اَلْفَصْلُ الثَّانِي: تَقْسِيْمَا خَبَرِ الْآحَادِ
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: খবরে আহাদের দুই প্রকারভেদ
প্রথম পরিচ্ছেদে আমরা জেনেছি যে, খবর দুই প্রকার: মুতাওয়াতির ও আহাদ। এখন এই পরিচ্ছেদে খবরে আহাদকে আরও বিশদভাবে ভাগ করা হবে, দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে:
প্রথম মাবহাস: বর্ণনাসূত্রের সংখ্যার বিবেচনায় প্রকারভেদ। অর্থাৎ কতজন রাবী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন সেই হিসাবে। এতে তিনটি প্রকার: مَشْهُوْر মাশহূর (তিন বা ততোধিক রাবী), عَزِيْز আযীয (দুইজন রাবী), এবং غَرِيْب গরীব (একজন রাবী)।
দ্বিতীয় মাবহাস: গ্রহণযোগ্যতা ও প্রত্যাখ্যানের বিবেচনায় প্রকারভেদ। অর্থাৎ হাদীসটি গ্রহণযোগ্য না প্রত্যাখ্যানযোগ্য সেই হিসাবে। এতে দুটি প্রকার: مَقْبُوْل মাকবূল (গ্রহণযোগ্য) এবং مَرْدُوْد মারদূদ (প্রত্যাখ্যাত)।
এই দুটি প্রকারভেদ সম্পূর্ণ আলাদা মানদণ্ডে করা হয়েছে এবং একটি অপরটির বিকল্প নয়। একটি হাদীস একই সাথে “গরীব” (সংখ্যার দিক থেকে) এবং “মাকবূল” (গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে) হতে পারে।
প্রথম মাবহাস: বর্ণনাসূত্রের সংখ্যার বিবেচনায় খবরে আহাদের প্রকারভেদ
প্রথম মাতলাব: মাশহূর
সংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُ(ক) শাব্দিক অর্থ: مَشْهُوْر মাশহূর শব্দটি ইসমে মাফঊল (কর্মবাচক বিশেষ্য), شَهَرْتُ الْأَمْرَ থেকে উদ্ভূত; যার অর্থ: আমি বিষয়টি প্রকাশ ও প্রচার করলাম। প্রসিদ্ধি ও প্রকাশমানতার কারণে একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।
(খ) পারিভাষিক অর্থ:
যে খবর প্রতিটি তবাকায় (স্তরে) তিনজন বা তার বেশি রাবী বর্ণনা করেছেন, তবে তাওয়াতুরের সীমায় পৌঁছেনি।[৬]
উদাহরণ
مِثَالُهُ“নিশ্চয়ই আল্লাহ ইলমকে এভাবে উঠিয়ে নেবেন না যে, তা উলামাদের অন্তর থেকে ছিনিয়ে নেবেন। বরং তিনি উলামাদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেবেন। এমনকি যখন কোনো আলিম অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ মূর্খদেরকে নেতা বানিয়ে নেবে। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, আর তারা ইলম ছাড়াই ফতোয়া দেবে। ফলে তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।”[৭]
মুস্তাফীদ
اَلْمُسْتَفِيْضُ(ক) শাব্দিক অর্থ: مُسْتَفِيْض মুস্তাফীদ শব্দটি ইসমে ফাইল (কর্তৃবাচক বিশেষ্য), اِسْتَفَاضَ থেকে উদ্ভূত, যা فَاضَ الْمَاءُ (পানি উপচে পড়ল) থেকে এসেছে। ব্যাপক প্রসারের কারণে একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে।
(খ) পারিভাষিক অর্থ: এর সংজ্ঞায় তিনটি মত রয়েছে:
মুস্তাফীদ মাশহূরের সমার্থক; উভয় একই অর্থে ব্যবহৃত।
মুস্তাফীদ মাশহূরের চেয়ে সংকীর্ণ অর্থবোধক। কারণ মুস্তাফীদের ক্ষেত্রে সনদের উভয় প্রান্ত (শুরু ও শেষ) সমান হওয়া শর্ত, কিন্তু মাশহূরে এই শর্ত নেই।
মুস্তাফীদ মাশহূরের চেয়ে ব্যাপক অর্থবোধক; অর্থাৎ দ্বিতীয় মতের বিপরীত।
