১ম অধ্যায়: খবর – ২য় পরিচ্ছেদ: ১. বর্ণনাসূত্রের সংখ্যার বিবেচনায় খবরে আহাদের প্রকারভেদ | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

اَلْفَصْلُ الثَّانِيْ: تَقْسِيْمَا خَبَرِ الْآحَادِ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: খবরে আহাদের দুই প্রকারভেদ

অনুবাদকের কথা

প্রথম পরিচ্ছেদে আমরা জেনেছি যে, খবর দুই ভাগে বিভক্ত: মুতাওয়াতির ও আহাদ। এখন এই পরিচ্ছেদে খবরে আহাদকে আরও বিশদভাবে ভাগ করা হবে, দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে:

প্রথম মাবহাছ: বর্ণনাসূত্রের সংখ্যার বিবেচনায় প্রকারভেদ। অর্থাৎ কতজন রাবী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন সেই হিসাবে। এতে তিনটি প্রকার: مَشْهُوْر – মাশহূর (তিন বা ততোধিক রাবী), عَزِيْز – আযীয (দুইজন রাবী), এবং غَرِيْب – গরীব (একজন রাবী)।

দ্বিতীয় মাবহাছ: গ্রহণযোগ্যতা ও প্রত্যাখ্যানের বিবেচনায় প্রকারভেদ। অর্থাৎ হাদীছটি গ্রহণযোগ্য না প্রত্যাখ্যানযোগ্য সেই হিসাবে। এতে দুটি প্রকার: مَقْبُوْل – মাকবূল (গ্রহণযোগ্য) এবং مَرْدُوْد – মারদূদ (প্রত্যাখ্যাত)।

এই দুটি প্রকারভেদ সম্পূর্ণ আলাদা মানদণ্ডে করা হয়েছে এবং একটি অপরটির বিকল্প নয়। একটি হাদীছ একই সাথে “গরীব” (সংখ্যার দিক থেকে) এবং “মাকবূল” (গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে) হতে পারে।

اَلْمَبْحَثُ الْأَوَّلُ: تَقْسِيْمُ خَبَرِ الْآحَادِ بِالنِّسْبَةِ إِلَى عَدَدِ طُرُقِهِ

প্রথম মাবহাছ: বর্ণনাসূত্রের সংখ্যার বিবেচনায় খবরে আহাদের প্রকারভেদ

اَلْمَطْلَبُ الْأَوَّلُ: اَلْمَشْهُوْرُ

প্রথম মাতলাব: মাশহূর

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مَشْهُوْر – মাশহূর শব্দটি ইসমে মাফঊল (কর্মবাচক বিশেষ্য), شَهَرْتُ الْأَمْرَ (আমি বিষয়টি প্রকাশ ও প্রচার করলাম) থেকে উদ্ভূত। প্রসিদ্ধি ও প্রকাশমানতার কারণে একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

مَا رَوَاهُ ثَلَاثَةٌ فَأَكْثَرُ — فِيْ كُلِّ طَبَقَةٍ — مَا لَمْ يَبْلُغْ حَدَّ التَّوَاتُرِ

যে হাদীছ প্রতিটি তবাকায় (স্তরে) তিনজন বা তার বেশি রাবী বর্ণনা করেছেন, তবে তাওয়াতুরের সীমায় পৌঁছেনি।[৬]

উদাহরণ

مِثَالُهُ
মাশহূর হাদীছের উদাহরণ
إِنَّ اللهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنْ صُدُوْرِ الْعُلَمَاءِ، وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ، حَتَّى إِذَا لَمْ يَبْقَ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوْسًا جُهَّالًا، فَسُئِلُوْا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ، فَضَلُّوْا وَأَضَلُّوْا

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ইলমকে এভাবে উঠিয়ে নেবেন না যে, তা উলামাদের অন্তর থেকে ছিনিয়ে নেবেন। বরং তিনি উলামাদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে (অর্থাৎ মৃত্যু) ইলম উঠিয়ে নেবেন। এমনকি যখন কোনো আলিম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ মূর্খদেরকে নেতা বানিয়ে নেবে। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, আর তারা ইলম ছাড়াই ফতওয়া দেবে। ফলে তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।”[৭]

মুস্তাফীয

اَلْمُسْتَفِيْضُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُسْتَفِيْض – মুস্তাফীয শব্দটি ইসমে ফাইল (কর্তৃবাচক বিশেষ্য), اِسْتَفَاضَ থেকে উদ্ভূত, যা فَاضَ الْمَاءُ (পানি উপচে পড়ল) থেকে এসেছে। ব্যাপক প্রসারের কারণে একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।

