ خُزَيْمَةَ)
এটি ছহীহ ইবনু হিব্বানের চেয়ে উচ্চতর মর্যাদার; কারণ মুছান্নিফের তাহাররী (যাচাই-বাছাই) অত্যন্ত কঠোর। এমনকি সনদে সামান্যতম আপত্তি থাকলেও তিনি তাছহীহ থেকে বিরত থাকেন।[২৯]
তিনটি গ্রন্থের মর্যাদাক্রম: ছহীহ ইবনু খুযায়মাহ (সবচেয়ে কঠোর) > ছহীহ ইবনু হিব্বান (কম শিথিল) > মুস্তাদরাকুল হাকিম (সবচেয়ে শিথিল)। তাই এই গ্রন্থগুলো থেকে কোনো হাদীছকে ছহীহ বলে গ্রহণ করার সময় এই তারতম্য মাথায় রাখতে হবে।
ছহীহায়নের উপর মুস্তাখরাজাত
اَلْمُسْتَخْرَجَاتُ عَلَى الصَّحِيْحَيْنِمُسْتَخْرَج মুস্তাখরাজ হলো: কোনো মুছান্নিফ হাদীছের কোনো গ্রন্থের হাদীছগুলো তাঁর নিজস্ব সনদে, মূল গ্রন্থকারের সূত্র ব্যতীত অন্য সূত্রে বর্ণনা করেন, অতঃপর মূল গ্রন্থকারের শায়খের কাছে অথবা তাঁর উপরের কোনো রাবীর কাছে গিয়ে উভয় সনদ মিলিত হয়।
মুস্তাখরাজ (اَلْمُسْتَخْرَجُ)
বুখারীর উপর।
মুস্তাখরাজ (اَلْمُسْتَخْرَجُ)
মুসলিমের উপর।
মুস্তাখরাজ (اَلْمُسْتَخْرَجُ)
উভয়ের (বুখারী ও মুসলিম) উপর।
মুস্তাখরাজকারীগণ ছহীহায়নের শব্দের সাথে মিল রক্ষার অঙ্গীকার করেননি; কারণ তাঁরা তাঁদের নিজ শায়খদের সূত্রে প্রাপ্ত শব্দই বর্ণনা করেন। তাই কিছু কিছু শব্দে সামান্য তারতম্য ঘটেছে।
একইভাবে বায়হাকী, বাগাবী প্রমুখ প্রাচীন মুছান্নিফগণ তাঁদের স্বতন্ত্র গ্রন্থে “বুখারী বর্ণনা করেছেন” বা “মুসলিম বর্ণনা করেছেন” বলে যা উল্লেখ করেছেন, তাতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ ও শব্দে তারতম্য ঘটেছে। তাঁরা “বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন” কথার উদ্দেশ্য হলো এই যে, বুখারী ও মুসলিম এই হাদীছের মূল অংশটি বর্ণনা করেছেন (পুরোপুরি একই শব্দে নাও হতে পারে)।
উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে, কারো জন্য মুস্তাখরাজাত বা উল্লিখিত গ্রন্থসমূহ থেকে হাদীছ উদ্ধৃত করে “বুখারী বর্ণনা করেছেন” বা “মুসলিম বর্ণনা করেছেন” বলা জায়েয নয়; তবে দুটি শর্তের যে কোনো একটি পূরণ হলে ভিন্ন কথা:
বুখারী বা মুসলিমের মূল বর্ণনার সাথে মিলিয়ে দেখা
অর্থাৎ মুস্তাখরাজের হাদীছটি বুখারী-মুসলিমের মূল বর্ণনার সাথে তুলনা করে নিশ্চিত হওয়া যে শব্দ অভিন্ন।
মুস্তাখরাজকারী বা মুছান্নিফ নিজেই বলেছেন: “তাঁরা এই শব্দে বর্ণনা করেছেন”
অর্থাৎ “أَخْرَجَاهُ بِلَفْظِهِ” জাতীয় বক্তব্য থাকা।
ছহীহায়নের উপর মুস্তাখরাজাতের অনেক ফায়দা রয়েছে, যা প্রায় দশটি পর্যন্ত পৌঁছায়। ইমাম সুয়ূতী রহিমাহুল্লাহ তাঁর তাদরীবুর রাবীতে সেগুলো উল্লেখ করেছেন।[৩০] সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফায়দাগুলো হলো:
সনদের উলুও (সনদের সংক্ষিপ্ততা; অর্থাৎ কম রাবীর সনদ)
কারণ মুছতাখরাজকারী যদি বুখারীর সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করতেন, তাহলে সনদে রাবীর সংখ্যা বেশি হতো; কিন্তু তিনি নিজস্ব সূত্রে বর্ণনা করায় সনদে রাবীর সংখ্যা কম হয়েছে (অর্থাৎ সনদ অধিক সংক্ষিপ্ত হয়েছে)।
ছহীহ হাদীছের পরিমাণ বৃদ্ধি
কারণ কিছু হাদীছে অতিরিক্ত শব্দ ও পূর্ণতা পাওয়া যায়।
বহু সূত্রে শক্তি অর্জন
এর ফায়দা হলো: বিরোধপূর্ণ হাদীছের ক্ষেত্রে একটিকে অপরটির উপর তারজীহ (প্রাধান্য) দেওয়া।
বুখারী-মুসলিমের কোন হাদীছগুলো ছহীহ বলে সাব্যস্ত?