সনদের উভয় প্রান্ত সমান হওয়া বলতে বোঝায়: সনদের শুরুতে (সাহাবী পর্যায়ে) যত রাবী আছেন, শেষেও (মুসান্নিফ পর্যায়ে) তত রাবী থাকা। যেমন: তিনজন সাহাবী থেকে তিনজন তাবিঈ, তাদের থেকে তিনজন তাবি’ তাবিঈ; এভাবে শেষ পর্যন্ত সংখ্যার সমতা বজায় থাকা।
মাশহূর গয়রুল ইসতিলাহী (অপারিভাষিক মাশহূর)
اَلْمَشْهُوْرُ غَيْرُ الْاِصْطِلَاحِيّএর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো এমন বর্ণনা যা কোনো নির্ধারিত শর্ত বিবেচনা ছাড়াই মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এতে অন্তর্ভুক্ত:
যার একটি মাত্র সনদ রয়েছে।
যার একাধিক সনদ রয়েছে।
যার আদৌ কোনো সনদ নেই।
অপারিভাষিক মাশহূরের প্রকারভেদ
أَنْوَاعُ الْمَشْهُوْرِ غَيْرِ الْاِصْطِلَاحِيّঅপারিভাষিক মাশহূরের অনেক প্রকার রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রকারগুলো হলো:
শুধু মুহাদ্দিসীনের নিকট প্রসিদ্ধ
উদাহরণ: আনাস রদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস:
“রাসূলুল্লাহ ﷺ রুকূর পর এক মাস কুনূত পড়েছেন, রি’ল ও যাকওয়ান গোত্রের বিরুদ্ধে বদদু’আ করেছেন।”[৮]
মুহাদ্দিসীন, উলামা ও সাধারণ মানুষ সকলের নিকট প্রসিদ্ধ
উদাহরণ:
“প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ।”[৯]
ফুকাহাদের (ফিকহবিদগণের) নিকট প্রসিদ্ধ
উদাহরণ:
“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল হলো তালাক।”[১০]
উসূলবিদগণের নিকট প্রসিদ্ধ
উদাহরণ:
“আমার উম্মত থেকে ভুল, বিস্মৃতি এবং তাদেরকে যে বিষয়ে বাধ্য করা হয়েছে (সেগুলোর দায়) উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
ইবনু হিব্বান ও হাকিম এটিকে সহীহ বলেছেন।
নাহবীদের (আরবী ব্যাকরণবিদগণের) নিকট প্রসিদ্ধ
উদাহরণ:
“সুহায়ব কতই না উত্তম বান্দা! সে যদি আল্লাহকে ভয় নাও করত, তবুও তাঁর অবাধ্য হতো না।”
এর কোনো ভিত্তি নেই।
সাধারণ মানুষের নিকট প্রসিদ্ধ
উদাহরণ:
“তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে।”
তিরমিযী এটি বর্ণনা করেছেন এবং হাসান বলেছেন।
মাশহূরের হুকুম (বিধান)
حُكْمُ الْمَشْهُوْرِপারিভাষিক মাশহূর হোক বা অপারিভাষিক, প্রাথমিকভাবে একে সহীহ বা গয়র সহীহ কোনোটাই বলা যায় না। বরং গবেষণার পর প্রতীয়মান হয় যে, এর মধ্যে রয়েছে:
সহীহ
যেমন: “اَلْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ…” হাদীস
হাসান
যেমন: “اَلْعَجَلَةُ مِنَ الشَّيْطَانِ” হাদীস
তবে পারিভাষিক মাশহূর যদি সহীহ হয়, তাহলে এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে যা একে عَزِيْز আযীয ও غَرِيْب গরীব-এর উপর অগ্রাধিকার দেয়।
এই অগ্রাধিকারের কারণ হলো: মাশহূরে রাবীর সংখ্যা বেশি (তিন বা ততোধিক), তাই ভুল বা বিকৃতির সম্ভাবনা কম। যখন দুটি সহীহ হাদীসের মধ্যে বাহ্যিক বিরোধ দেখা দেয়, তখন যেটি মাশহূর সেটিকে আযীয বা গরীবের উপর প্রাধান্য দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি
أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِমাশহূর হাদীস বিষয়ক গ্রন্থাবলি বলতে এখানে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হাদীস সংক্রান্ত গ্রন্থ বোঝানো হয়েছে, পারিভাষিক মাশহূর নয়। কারণ উলামায়ে কিরাম পারিভাষিক মাশহূর হাদীস সংকলন করে আলাদা গ্রন্থ রচনা করেননি। এ ধরনের কিছু গ্রন্থ হলো:
আল-মাকাসিদুল হাসানাহ ফীমাশতাহারা আলাল আলসিনাহ (اَلْمَقَاصِدُ الْحَسَنَةُ فِيْمَا اشْتَهَرَ عَلَى الْأَلْسِنَةِ)
কাশফুল খফা ওয়া মুযীলুল ইলবাস ফীমাশতাহারা মিনাল হাদীসি আলা আলসিনাতিন নাস (كَشْفُ الْخَفَاءِ وَمُزِيْلُ الْإِلْبَاسِ فِيْمَا اشْتَهَرَ مِنَ الْحَدِيْثِ عَلَى أَلْسِنَةِ النَّاسِ)
তাময়ীযুত তায়্যিব মিনাল খাবীস ফীমা ইয়াদূরু আলা আলসিনাতিন নাসি মিনাল হাদীস (تَمْيِيْزُ الطَّيِّبِ مِنَ الْخَبِيْثِ فِيْمَا يَدُوْرُ عَلَى أَلْسِنَةِ النَّاسِ مِنَ الْحَدِيْثِ)
এই গ্রন্থগুলোর উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের মুখে যে হাদীসগুলো প্রচলিত আছে সেগুলোর সনদ ও মান যাচাই করা। অনেক সময় মানুষ এমন কথা হাদীস মনে করে বলে যা আদৌ হাদীস নয়, অথবা দুর্বল বা বানোয়াট। এই গ্রন্থগুলো সেসব বর্ণনার সঠিক মূল্যায়ন করে।
পাদটীকা
[৬] নুযহাতুন নাযার (نُزْهَةُ النَّظَرِ), পৃষ্ঠা ২৩, মর্মার্থ অনুযায়ী।
[৭] বুখারী, মুসলিম, তবারানী, আহমাদ ও খতীব চারজন সাহাবীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন; তারা হলেন: আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস, যিয়াদ ইবনু লাবীদ, আইশা ও আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহুম। বুখারী, কিতাবুল ইলম, অধ্যায়: কীভাবে ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে; ১/১৯৪, হাদীস নং ১০০ (এই শব্দে), আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে। মুসলিম, কিতাবুল ইলম, অধ্যায়: ইলম উঠিয়ে নেওয়া; ৪/২০৫৮, হাদীস নং ১৩, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর থেকে। আহমাদ, মুসনাদ ৪/১৬০, ২১৮, যিয়াদ ইবনু লাবীদ থেকে (অনুরূপ অর্থে)। তবারানী, আল-মু’জামুল আওসাত, হাদীস নং ৬৪০৩, আবূ হুরায়রা থেকে। খতীব, তারীখ বাগদাদ ৫/৩১২, আইশা থেকে।
[৮] বুখারী, কিতাবুল বিতর; ২/৪৯০, হাদীস নং ১০০৩ (অনুরূপ অর্থে)। মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ; ১/৪৬৮, হাদীস নং ২৯৯ (এই শব্দে, বাড়তি অংশসহ)।
[৯] বুখারী, কিতাবুল ঈমান; ১/৫৩, হাদীস নং ১০। মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ৬৫।
[১০] হাকিম মুস্তাদরাকে এটিকে সহীহ বলেছেন এবং যাহাবী তা সমর্থন করেছেন, তবে ভিন্ন শব্দে: “مَا أَحَلَّ اللهُ شَيْئًا أَبْغَضَ إِلَيْهِ مِنَ الطَّلَاقِ”। দেখুন: মুস্তাদরাক, কিতাবুত তালাক, ২/১৯৬।
দ্বিতীয় মাতলাব: আযীয
সংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُ(ক) শাব্দিক অর্থ: عَزِيْز আযীয শব্দটি সিফাতে মুশাব্বাহাহ (স্থায়ী বিশেষণ)। এটি হয় عَزَّ يَعِزُّ (আইন-এ কাসরাহসহ) থেকে এসেছে, যার অর্থ: কম হওয়া, দুর্লভ হওয়া; অথবা عَزَّ يَعَزُّ (আইন-এ ফাতহাসহ) থেকে এসেছে, যার অর্থ: শক্তিশালী হওয়া, মজবুত হওয়া।