(খ) পারিভাষিক অর্থ: এর সংজ্ঞায় তিনটি মত রয়েছে:

মুস্তাফীয মাশহূরের সমার্থক

উভয় একই অর্থে ব্যবহৃত।

মুস্তাফীয মাশহূরের চেয়ে সংকীর্ণ অর্থবোধক

কারণ মুস্তাফীযের ক্ষেত্রে সনদের উভয় প্রান্ত (শুরু ও শেষ) সমান হওয়া শর্ত, কিন্তু মাশহূরে এই শর্ত নেই।

মুস্তাফীয মাশহূরের চেয়ে ব্যাপক অর্থবোধক

অর্থাৎ দ্বিতীয় মতের বিপরীত।

অনুবাদকের টীকা

সনদের উভয় প্রান্ত সমান হওয়া বলতে বোঝায়: সনদের শুরুতে (ছাহাবী পর্যায়ে) যতজন রাবী আছেন, শেষেও (মুছান্নিফ পর্যায়ে) ততজন রাবী থাকা। যেমন: তিনজন ছাহাবী থেকে তিনজন তাবিঈ, তাঁদের থেকে তিনজন তাবি’ত তাবিঈ; এভাবে শেষ পর্যন্ত সংখ্যার সমতা বজায় থাকা।

মাশহূর গয়রুল ইছতিলাহী (অপারিভাষিক মাশহূর)

اَلْمَشْهُوْرُ غَيْرُ الْاِصْطِلَاحِيّ

এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো: কোনো নির্ধারিত শর্ত বিবেচনা ছাড়াই মানুষের মুখে মুখে যা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এতে অন্তর্ভুক্ত:

ক. যার একটি মাত্র সনদ রয়েছে।
খ. যার একাধিক সনদ রয়েছে।
গ. যার আদৌ কোনো সনদ নেই।

অপারিভাষিক মাশহূরের প্রকারভেদ

أَنْوَاعُ الْمَشْهُوْرِ غَيْرِ الْاِصْطِلَاحِيّ

অপারিভাষিক মাশহূরের অনেক প্রকার রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রকারগুলো হলো:

শুধু মুহাদ্দিছীনের নিকট প্রসিদ্ধ

উদাহরণ: আনাস রদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীছ: “রাসূলুল্লাহ ﷺ রুকূর পর এক মাস কুনূত পড়েছেন, রি’ল ও যাকওয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে বদদু’আ করেছেন।”[৮]

মুহাদ্দিছীন, উলামা ও সাধারণ মানুষ সকলের নিকট প্রসিদ্ধ

উদাহরণ: “اَلْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ” “প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ।”[৯]

ফুকাহাদের (ফিকহবিদগণের) নিকট প্রসিদ্ধ

উদাহরণ: “أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللهِ الطَّلَاقُ” “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল হলো তালাক।”[১০]

উছূলবিদগণের নিকট প্রসিদ্ধ

উদাহরণ: “رُفِعَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأُ وَالنِّسْيَانُ وَمَا اسْتُكْرِهُوْا عَلَيْهِ” “আমার উম্মত থেকে ভুল, বিস্মৃতি এবং তাদেরকে যে বিষয়ে বাধ্য করা হয়েছে (সেগুলোর দায়) উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।” ইবনু হিব্বান ও হাকিম এটিকে ছহীহ বলেছেন।

নাহবীদের (আরবী ব্যাকরণবিদগণের) নিকট প্রসিদ্ধ

উদাহরণ: “نِعْمَ الْعَبْدُ صُهَيْبٌ، لَوْ لَمْ يَخَفِ اللهَ لَمْ يَعْصِهِ” “ছুহায়ব কতই না উত্তম বান্দা! সে যদি আল্লাহকে ভয় নাও করত, তবুও তাঁর অবাধ্য হতো না।” এর কোনো ভিত্তি নেই।

সাধারণ মানুষের নিকট প্রসিদ্ধ

উদাহরণ: “اَلْعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ” “তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে।” তিরমিযী এটি বর্ণনা করেছেন এবং হাসান বলেছেন।

মাশহূরের হুকুম

حُكْمُ الْمَشْهُوْرِ

পারিভাষিক মাশহূর হোক বা অপারিভাষিক, প্রাথমিকভাবে একে ছহীহ বা গয়র ছহীহ কোনোটাই বলা যায় না। বরং গবেষণার পর প্রতীয়মান হয় যে, এর মধ্যে ছহীহও রয়েছে, হাসানও রয়েছে, যঈফও রয়েছে, এমনকি মাওযূ’ও (বানোয়াট) রয়েছে। তবে পারিভাষিক মাশহূর যদি ছহীহ হয়, তাহলে এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে আযীয ও গরীবের উপর অগ্রাধিকার দেয়।