مَا هُوَ الْمَحْكُوْمُ بِصِحَّتِهِ مِمَّا رَوَاهُ الشَّيْخَانِ؟পূর্বে আমরা জেনেছি যে বুখারী ও মুসলিম তাঁদের ছহীহ গ্রন্থে শুধু ছহীহ হাদীছই অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং উম্মত তাঁদের গ্রন্থদ্বয় গ্রহণ করেছে। তাহলে কোন হাদীছগুলো ছহীহ বলে সাব্যস্ত এবং উম্মত কোনগুলো গ্রহণ করেছে?
উত্তর হলো: তাঁরা যেসব হাদীছ মুত্তাছিল সনদে (সংযুক্ত সনদে) বর্ণনা করেছেন, সেগুলোই ছহীহ বলে সাব্যস্ত। তবে যেসব হাদীছের সনদের শুরু থেকে এক বা একাধিক রাবী বাদ পড়েছে, সেগুলোকে مُعَلَّق মু’আল্লাক[৩১] বলা হয়।
বুখারীতে মু’আল্লাক হাদীছ অনেক আছে, তবে সেগুলো অধ্যায়ের শিরোনাম ও ভূমিকায় রয়েছে; অধ্যায়ের মূল অংশে এমন একটিও নেই। মুসলিমে মাত্র একটি মু’আল্লাক হাদীছ আছে, তায়াম্মুমের অধ্যায়ে, যা তিনি অন্য কোথাও মুত্তাছিল সনদে সংযুক্ত করেননি।
মু’আল্লাক হাদীছের বিধান নিম্নরূপ:
জাযম (নিশ্চিত) ভাষায় হলে
যেমন: قَالَ (তিনি বলেছেন), أَمَرَ (তিনি আদেশ করেছেন), ذَكَرَ (তিনি উল্লেখ করেছেন); তাহলে এটি যাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে তাঁর থেকে ছহীহ বলে হুকুম।
জাযম ছাড়া হলে
যেমন: يُرْوَى (বর্ণিত আছে), يُذْكَرُ (উল্লেখ করা হয়), يُحْكَى (বলা হয়), رُوِيَ (বর্ণনা করা হয়েছে), ذُكِرَ (উল্লেখ করা হয়েছে); তাহলে এতে যাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে তাঁর থেকে ছহীহ হওয়ার হুকুম নেই। তবে এতে কোনো একেবারে দুর্বল হাদীছও নেই; কারণ “ছহীহ” নামের কিতাবে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাদটীকা
[২৫] কিছু বর্ণনায় “لِمَلَالِ الطُّوْلِ” শব্দ এসেছে। অর্থাৎ তিনি অনেক ছহীহ হাদীছ তাঁর কিতাবে অন্তর্ভুক্ত করেননি, পাছে কিতাব দীর্ঘ হয়ে যায় এবং পাঠকরা এর দৈর্ঘ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
[২৬] অর্থাৎ তাঁর নিকট ছিহহাতের সর্বসম্মত শর্তগুলো যেসব হাদীছে পাওয়া গেছে।
[২৬-খ] উলূমুল হাদীছ (عُلُوْمُ الْحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ১৬।
[২৭] বর্তমানে আমাদের ভাই, মুহাক্কিক, ড. মাহমূদ আল-মীরাহ মুস্তাদরাকের যেসব হাদীছের ব্যাপারে যাহাবী কোনো মূল্যায়ন দেননি সেগুলোর মূল্যায়ন দিচ্ছেন এবং এই কাজ শেষে গ্রন্থটি প্রকাশের ইচ্ছা রাখেন। আল্লাহ তাঁকে মুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
[২৮] তিনি হলেন আমীর আলাউদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবনু বালাবান (মৃত্যু: ৭৩৯ হি.)। তিনি তাঁর পুনর্বিন্যাসের নাম রেখেছেন আল-ইহসান ফী তাকরীবি ইবনু হিব্বান (اَلْإِحْسَانُ فِيْ تَقْرِيْبِ ابْنِ حِبَّانَ)।
[২৯] তাদরীবুর রাবী (تَدْرِيْبُ الرَّاوِي), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৯।
[৩০] তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৫-১১৬।
[৩১] মু’আল্লাক হাদীছের বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে আসবে।
ছহীহ হাদীছের মর্যাদাক্রম