একে এই নামে অভিহিত করা হয়েছে হয়তো এর দুর্লভতা ও বিরলতার কারণে, অথবা অন্য সূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে এর শক্তিশালী হওয়ার কারণে।
(খ) পারিভাষিক অর্থ:
যে হাদীসের রাবী সনদের কোনো তবাকাতেই (স্তরে) দুইজনের কম নয়।
সংজ্ঞার ব্যাখ্যা
شَرْحُ التَّعْرِيْفِএর অর্থ হলো: সনদের কোনো তবাকাতেই (স্তরে) দুইজনের কম রাবী থাকবে না। তবে কোনো কোনো তবাকায় তিনজন বা তার বেশি রাবী থাকলে কোনো সমস্যা নেই, শর্ত হলো অন্তত একটি তবাকায় শুধু দুইজন রাবী থাকতে হবে। কারণ বিবেচ্য বিষয় হলো সনদের সর্বনিম্ন তবাকা (অর্থাৎ যে তবাকায় (স্তরে) সবচেয়ে কম রাবী আছেন)।
এই সংজ্ঞাটিই বিশুদ্ধ, যেমনটি হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করেছেন।[১১]
কিছু উলামা বলেছেন: আযীয হলো দুই বা তিনজনের বর্ণনা। এভাবে তারা কিছু ক্ষেত্রে আযীযকে মাশহূর থেকে পৃথক করেননি।
উদাহরণ
مِثَالُهُবুখারী ও মুসলিম আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এবং বুখারী আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত (পূর্ণ) মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।”[১২]
সনদের বিবরণ: আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন কাতাদাহ ও আব্দুল আযীয ইবনু সুহায়ব। কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন শু’বাহ ও সাঈদ। আব্দুল আযীয থেকে বর্ণনা করেছেন ইসমাঈল ইবনু উলাইয়্যাহ ও আব্দুল ওয়ারিস। এবং এদের প্রত্যেকের থেকে একদল রাবী বর্ণনা করেছেন।
এই হাদীসকে “আযীয” বলা হয় কারণ সনদের সকল তবাকায় রাবীর সংখ্যা দুইজনের কম নয়, যদিও কোনো কোনো তবাকায় (স্তরে) দুইজনের বেশি রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি
أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِউলামায়ে কিরাম আযীয হাদীস বিষয়ে স্বতন্ত্র কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। এর কারণ সম্ভবত এই যে, আযীয হাদীসের সংখ্যা খুবই কম, এবং এ ধরনের গ্রন্থ রচনায় বিশেষ কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফায়দা অর্জিত হতো না।
পাদটীকা
[১১] দেখুন: আন-নুখবাহ (اَلنُّخْبَةُ) ও এর ব্যাখ্যা নুযহাতুন নাযার, পৃষ্ঠা ২১, ২৪।
[১২] বুখারী, কিতাবুল ঈমান, অধ্যায়: রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ; ১/৮৫, হাদীস নং ১৫ (এই শব্দে), আনাস থেকে। এবং হাদীস নং ১৪, আবূ হুরায়রা থেকে (এই শব্দে, তবে “وَالنَّاسِ أَجْمَعِيْنَ” অংশ নেই এবং শুরুতে “فَوَالَّذِيْ نَفْسِيْ بِيَدِهِ” বাড়তি আছে)। মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ৬৯-৭০, উভয়টি আনাস থেকে।
তৃতীয় মাতলাব: গরীব
সংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُ(ক) শাব্দিক অর্থ: غَرِيْب গরীব শব্দটি সিফাতে মুশাব্বাহাহ (স্থায়ী বিশেষণ), যার অর্থ: একা, অথবা আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে অবস্থানকারী।