অনুবাদকের টীকা

এই অগ্রাধিকারের কারণ হলো: মাশহূরে রাবীর সংখ্যা বেশি (তিন বা ততোধিক), তাই ভুল বা বিকৃতির সম্ভাবনা কম। যখন দুটি ছহীহ হাদীছের মধ্যে বাহ্যিক বিরোধ দেখা দেয়, তখন যেটি মাশহূর সেটিকে আযীয ও গরীবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

মাশহূর হাদীছ বিষয়ক গ্রন্থাবলি বলতে এখানে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হাদীছ সংক্রান্ত গ্রন্থ বোঝানো হয়েছে, পারিভাষিক মাশহূর নয়। কারণ উলামায়ে কিরাম পারিভাষিক মাশহূর হাদীছ সংকলন করে আলাদা গ্রন্থ রচনা করেননি। এ ধরনের কিছু গ্রন্থ হলো:

আল-মাকাছিদুল হাসানাহ ফীমাশতাহারা আলাল আলসিনাহ (اَلْمَقَاصِدُ الْحَسَنَةُ فِيْمَا اشْتَهَرَ عَلَى الْأَلْسِنَةِ)

ইমাম সাখাবী রহিমাহুল্লাহ

কাশফুল খফা ওয়া মুযীলুল ইলবাস ফীমাশতাহারা মিনাল হাদীছি আলা আলসিনাতিন নাস (كَشْفُ الْخَفَاءِ وَمُزِيْلُ الْإِلْبَاسِ فِيْمَا اشْتَهَرَ مِنَ الْحَدِيْثِ عَلَى أَلْسِنَةِ النَّاسِ)

ইমাম আজলুনী রহিমাহুল্লাহ

তাময়ীযুত তায়্যিব মিনাল খাবীছ ফীমা ইয়াদূরু আলা আলসিনাতিন নাসি মিনাল হাদীছ (تَمْيِيْزُ الطَّيِّبِ مِنَ الْخَبِيْثِ فِيْمَا يَدُوْرُ عَلَى أَلْسِنَةِ النَّاسِ مِنَ الْحَدِيْثِ)

ইবনুদ দায়বা’ আশ-শায়বানী রহিমাহুল্লাহ

অনুবাদকের টীকা

এই গ্রন্থগুলোর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের মুখে যে হাদীছগুলো প্রচলিত আছে সেগুলোর সনদ ও মান যাচাই করা। অনেক সময় মানুষ এমন কথা হাদীছ মনে করে বলেন যা আদৌ হাদীছ নয়, অথবা যঈফ বা বানোয়াট। এই গ্রন্থগুলো সেসব বর্ণনার সঠিক মূল্যায়ন করে।

পাদটীকা

[৬] নুযহাতুন নাযার, পৃষ্ঠা ২৩ (মর্মার্থ অনুযায়ী)।

[৭] বুখারী, মুসলিম, তবারানী, আহমাদ ও খতীব চারজন ছাহাবীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন; তাঁরা হলেন: আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আছ, যিয়াদ ইবনু লাবীদ, আইশা ও আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহুম। বুখারী, কিতাবুল ইলম, অধ্যায়: কীভাবে ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে; ১/১৯৪, হাদীছ নং ১০০ (এই শব্দে), আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে। মুসলিম, কিতাবুল ইলম, অধ্যায়: ইলম উঠিয়ে নেওয়া; ৪/২০৫৮, হাদীছ নং ১৩, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে। আহমাদ, মুসনাদ ৪/১৬০, ২১৮, যিয়াদ ইবনু লাবীদ থেকে (অনুরূপ অর্থে)। তবারানী, আল-মু’জামুল আওসাত, হাদীছ নং ৬৪০৩, আবূ হুরায়রা থেকে। খতীব, তারীখ বাগদাদ ৫/৩১২, আইশা থেকে।

[৮] বুখারী, কিতাবুল বিতর; ২/৪৯০, হাদীছ নং ১০০৩ (অনুরূপ অর্থে)। মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ; ১/৪৬৮, হাদীছ নং ২৯৯ (এই শব্দে, অতিরিক্ত অংশসহ)।

[৯] বুখারী, কিতাবুল ঈমান; ১/৫৩, হাদীছ নং ১০। মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীছ নং ৬৫।

[১০] হাকিম মুস্তাদরাকে এটিকে ছহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তা সমর্থন করেছেন, তবে ভিন্ন শব্দে: “مَا أَحَلَّ اللهُ شَيْئًا أَبْغَضَ إِلَيْهِ مِنَ الطَّلَاقِ”। দেখুন: মুস্তাদরাক, কিতাবুত তালাক, ২/১৯৬।