مَرَاتِبُ الصَّحِيْحِপূর্বে আমরা জেনেছি যে কিছু উলামা তাঁদের নিকট সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ কোনটি সে সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন। এর ভিত্তিতে এবং ছিহহাতের অবশিষ্ট শর্তগুলি কতটা পরিপূর্ণভাবে পূরণ হয়েছে তার বিবেচনায় বলা যায়: ছহীহ হাদীছের, সনদের রাবীগণের বিবেচনায়, তিনটি মর্যাদা রয়েছে:
এই আলোচনার সাথে সংযুক্ত হলো ছহীহ হাদীছের আরেকটি মর্যাদাক্রম; যে গ্রন্থে হাদীছটি বর্ণিত সেই বিবেচনায়। এই মর্যাদাক্রম সাতটি:
শায়খায়নের (বুখারী-মুসলিমের) শর্ত
شَرْطُ الشَّيْخَيْنِশায়খায়ন (বুখারী ও মুসলিম) ছহীহ হাদীছের সর্বসম্মত শর্তগুলোর অতিরিক্ত কোনো নির্দিষ্ট শর্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেননি বা চিহ্নিত করেননি। তবে গবেষক উলামায়ে কিরাম তাঁদের রচনারীতি অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা করে যা বুঝতে পেরেছেন, তাকেই প্রত্যেকে তাঁদের শর্ত বা তাঁদের কোনো একজনের শর্ত মনে করেছেন।
এ বিষয়ে সর্বোত্তম যা বলা হয়েছে তা হলো: শায়খায়ন বা তাঁদের কোনো একজনের “শর্ত” বলতে বোঝায়, হাদীছটি তাঁদের উভয়ের বা কোনো একজনের গ্রন্থে ব্যবহৃত রাবীগণের সূত্রে বর্ণিত হওয়া, সেই সাথে শায়খায়ন সেসব রাবী থেকে বর্ণনায় যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তা বিবেচনায় রাখা।
“মুত্তাফাকুন আলাইহি” বলার অর্থ কী?
مَعْنَى قَوْلِهِمْ: مُتَّفَقٌ عَلَيْهِমুহাদ্দিসগণ কোনো হাদীছ সম্পর্কে مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ মুত্তাফাকুন আলাইহি বললে তাঁদের উদ্দেশ্য হলো শায়খায়নের ইত্তিফাক (ঐকমত্য), অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম উভয়ে হাদীছটির ছিহহাতের ব্যাপারে একমত; উম্মতের ইজমা (সর্বসম্মতি) নয়।
তবে ইবনুস সালাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন: “কিন্তু উম্মতের ঐকমত্য এর অনিবার্য পরিণতি এবং এর সাথেই অর্জিত হয়; কারণ শায়খায়ন যে বিষয়ে একমত, উম্মত তা গ্রহণযোগ্য বলে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।”[৩২]
ছহীহ হাদীছের জন্য আযীয হওয়া কি শর্ত?
هَلْ يُشْتَرَطُ فِي الصَّحِيْحِ أَنْ يَكُوْنَ عَزِيْزًا؟বিশুদ্ধ মত হলো: ছহীহ হাদীছের জন্য আযীয হওয়া শর্ত নয়; অর্থাৎ হাদীছের দুটি সনদ থাকা জরুরি নয়। কারণ ছহীহায়ন (বুখারী-মুসলিম) ও অন্যান্য গ্রন্থে এমন অনেক ছহীহ হাদীছ রয়েছে যেগুলো গরীব (একক সূত্রে বর্ণিত)।
কিছু আলিম আযীয হওয়া শর্ত করেছেন, যেমন আবূ আলী আল-জুব্বাঈ আল-মু’তাযিলী এবং হাকিম (মুস্তাদরাক আল হাকিমের মুছান্নিফ)। তবে তাঁদের এই মত উম্মতের ঐকমত্যের পরিপন্থী।
“ইন্নামাল আ’মালু বিন্নিয়্যাত” হাদীছটি এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ: এটি গরীব (সাহাবী পর্যায়ে শুধু উমার রদিয়াল্লাহু আনহু একক), অথচ সকলের ঐকমত্যে ছহীহ। সুতরাং গরীব হওয়া ছিহহাতের (বিশুদ্ধতার) পরিপন্থী নয়।
পাদটীকা
[৩২] উলূমুল হাদীছ (عُلُوْمُ الْحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ২৪।
Discover more from Debunking Misguidance
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