(খ) পারিভাষিক অর্থ:
যে হাদীস বর্ণনায় একজন মাত্র রাবী একক।
সংজ্ঞার ব্যাখ্যা
شَرْحُ التَّعْرِيْفِঅর্থাৎ সেই হাদীস যা বর্ণনায় একজন ব্যক্তি একক; হোক সেটা সনদের কোনো একটি তবাকায় (স্তরে), অথবা সনদের কয়েকটি তবাকায়, এমনকি মাত্র একটি তবাকায় হলেও। সনদের বাকি তবাকাগুলোতে একজনের বেশি রাবী থাকলে কোনো সমস্যা নেই; কারণ বিবেচ্য বিষয় হলো সর্বনিম্ন সংখ্যা।
এর দ্বিতীয় নাম
تَسْمِيَةٌ ثَانِيَةٌ لَهُঅনেক উলামা গরীবকে আরেকটি নামে অভিহিত করেন: اَلْفَرْد ফারদ; তারা উভয়কে সমার্থক মনে করেন। তবে কিছু উলামা উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন এবং প্রত্যেকটিকে স্বতন্ত্র প্রকার হিসেবে গণ্য করেছেন।
তবে হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ উভয়কে শাব্দিক ও পারিভাষিক দিক থেকে সমার্থক মনে করেন। তিনি বলেন: পরিভাষাবিদগণ ব্যবহারের আধিক্য ও স্বল্পতার দিক থেকে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন:
ফারদ (اَلْفَرْد)
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে اَلْفَرْدُ الْمُطْلَقُ ফারদে মুতলাক-এর জন্য ব্যবহৃত হয়।
গরীব (اَلْغَرِيْب)
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে اَلْفَرْدُ النِّسْبِيّ ফারদে নিসবী-এর জন্য ব্যবহৃত হয়।[১৩]
প্রকারভেদ
أَقْسَامُهُতাফাররুদ (একক বর্ণনা) সনদের কোথায় অবস্থিত সেই বিবেচনায় গরীব দুই প্রকার: غَرِيْبٌ مُطْلَقٌ গরীবে মুতলাক (পরম গরীব) এবং غَرِيْبٌ نِسْبِيٌّ গরীবে নিসবী (আপেক্ষিক গরীব)।
১. সংজ্ঞা: যে হাদীসে গরাবাত (একক বর্ণনা) সনদের মূলে অবস্থিত; অর্থাৎ সনদের মূলে একজন মাত্র ব্যক্তি হাদীসটি বর্ণনায় একক।[১৪]
২. উদাহরণ:
“সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।”[১৫]
এই হাদীস বর্ণনায় উমার ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু একক।
উল্লেখ্য, এই তাফাররুদ (একক বর্ণনা) কখনো সনদের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে, আবার কখনো সেই একক বর্ণনাকারী থেকে একাধিক রাবী হাদীসটি বর্ণনা করেন।
১. সংজ্ঞা: যে হাদীসে গরাবাত সনদের মধ্যবর্তী কোনো স্থানে অবস্থিত;[১৬] অর্থাৎ সনদের মূলে একাধিক রাবী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, অতঃপর সেই রাবীগণ থেকে একজন মাত্র ব্যক্তি বর্ণনায় একক হয়েছেন।
২. উদাহরণ:
মালিক, যুহরী থেকে, তিনি আনাস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন:
“নবী ﷺ মক্কায় প্রবেশ করেছেন এবং তাঁর মাথায় ছিল মিগফার (লোহার শিরস্ত্রাণ)।”[১৭]
এই হাদীস যুহরী থেকে বর্ণনায় মালিক একক।
৩. এই নামকরণের কারণ: এই প্রকারকে “গরীবে নিসবী” বলা হয় কারণ এতে তাফাররুদ (একক বর্ণনা) একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাপেক্ষে ঘটেছে।
গরীবে নিসবীর কিছু প্রকার
مِنْ أَنْوَاعِ الْغَرِيْبِ النِّسْبِيّকিছু ধরনের গরাবাত বা তাফাররুদ রয়েছে যা গরীবে নিসবীর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা যায়; কারণ এগুলোতে গরাবাত পরম নয়, বরং কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের সাপেক্ষে গরাবাত ঘটেছে। এই প্রকারগুলো হলো:
কোনো সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবীর একক বর্ণনা
যেমন মুহাদ্দিসগণ বলেন: “لَمْ يَرْوِهِ ثِقَةٌ إِلَّا فُلَانٌ” (অমুক ছাড়া কোনো সিকাহ এটি বর্ণনা করেননি)।
কোনো নির্দিষ্ট রাবীর অপর নির্দিষ্ট রাবী থেকে একক বর্ণনা
যেমন মুহাদ্দিসগণ বলেন: “تَفَرَّدَ بِهِ فُلَانٌ عَنْ فُلَانٍ” (অমুক এটি অমুক থেকে বর্ণনায় একক); যদিও হাদীসটি অন্য সূত্রে অন্যদের থেকে বর্ণিত আছে।
কোনো নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চলের অধিবাসীদের একক বর্ণনা
যেমন মুহাদ্দিসগণ বলেন: “تَفَرَّدَ بِهِ أَهْلُ مَكَّةَ” (মক্কাবাসীরা এটি বর্ণনায় একক), অথবা “تَفَرَّدَ بِهِ أَهْلُ الشَّامِ” (শামবাসীরা এটি বর্ণনায় একক)।
এক শহর বা অঞ্চলের অধিবাসীদের অন্য শহর বা অঞ্চলের অধিবাসীদের থেকে একক বর্ণনা
যেমন মুহাদ্দিসগণ বলেন: “تَفَرَّدَ بِهِ أَهْلُ الْبَصْرَةِ عَنْ أَهْلِ الْمَدِيْنَةِ” (বসরাবাসীরা মদীনাবাসীদের থেকে এটি বর্ণনায় একক), অথবা “تَفَرَّدَ بِهِ أَهْلُ الشَّامِ عَنْ أَهْلِ الْحِجَازِ” (শামবাসীরা হিজাযবাসীদের থেকে এটি বর্ণনায় একক)।
সনদের মূল (أَصْلُ السَّنَدِ) বলতে কী বোঝায়?
সনদের মূল বলতে সনদের সেই প্রান্ত বোঝায় যেখানে সাহাবী রয়েছেন। সাহাবী সনদের একটি অংশ। অতএব, যদি কোনো সাহাবী হাদীস বর্ণনায় একক হন, তাহলে সেই হাদীসকে গরীবে মুতলাক বলা হবে।
মুল্লা আলী কারী রহিমাহুল্লাহ হাফিয ইবনু হাজারের কথা থেকে বুঝেছেন যে, সাহাবীর তাফাররুদ গরাবাত হিসেবে গণ্য হয় না; কারণ সাহাবীগণের মধ্যে এমন কিছু নেই যা তাদের বর্ণনায় ত্রুটি সৃষ্টি করে, অথবা সকল সাহাবী ন্যায়পরায়ণ। কিন্তু আমার মনে হয় ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ এটা বোঝাননি। কারণ তিনি গরীবের সংজ্ঞায় বলেছেন: “যে হাদীস বর্ণনায় একজন মাত্র ব্যক্তি একক, সনদের যেকোনো স্থানে এই তাফাররুদ ঘটুক না কেন”; অর্থাৎ সাহাবী পর্যায়ে তাফাররুদ ঘটলেও। কারণ সাহাবী সনদের একটি অংশ। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। যাই হোক, মুল্লা আলী কারী যা বলেছেন সেটি কিছু মুহাদ্দিসের মত।
গরীবের আরেকটি প্রকারভেদ
تَقْسِيْمٌ آخَرُ لَهُউলামায়ে কিরাম গরীবকে সনদ বা মতনের গরাবাতের বিবেচনায় আরেকভাবে ভাগ করেছেন:
মতন ও সনদ উভয়ে গরীব
সেই হাদীস যার মতন বর্ণনায় একজন মাত্র রাবী একক।
শুধু সনদে গরীব, মতনে নয়
সেই হাদীস যার মতন একাধিক সাহাবী বর্ণনা করেছেন, কিন্তু একজন রাবী অন্য কোনো সাহাবী থেকে এটি বর্ণনায় একক।
এই দ্বিতীয় প্রকার সম্পর্কে ইমাম তিরমিযী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “غَرِيْبٌ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ” (এই সূত্রে গরীব)।
গরীব হাদীসের মাযান্ন (প্রাপ্তিস্থান)
مِنْ مَظَانِّ الْغَرِيْبِঅর্থাৎ যেসব গ্রন্থে গরীব হাদীসের প্রচুর উদাহরণ পাওয়া যায়:
মুসনাদুল বাযযার (مُسْنَدُ الْبَزَّارِ)
আল-মু’জামুল আওসাত (اَلْمُعْجَمُ الْأَوْسَطُ)
এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি
أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِগারাইবু মালিক (غَرَائِبُ مَالِكٍ)
আল-আফরাদ (اَلْأَفْرَادُ)
আস-সুনান আল্লাতী তাফাররাদা বিকুল্লি সুন্নাতিন মিনহা আহলু বালদাহ (اَلسُّنَنُ الَّتِيْ تَفَرَّدَ بِكُلِّ سُنَّةٍ مِنْهَا أَهْلُ بَلْدَةٍ)
প্রতিটি সুন্নাত যা কোনো নির্দিষ্ট শহরের অধিবাসীরা বর্ণনায় একক।
পাদটীকা
[১৩] নুযহাতুন নাযার (نُزْهَةُ النَّظَرِ), পৃষ্ঠা ২৮।
[১৪] সনদের মূল (أَصْلُ السَّنَدِ) বলতে সনদের সেই প্রান্ত বোঝায় যেখানে সাহাবী রয়েছেন। বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনুবাদকের টীকায় দেখুন।
[১৫] বুখারী, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ১। মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, হাদীস নং ১৫৫।
[১৬] নুযহাতুন নাযার (نُزْهَةُ النَّظَرِ), পৃষ্ঠা ২৮।
[১৭] বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং ৪২৮৬। মুসলিম, কিতাবুল হাজ্জ, হাদীস নং ৪৫০।
প্রথম মাবহাসের সারসংক্ষেপ
বর্ণনাসূত্রের সংখ্যার বিবেচনায় খবরে আহাদ তিন প্রকার:
| প্রকার | সংজ্ঞা | রাবী সংখ্যা | বিশেষ দ্রষ্টব্য |
|---|---|---|---|
| মাশহূর (مَشْهُوْر) | যা মুতাওয়াতিরের সীমায় না পৌঁছে প্রতিটি তবাকায় (স্তরে) তিন বা ততোধিক রাবী বর্ণনা করেছেন | ≥ ৩ | সহীহ হলে আযীয ও গরীবের উপর অগ্রাধিকার পায় |
| আযীয (عَزِيْز) | যার রাবী কোনো তবাকাতেই দুইজনের কম নয় | ≥ ২ | অত্যন্ত বিরল; স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচিত হয়নি |
| গরীব (غَرِيْب) | যা বর্ণনায় কোনো তবাকায় একজন রাবী একক | ১ | দুই প্রকার: মুতলাক (সনদের মূলে) ও নিসবী (মধ্যবর্তী স্থানে) |
এই তিনটি প্রকারের কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সহীহ বা দঈফ নয়। “মাশহূর” মানেই সহীহ নয়, “গরীব” মানেই দঈফ নয়। এগুলো শুধু রাবী সংখ্যার শ্রেণিবিভাগ; সহীহ-দঈফ নির্ধারণ হয় রাবীদের গুণাবলি ও অন্যান্য শর্ত যাচাইয়ের মাধ্যমে।
- খবরে আহাদকে বর্ণনাসূত্রের সংখ্যার বিবেচনায় কয় ভাগে ভাগ করা হয়? প্রতিটির সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা দিন।
- মাশহূর ও মুস্তাফীদের সম্পর্ক বিষয়ে উলামাদের মতামতগুলো কী কী?
- পারিভাষিক মাশহূর ও অপারিভাষিক মাশহূরের মধ্যে পার্থক্য কী?
- আযীয হাদীসের উদাহরণ দিন এবং ব্যাখ্যা করুন কেন এটি আযীয।
- গরীবে মুতলাক ও গরীবে নিসবীর মধ্যে পার্থক্য কী? প্রতিটির একটি করে উদাহরণ দিন।
- “ইন্নামাল আ’মালু বিন্নিয়্যাত” হাদীসটি কোন প্রকারের গরীব এবং কেন?
- গরীব ও ফারদ কি সমার্থক? হাফিয ইবনু হাজারের মতামত ব্যাখ্যা করুন।
- মাশহূর হাদীস বিষয়ক তিনটি গ্রন্থের নাম ও লেখকের নাম লিখুন।
Discover more from Debunking Misguidance
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