اَلْمَطْلَبُ الثَّانِيْ: اَلْعَزِيْزُ

দ্বিতীয় মাতলাব: আযীয

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: عَزِيْز – আযীয শব্দটি ছিফাতে মুশাব্বাহাহ (স্থায়ী বিশেষণ)। এটি হয় عَزَّ يَعِزُّ (আইন-এ কাসরাসহ) থেকে এসেছে, যার অর্থ: কম হওয়া, দুর্লভ হওয়া; অথবা عَزَّ يَعَزُّ (আইন-এ ফাতহাসহ) থেকে এসেছে, যার অর্থ: শক্তিশালী হওয়া, মজবুত হওয়া। একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে হয়তো এর দুর্লভতা ও বিরলতার কারণে, অথবা অন্য সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় এর শক্তি অর্জনের কারণে।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

أَنْ لَا يَقِلَّ رُوَاتُهُ عَنِ اثْنَيْنِ فِيْ جَمِيْعِ طَبَقَاتِ السَّنَدِ

যে হাদীছের রাবী সনদের সকল তবাকাতে (স্তরে) দুইজনের কম নয়।

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

এর অর্থ হলো: সনদের কোনো তবাকাতেই দুইজনের কম রাবী পাওয়া যাবে না। তবে কোনো কোনো তবাকায় তিনজন বা তার বেশি রাবী থাকলে কোনো সমস্যা নেই, শর্ত হলো অন্তত একটি তবাকায় শুধু দুইজন রাবী থাকতে হবে। কারণ বিবেচ্য বিষয় হলো সনদের সর্বনিম্ন তবাকা (অর্থাৎ যে তবাকায় সবচেয়ে কম রাবী আছেন)।

এই সংজ্ঞাটিই বিশুদ্ধ, যেমনটি হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করেছেন।[১১] কিছু উলামা বলেছেন: আযীয হলো দুই বা তিনজনের বর্ণনা। এভাবে তাঁরা কিছু আকৃতিতে আযীযকে মাশহূর থেকে পৃথক করেননি।

অনুবাদকের টীকা

“বিবেচ্য বিষয় সর্বনিম্ন তবাকা (স্তর)” কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি হাদীছের সনদে হয়তো কোনো তবাকায় ১০ জন রাবী আছেন, কিন্তু অন্য একটি তবাকায় মাত্র ২ জন। এক্ষেত্রে হাদীছটি “আযীয” বলে গণ্য হবে, “মাশহূর” নয়; কারণ বিচার হবে সবচেয়ে কম সংখ্যক রাবীবিশিষ্ট তবাকা দিয়ে।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
আযীয হাদীছের উদাহরণ

বুখারী ও মুসলিম আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এবং বুখারী আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُوْنَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ

“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।”[১২]

সনদের বিবরণ: আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন কাতাদাহ ও আব্দুল আযীয ইবনু ছুহায়ব। কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন শু’বাহ ও সাঈদ। আব্দুল আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন ইসমাঈল ইবনু উলাইয়্যাহ ও আব্দুল ওয়ারিছ। এবং এদের প্রত্যেকের থেকে একদল রাবী বর্ণনা করেছেন।

আযীয হাদীছের সনদ চিত্র
রাসূলুল্লাহ ﷺ
আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু

কাতাদাহআব্দুল আযীয ইবনু ছুহায়ব

(দুইজন তাবিঈ)

কাতাদাহ থেকে: শু’বাহসাঈদ

আব্দুল আযীয থেকে: ইসমাঈলআব্দুল ওয়ারিছ

(চারজন)

প্রত্যেকের থেকে একদল রাবী…

আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু

(বুখারী সংকলন করেছেন)

এই হাদীছকে “আযীয” বলা হয়; কারণ সনদের সকল তবাকাতে এর রাবী দুইজনের কম নয়, যদিও কোনো কোনো তবাকায় দুইজনের বেশি রয়েছেন।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

উলামায়ে কিরাম আযীয হাদীছ নিয়ে আলাদা কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। এর কারণ সম্ভবত এই প্রকারের হাদীছের সংখ্যা কম হওয়া এবং এ ধরনের আলাদা গ্রন্থ রচনায় বিশেষ কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফায়দা না থাকা।


পাদটীকা

[১১] দেখুন: আন-নুখবাহ সহ শরাহ, পৃষ্ঠা ২১, ২৪।

[১২] বুখারী, কিতাবুল ঈমান, অধ্যায়: রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ; ১/৮৫, হাদীছ নং ১৫ (এই শব্দে), আনাস থেকে; এবং হাদীছ নং ১৪, আবূ হুরায়রা থেকে (এই শব্দে, “وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ” বাদে এবং শুরুতে “فَوَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ” অতিরিক্ত)। মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীছ নং ৬৯-৭০, উভয়টি আনাস থেকে।



اَلْمَطْلَبُ الثَّالِثُ: اَلْغَرِيْبُ

তৃতীয় মাতলাব: গরীব

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: غَرِيْب – গরীব শব্দটি ছিফাতে মুশাব্বাহাহ (স্থায়ী বিশেষণ), যার অর্থ: একা, অথবা আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে অবস্থানকারী।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

هُوَ مَا يَنْفَرِدُ بِرِوَايَتِهِ رَاوٍ وَاحِدٌ

যে হাদীছ বর্ণনায় একজন মাত্র রাবী (কোনো স্তরে) একাই বর্ণনা করেছেন।

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ সেই হাদীছ যার বর্ণনায় একজন রাবী একক ভাবে বর্ণনা করেছেন (মুতাবা’আত ও শাহিদ ছাড়া), সনদের কোনো একটি তবাকায় (স্তরে) হোক বা একাধিক তবাকায় হোক, এমনকি একটি মাত্র তবাকায় হলেও। সনদের বাকি তবাকাতে একজনের অধিক রাবী থাকলেও কোনো সমস্যা নেই; কারণ বিবেচ্য বিষয় হলো সর্বনিম্ন সংখ্যা।

এর দ্বিতীয় নাম

تَسْمِيَةٌ ثَانِيَةٌ لَهُ

অনেক উলামা গরীবকে আরেকটি নামে অভিহিত করেন: اَلْفَرْد – ফারদ (একক); তাঁরা উভয়কে সমার্থক মনে করেন। তবে কিছু উলামা উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন এবং প্রতিটিকে স্বতন্ত্র প্রকার হিসেবে গণ্য করেছেন।

তবে হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ উভয়কে শাব্দিক ও পারিভাষিক দিক থেকে সমার্থক মনে করেন। তিনি শুধু এটুকু বলেছেন যে, পরিভাষাবিদগণ ব্যবহারের আধিক্য ও স্বল্পতার দিক থেকে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন:

ফারদ

ফারদ (اَلْفَرْد)

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে اَلْفَرْدُ الْمُطْلَقُ – ফারদে মুতলাক (মূলগত ভাবে একক)-এর জন্য ব্যবহৃত হয়।

গরীব

গরীব (اَلْغَرِيْب)

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে اَلْفَرْدُ النِّسْبِيّ – ফারদে নিসবী (আপেক্ষিক একক)-এর জন্য ব্যবহৃত হয়।[১৩]

প্রকারভেদ

أَقْسَامُهُ

তাফাররুদ (একক বর্ণনা) সনদের কোথায় অবস্থিত সেই বিবেচনায় গরীব দুই ভাগে বিভক্ত: غَرِيْبٌ مُطْلَقٌ – গরীবে মুতলাক (নিরঙ্কুশ গরীব) এবং غَرِيْبٌ نِسْبِيٌّ – গরীবে নিসবী (আপেক্ষিক গরীব)।

ক. গরীবে মুতলাক اَلْغَرِيْبُ الْمُطْلَقُ / اَلْفَرْدُ الْمُطْلَقُ

১. সংজ্ঞা: যে হাদীছে গরাবাত (একক বর্ণনা) সনদের মূলে (অর্থাৎ ছাহাবী পর্যায়ে) ঘটেছে; অর্থাৎ সনদের মূলে একজন মাত্র রাবী হাদীছটি একক ভাবে বর্ণনা করেছেন।[১৪]

২. উদাহরণ:

গরীবে মুতলাকের উদাহরণ
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ

“সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।”[১৫]

এই হাদিছটি একমাত্র উমার ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু একাই বর্ণনা করেছেন।

উল্লেখ্য, এই তাফাররুদ (একক বর্ণনা) কখনো সনদের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, আবার কখনো সেই একক বর্ণনাকারী থেকে পরবর্তীতে একাধিক রাবী বর্ণনা করে থাকেন।

খ. গরীবে নিসবী (আপেক্ষিক গরীব) اَلْغَرِيْبُ النِّسْبِيّ / اَلْفَرْدُ النِّسْبِيّ

১. সংজ্ঞা: যে হাদীছে গরাবাত সনদের মধ্যবর্তী কোনো স্থানে ঘটেছে;[১৬] অর্থাৎ সনদের মূলে (ছাহাবী পর্যায়ে) একাধিক রাবী হাদীছটি বর্ণনা করেছেন, কিন্তু পরে তাঁদের থেকে একজন মাত্র রাবী একক বর্ণনা করেছেন।

২. উদাহরণ:

গরীবে নিসবীর উদাহরণ

মালিক, যুহরী থেকে, তিনি আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন:

أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ دَخَلَ مَكَّةَ وَعَلَى رَأْسِهِ الْمِغْفَرُ

“নবী ﷺ মক্কায় প্রবেশ করেছেন এবং তাঁর মাথায় ছিল مِغْفَر – মিগফার (লোহার শিরস্ত্রাণ)।”[১৭]

এই হাদীছটি মালিক একক ভাবে বর্ণনা করেছেন যুহরী থেকে।

৩. এই নামকরণের কারণ: এই প্রকারকে “গরীবে নিসবী” বলা হয় কারণ এতে তাফাররুদ (একক বর্ণনা) একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাপেক্ষে ঘটেছে (অর্থাৎ মালিক যুহরী থেকে এককভাবে বর্ণনা করেছেন), মূলগত ভাবে নয়।।

অনুবাদকের টীকা

গরীবে মুতলাক ও নিসবীর পার্থক্য সহজভাবে:

গরীবে মুতলাক: ছাহাবী পর্যায়ে একজনই বর্ণনা করেছেন। যেমন: “إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ” শুধু উমার রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন; আর কোনো ছাহাবী এটি বর্ণনা করেননি।

গরীবে নিসবী: ছাহাবী পর্যায়ে একাধিক রাবী আছেন, কিন্তু সনদের মাঝখানে কোথাও একজন একক হয়ে গেছেন। যেমন: যুহরী থেকে আনাসের এই হাদীছ অনেকে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এই নির্দিষ্ট হাদীছটি যুহরী থেকে শুধু মালিক একাই বর্ণনা করেছেন।

গরীবে নিসবীর কিছু প্রকার

مِنْ أَنْوَاعِ الْغَرِيْبِ النِّسْبِيّ

কিছু ধরনের গরাবাত বা তাফাররুদ রয়েছে যা গরীবে নিসবীর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা যায়; কারণ এগুলোতে গরাবাত মূলগত ভাবে নয়, বরং কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের সাপেক্ষে গরাবাত ঘটেছে। এই প্রকারগুলো হলো:

কোনো ছিকাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবীর একক বর্ণনা

যেমন মুহাদ্দিছগণ বলেন: “لَمْ يَرْوِهِ ثِقَةٌ إِلَّا فُلَانٌ” (অমুক ছাড়া কোনো ছিকাহ এটি বর্ণনা করেননি)।

কোনো নির্দিষ্ট রাবীর অপর নির্দিষ্ট রাবী থেকে একক বর্ণনা

যেমন মুহাদ্দিছগণ বলেন: “تَفَرَّدَ بِهِ فُلَانٌ عَنْ فُلَانٍ” (অমুক থেকে একমাত্র অমুকই এটি বর্ণনা করেছেন); যদিও হাদীছটি অন্য সূত্রে অন্যদের থেকে বর্ণিত রয়েছে।

কোনো নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চলের অধিবাসীদের একক বর্ণনা

যেমন মুহাদ্দিছগণ বলেন: “تَفَرَّدَ بِهِ أَهْلُ مَكَّةَ” (এটি একমাত্র মক্কাবাসীরা বর্ণনা করেছেন), অথবা “تَفَرَّدَ بِهِ أَهْلُ الشَّامِ” (একমাত্র শামবাসীরা বর্ণনা করেছেন)।

এক শহর বা অঞ্চলের অধিবাসীদের অন্য শহর বা অঞ্চলের অধিবাসীদের থেকে একক বর্ণনা

যেমন মুহাদ্দিছগণ বলেন: “تَفَرَّدَ بِهِ أَهْلُ الْبَصْرَةِ عَنْ أَهْلِ الْمَدِيْنَةِ” (এটি বাছরাবাসীরা মদীনাবাসীদের থেকে একক বর্ণনা করেছেন), অথবা “تَفَرَّدَ بِهِ أَهْلُ الشَّامِ عَنْ أَهْلِ الْحِجَازِ” (শামবাসীরা হিজাযবাসীদের থেকে একক বর্ণনা করেছেন)।

অনুবাদকের টীকা

সনদের মূল (أَصْلُ السَّنَدِ) বলতে কী বোঝায়?

সনদের মূল বলতে সনদের সেই প্রান্ত বোঝায় যেখানে ছাহাবী রয়েছেন। ছাহাবী সনদের একটি অংশ। অতএব, ছাহাবী যদি হাদীছটি একক বর্ণনা করে থাকেন তাহলে হাদীছকে গরীবে মুতলাক বলা হবে।

মুল্লা আলী কারী রহিমাহুল্লাহ হাফিয ইবনু হাজারের কথা থেকে বুঝেছেন যে, ছাহাবীর তাফাররুদ গরাবাত হিসেবে গণ্য হয় না; কারণ ছাহাবীগণের মধ্যে এমন কিছু নেই যা তাঁদের বর্ণনায় ত্রুটি সৃষ্টি করে, অথবা সকল ছাহাবী আদিল (ন্যায়পরায়ণ)। কিন্তু আমার (গ্রন্থকারের) মনে হয় ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহর উদ্দেশ্য এটা ছিল না। কারণ তিনি গরীবের সংজ্ঞায় বলেছেন: “هُوَ مَا يَنْفَرِدُ بِرِوَايَتِهِ رَاوٍ وَاحِدٌ” অর্থাৎ “যে হাদীছ বর্ণনায় একজন মাত্র ব্যক্তি একক, সনদের যেকোনো স্থানে এই তাফাররুদ ঘটুক না কেন”; অর্থাৎ ছাহাবী পর্যায়ে ঘটলেও; কারণ ছাহাবী সনদের একটি অংশ। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। যাই হোক, মুল্লা আলী কারী যা বলেছেন তা কিছু মুহাদ্দিছের মত।

গরীবের আরেকটি প্রকারভেদ

تَقْسِيْمٌ آخَرُ لَهُ

উলামায়ে কিরাম গরীবকে সনদ বা মতনের গরাবাতের বিবেচনায় আরেকভাবে ভাগ করেছেন:

প্রথম প্রকার

মতন ও সনদ উভয়ে গরীব

যে হাদীছের মতন (মূল বক্তব্য) একজন মাত্র রাবী এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

দ্বিতীয় প্রকার

শুধু সনদে গরীব, মতনে নয়

যে হাদীছের মতন একাধিক ছাহাবী বর্ণনা করেছেন, কিন্তু কোনো একজন রাবী ভিন্ন একজন ছাহাবী থেকে এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

তিরমিযীর পরিভাষা

এই দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “غَرِيْبٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ” (এই সূত্রে গরীব)।

গরীব হাদীছের মাযান্ন (প্রাপ্তিস্থান)

مِنْ مَظَانِّ الْغَرِيْبِ

অর্থাৎ যেসব গ্রন্থে গরীব হাদীছের প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়:

মুসনাদুল বাযযার (مُسْنَدُ الْبَزَّارِ)

ইমাম বাযযার রহিমাহুল্লাহ

আল-মু’জামুল আওসাত (اَلْمُعْجَمُ الْأَوْسَطُ)

ইমাম তবারানী রহিমাহুল্লাহ

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

গারাইবু মালিক (غَرَائِبُ مَالِكٍ)

ইমাম দারাকুতনী রহিমাহুল্লাহ

আল-আফরাদ (اَلْأَفْرَادُ)

ইমাম দারাকুতনী রহিমাহুল্লাহ

আস-সুনান আল্লাতী তাফাররাদা বিকুল্লি সুন্নাতিন মিনহা আহলু বালদাহ (اَلسُّنَنُ الَّتِيْ تَفَرَّدَ بِكُلِّ سُنَّةٍ مِنْهَا أَهْلُ بَلْدَةٍ)

ইমাম আবূ দাঊদ আস-সিজিসতানী রহিমাহুল্লাহ

প্রতিটি সুন্নাত যা কোনো নির্দিষ্ট শহরের অধিবাসীরা বর্ণনায় একক।

পাদটীকা

[১৩] নুযহাতুন নাযার, পৃষ্ঠা ২৮।

[১৪] সনদের আছল (মূল) হলো সনদের সেই প্রান্ত যেখানে ছাহাবী রয়েছেন। ছাহাবী সনদের একটি কড়া (অংশ); অর্থাৎ ছাহাবী যদি হাদীছটি একক বর্ণনা করে থাকেন তাহলে হাদীছকে গরীবে মুতলাক বলা হবে। মুল্লা আলী কারী হাফিয ইবনু হাজারের কথার ব্যাখ্যায় বুঝেছেন যে ছাহাবীর তাফাররুদ গরাবাত নয়; তাঁর যুক্তি হলো ছাহাবীগণের মধ্যে ত্রুটিসূচক কিছু নেই, অথবা ছাহাবীগণ সকলেই আদিল। কিন্তু ইবনু হাজারের উদ্দেশ্য তা বলে মনে হয় না; কারণ তিনি গরীবের সংজ্ঞায় বলেছেন: “সনদের যেকোনো স্থানে একজন একক বর্ণনা করলে”; অর্থাৎ ছাহাবী পর্যায়ে হলেও; কারণ ছাহাবী সনদের একটি কড়া। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। যাই হোক, মুল্লা আলী কারী যা বলেছেন তা কিছু মুহাদ্দিছের মত।

[১৫] বুখারী, কিতাবুল ঈমান, হাদীছ নং ১। মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, হাদীছ নং ১৫৫।

[১৬] নুযহাতুন নাযার, পৃষ্ঠা ২৮।

[১৭] বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীছ নং ৪২৮৬। মুসলিম, কিতাবুল হজ্জ, হাদীছ নং ৪৫০।


সারসংক্ষেপ: বর্ণনাসূত্রের সংখ্যার বিবেচনায় খবরে আহাদের প্রকারভেদ

বিষয় মাশহূর (مَشْهُوْر) আযীয (عَزِيْز) গরীব (غَرِيْب)
সর্বনিম্ন রাবী সংখ্যা (প্রতি তবাকায়) ৩ জন ২ জন ১ জন
সর্বোচ্চ সীমা সীমাহীন (তবে একটি তবাকায় অবশ্যই দশ জনের নিচে থাকতে হবে) সীমাহীন (তবে একটি তবাকায় অবশ্যই দুই জন থাকতে হবে) সীমাহীন (তবে একটি তবাকায় অবশ্যই এক জন থাকতে হবে)
বিবেচ্য বিষয় সর্বনিম্ন তবাকা সর্বনিম্ন তবাকা সর্বনিম্ন তবাকা
হুকুম ছহীহ/হাসান/যঈফ/মাওযূ’ হতে পারে ছহীহ/হাসান/যঈফ হতে পারে ছহীহ/হাসান/যঈফ হতে পারে
অন্য নাম মুস্তাফীয (মতভেদসাপেক্ষ) নেই ফারদ
মনে রাখুন

১. মাশহূর, আযীয ও গরীব হওয়া মানেই হাদীছ ছহীহ বা যঈফ নয়। এই বিভাজন শুধু রাবী সংখ্যার ভিত্তিতে; গ্রহণযোগ্যতার বিচার ভিন্ন মানদণ্ডে হয়।

২. তিনটি প্রকারেই বিবেচ্য বিষয় হলো সনদের সর্বনিম্ন তবাকা; সবচেয়ে কম রাবীবিশিষ্ট তবাকা দিয়ে হাদীছের প্রকার নির্ধারিত হয়।

৩. গরীব দুই ভাগে ভাগ হয়: গরীবে মুতলাক (ছাহাবী পর্যায়ে একক) এবং গরীবে নিসবী (মাঝখানের কোনো তবাকায় একক)।

৪. পারিভাষিক মাশহূর ছহীহ হলে আযীয ও গরীবের উপর প্রাধান্য পায়; কারণ অধিক রাবী মানে ত্রুটির সম্ভাবনা কম।

অনুশীলনী প্রশ্ন
  1. মাশহূর, আযীয ও গরীব হাদীছের সংজ্ঞা দিন। তিনটির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
  2. “বিবেচ্য বিষয় সর্বনিম্ন তবাকা” কথাটি কী বোঝায়? উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করুন।
  3. মুস্তাফীয ও মাশহূরের সম্পর্ক নিয়ে তিনটি মত কী কী? “সনদের উভয় প্রান্ত সমান হওয়া” বলতে কী বোঝায়?
  4. পারিভাষিক মাশহূর ও অপারিভাষিক মাশহূরের পার্থক্য কী? অপারিভাষিক মাশহূরের ছয়টি প্রকার উদাহরণসহ লিখুন।
  5. মাশহূর হাদীছ কি সবসময় ছহীহ? ব্যাখ্যা করুন এবং চারটি মানের (ছহীহ, হাসান, যঈফ, মাওযূ’) প্রতিটির একটি করে উদাহরণ দিন।
  6. আযীয হাদীছের সংজ্ঞার ব্যাখ্যায় “অন্তত একটি তবাকায় শুধু দুইজন রাবী থাকতে হবে” কথাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
  7. “লা ইউ’মিনু আহাদুকুম…” হাদীছটি কেন আযীয? সনদ চিত্র এঁকে দেখান।
  8. গরীব ও ফারদের সম্পর্ক কী? হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহর মত কী?
  9. গরীবে মুতলাক ও গরীবে নিসবীর পার্থক্য উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করুন।
  10. গরীবে নিসবীর চারটি উপপ্রকার উল্লেখ করুন।

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading