১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: খ. মারদূদ খবর: (রাবীর ত্রুটির কারণে) ৬. সিকাহগণের বিরোধিতা | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

সিকাহগণের বিরোধিতা (সপ্তম কারণ)

اَلْمُخَالَفَةُ لِلثِّقَاتِ

রাবীর ত্রুটির কারণ যদি সিকাহগণের (নির্ভরযোগ্য রাবীগণের) বিরোধিতা হয় (সপ্তম কারণ), তাহলে এই বিরোধিতা থেকে উলূমুল হাদীসের পাঁচটি প্রকার সৃষ্টি হয়:

সিকাহগণের বিরোধিতা থেকে উদ্ভূত পাঁচটি প্রকার
  • ১. মুদরাজ (اَلْمُدْرَج): বিরোধিতা যদি সনদের বিন্যাস পরিবর্তন করে, অথবা মাওকূফকে (সাহাবীর কথা) মারফূ’র (নবী ﷺ-এর কথা) সাথে মিশিয়ে দেয়।
  • ২. মাকলূব (اَلْمَقْلُوْب): বিরোধিতা যদি আগ-পিছ করার মাধ্যমে হয়।
  • ৩. আল-মাযীদ ফী মুত্তাসিলিল আসানীদ (اَلْمَزِيْدُ فِيْ مُتَّصِلِ الْأَسَانِيْدِ): বিরোধিতা যদি একজন অতিরিক্ত রাবী যোগ করার মাধ্যমে হয়।
  • ৪. মুদতারিব (اَلْمُضْطَرِب): বিরোধিতা যদি এক রাবীর স্থলে অন্য রাবী বসানোর মাধ্যমে হয়, অথবা মতনে পরস্পরবিরোধিতা দেখা দেয় এবং কোনোটিকে প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব না হয়।
  • ৫. মুসাহহাফ (اَلْمُصَحَّف): বিরোধিতা যদি শব্দের পরিবর্তনের মাধ্যমে হয়, তবে বিন্যাস অক্ষুণ্ণ থাকে।

এবার এই পাঁচটি প্রকার পর্যায়ক্রমে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।[১২৫]


মুদরাজ (সংযোজিত)

اَلْمُدْرَجُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُدْرَج মুদরাজ শব্দটি ইসমে মাফঊল, أَدْرَجْتُ (আমি কোনো কিছুর ভেতরে প্রবেশ করালাম, সংযুক্ত করলাম) থেকে উদ্ভূত।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

مَا غُيِّرَ سِيَاقُ إِسْنَادِهِ، أَوْ أُدْخِلَ فِيْ مَتْنِهِ مَا لَيْسَ مِنْهُ بِلَا فَصْلٍ

যে হাদীসের সনদের বিন্যাস পরিবর্তন করা হয়েছে, অথবা যে হাদীসের মতনে এর অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কিছু কোনো বিচ্ছেদ ছাড়াই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।[১২৬]

প্রকারভেদ

أَقْسَامُهُ

মুদরাজ দুই প্রকার: মুদরাজুল ইসনাদ (সনদে সংযোজন) এবং মুদরাজুল মতন (মতনে সংযোজন)।

ক. মুদরাজুল ইসনাদ (সনদে সংযোজন) مُدْرَجُ الْإِسْنَادِ

সংজ্ঞা: যে হাদীসের সনদের বিন্যাস পরিবর্তন করা হয়েছে।

এর একটি আকৃতি: রাবী সনদ বলতে থাকেন, এর মধ্যে কোনো কারণে তিনি নিজের পক্ষ থেকে কিছু কথা বলেন। উপস্থিত কোনো শ্রোতা মনে করে যে সেই কথাটিই ঐ সনদের মতন। ফলে সে এটি সেই সনদসহ বর্ণনা করে; এভাবে সনদের বিন্যাস পরিবর্তিত হয়ে যায়।

মুদরাজুল ইসনাদের উদাহরণ

সাবিত ইবনু মূসা আয-যাহিদের ঘটনা। তিনি বর্ণনা করেন:

مَنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ بِاللَّيْلِ حَسُنَ وَجْهُهُ بِالنَّهَارِ

“যে ব্যক্তি রাতে বেশি সালাত পড়ে, দিনে তার চেহারা সুন্দর হয়।”[১২৭]

ঘটনার মূল বিবরণ: সাবিত ইবনু মূসা শারীক ইবনু আব্দিল্লাহ আল-কাদীর মজলিসে প্রবেশ করলেন। তখন শারীক ইমলা (শ্রুতলিপি) করাচ্ছিলেন এবং বলছিলেন: “আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন আ’মাশ, আবূ সুফিয়ান থেকে, তিনি জাবির থেকে। জাবির বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন…” এই পর্যন্ত বলে তিনি থামলেন, যাতে মুস্তামলী[১২৮] লিখতে পারেন। এমন সময় তিনি সাবিতকে দেখে (তাঁর যুহদ ও তাকওয়ার কারণে) বললেন: “مَنْ كَثُرَتْ صَلَاتُهُ بِاللَّيْلِ حَسُنَ وَجْهُهُ بِالنَّهَارِ” (যে ব্যক্তি রাতে বেশি সালাত পড়ে, দিনে তার চেহারা সুন্দর হয়)। তিনি এই কথাটি সাবিত সম্পর্কে বলেছিলেন। কিন্তু সাবিত মনে করলেন এটিই ঐ সনদের মতন। ফলে তিনি এভাবেই হাদীস হিসেবে বর্ণনা করতে থাকলেন।

খ. মুদরাজুল মতন (মতনে সংযোজন) مُدْرَجُ الْمَتْنِ

সংজ্ঞা: যে হাদীসের মতনে এর অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কিছু কোনো বিচ্ছেদ ছাড়াই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রকারভেদ: তিনটি; সংযোজন কোথায় ঘটেছে তার ভিত্তিতে:[১২৯]

ক. হাদীসের শুরুতে সংযোজন (কম, তবে মাঝখানের চেয়ে বেশি)।
খ. হাদীসের মাঝখানে সংযোজন (সবচেয়ে কম)।
গ. হাদীসের শেষে সংযোজন (সবচেয়ে বেশি ঘটে)।

উদাহরণসমূহ:

ক. হাদীসের শুরুতে সংযোজনের উদাহরণ

এর কারণ হলো: রাবী কোনো কথা বলেন এবং তারপর সেটির দলীল হিসেবে কোনো হাদীস উদ্ধৃত করেন, কিন্তু উভয়ের মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ রাখেন না। ফলে শ্রোতা মনে করে পুরোটাই হাদীস।

যেমন: খতীব বাগদাদী আবূ কাতান ও শাবাবাহর সূত্রে (আলাদাভাবে) শু’বাহ থেকে, মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ থেকে, আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমরা পরিপূর্ণভাবে ওযূ করো। গোড়ালিগুলোর জন্য জাহান্নামের আগুনের শাস্তি!”

এখানে “তোমরা পরিপূর্ণভাবে ওযূ করো” (أَسْبِغُوا الْوُضُوْءَ) অংশটি আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহুর নিজের কথা থেকে মুদরাজ (সংযোজিত)। বুখারীতে আদাম ← শু’বাহ ← মুহাম্মাদ ইবনু যিয়াদ ← আবূ হুরায়রার সূত্রে স্পষ্ট হয়ে যায়: আবূ হুরায়রা বলেন: “তোমরা পরিপূর্ণভাবে ওযূ করো, কারণ আবুল কাসিম ﷺ বলেছেন: গোড়ালিগুলোর জন্য জাহান্নামের আগুনের শাস্তি!

খতীব বলেন: “আবূ কাতান ও শাবাবাহ শু’বাহ থেকে এই বর্ণনায় ভুল করেছেন। বিপুলসংখ্যক রাবী শু’বাহ থেকে আদামের মতোই বর্ণনা করেছেন।”

খ. হাদীসের মাঝখানে সংযোজনের উদাহরণ

ওয়াহীর সূচনা সংক্রান্ত আইশা রদিয়াল্লাহু আনহার হাদীস: “নবী ﷺ হিরা গুহায় তাহান্নুস করতেন, আর তা হলো ইবাদত করা, বেশ কয়েক রাত…”

এখানে “আর তা হলো ইবাদত করা” (وَهُوَ التَّعَبُّد) অংশটি যুহরীর কথা থেকে মুদরাজ।

গ. হাদীসের শেষে সংযোজনের উদাহরণ

আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহুর মারফূ’ হাদীস: “ক্রীতদাসের জন্য খাদ্য ও পোশাক রয়েছে, সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যদি আল্লাহর পথে জিহাদ, হজ্জ ও আমার মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার না থাকত, তাহলে আমি ক্রীতদাস অবস্থায় মৃত্যু পছন্দ করতাম।”

এখানে “সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ!…” থেকে শেষ পর্যন্ত আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহুর নিজের কথা থেকে মুদরাজ। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পক্ষে দাসত্ব কামনা করা অসম্ভব, এবং তাঁর মা তখন জীবিত ছিলেন না যে তিনি তাঁর সাথে সদ্ব্যবহার করবেন।

ইদরাজের (সংযোজনের) উদ্দেশ্যসমূহ

دَوَاعِي الْإِدْرَاجِ
ক. কোনো শরঈ বিধান স্পষ্ট করা।
খ. হাদীস শেষ হওয়ার আগেই এ থেকে কোনো শরঈ বিধান ইস্তিম্বাত (উদ্ঘাটন) করা।
গ. হাদীসের কোনো দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা করা।

ইদরাজ কীভাবে ধরা যায়?

كَيْفَ يُدْرَكُ الْإِدْرَاجُ؟
ক. অন্য সূত্রে হাদীসটি আলাদাভাবে (সংযোজিত অংশ ছাড়া) পাওয়া যাওয়া।
খ. এই বিষয়ে অবগত কোনো ইমামের স্পষ্ট বক্তব্য।
গ. রাবীর নিজের স্বীকৃতি যে তিনি এই কথাটি সংযোজন করেছেন।
ঘ. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পক্ষে সেই কথা বলা অসম্ভব হওয়া।

ইদরাজের হুকুম

حُكْمُ الْإِدْرَاجِ

ইদরাজ মুহাদ্দিসীন, ফুকাহা ও সকলের ইজমা দ্বারা হারাম। তবে দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে করা হলে তা নিষিদ্ধ নয়; যুহরী প্রমুখ ইমামগণ এটি করেছেন।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আল-ফাসলু লিল ওয়াসলিল মুদরাজি ফিন নাকল (اَلْفَصْلُ لِلْوَصْلِ الْمُدْرَجِ فِي النَّقْلِ)

খতীব বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ

তাকরীবুল মানহাজ বিতারতীবিল মুদরাজ (تَقْرِيْبُ الْمَنْهَجِ بِتَرْتِيْبِ الْمُدْرَجِ)

হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ

খতীবের কিতাবের সারসংক্ষেপ ও সংযোজন।


মাকলূব (উল্টানো)

اَلْمَقْلُوْبُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مَقْلُوْب মাকলূব শব্দটি ইসমে মাফঊল, اَلْقَلْب (উল্টানো, কোনো কিছুকে তার আসল অবস্থান থেকে পরিবর্তন করা) থেকে উদ্ভূত।[১৩০]

(খ) পারিভাষিক অর্থ: হাদীসের সনদ বা মতনে কোনো শব্দের স্থলে অন্য শব্দ বসানো; আগ-পিছ করা বা অনুরূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে।[১৩১]

প্রকারভেদ

أَقْسَامُهُ

মাকলূব দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: মাকলূবুস সানাদ (সনদে উল্টানো) ও মাকলূবুল মতন (মতনে উল্টানো)।

ক. মাকলূবুস সানাদ (সনদে উল্টানো)

যেখানে সনদে পরিবর্তন ঘটেছে। এর দুটি আকৃতি:

রাবীর নাম ও তাঁর পিতার নামে আগ-পিছ করা

যেমন: “কা’ব ইবনু মুররাহ” থেকে বর্ণিত হাদীস রাবী “মুররাহ ইবনু কা’ব” হিসেবে বর্ণনা করেন।

অদ্ভুত (গরীব) করার উদ্দেশ্যে এক রাবীর স্থলে অন্য রাবী বসানো

যেমন: “সালিম” থেকে প্রসিদ্ধ কোনো হাদীস রাবী “নাফি'” থেকে বর্ণিত বলে চালিয়ে দেন।

রাবীদের মধ্যে যাঁরা এটি করতেন তাঁদের অন্যতম হাম্মাদ ইবনু আমর আন-নাসীবী। তাঁর একটি উদাহরণ: তিনি আ’মাশ থেকে, আবূ সালিহ থেকে, আবূ হুরায়রা থেকে মারফূআন বর্ণনা করেন: “إِذَا لَقِيْتُمُ الْمُشْرِكِيْنَ فِيْ طَرِيْقٍ فَلَا تَبْدَءُوْهُمْ بِالسَّلَامِ” (মুশরিকদের সাথে পথে সাক্ষাৎ হলে তাদেরকে প্রথমে সালাম দিও না)। এটি মাকলূব; হাম্মাদ এটি উল্টে আ’মাশের দিকে সম্বন্ধ করেছেন, অথচ এটি সুহায়ল ইবনু আবী সালিহ থেকে, তাঁর পিতা থেকে, আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত বলে প্রসিদ্ধ। মুসলিম এভাবেই তাঁর সহীহে সংকলন করেছেন।

এই ধরনের কলব (উল্টানো)-কারী রাবী সম্পর্কে বলা হয়: “সে হাদীস চুরি করে।”

খ. মাকলূবুল মতন (মতনে উল্টানো)

যেখানে মতনে পরিবর্তন ঘটেছে। এর দুটি আকৃতি:

মতনের কিছু অংশে আগ-পিছ করা

যেমন: সহীহ মুসলিমে আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস, সাতটি শ্রেণি যাদেরকে আল্লাহ তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। এতে রয়েছে: “এমন ব্যক্তি যে সাদাকাহ করে গোপনে, এমনকি তার ডান হাত জানে না বাম হাত কী খরচ করেছে।” কিছু রাবীর কাছে এটি উল্টে গেছে। প্রকৃত শব্দ হলো: “এমনকি তার বাম হাত জানে না ডান হাত কী খরচ করেছে।”

এক হাদীসের মতন অন্য হাদীসের সনদে এবং এর সনদ অন্য হাদীসের মতনে বসানো

এটি পরীক্ষা বা অন্য উদ্দেশ্যে করা হয়। যেমন বাগদাদবাসীরা ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহকে পরীক্ষা করতে একশটি হাদীসের সনদ ও মতন উল্টে দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তিনি সবকটি কলব (উল্টানো)-এর আগের সঠিক অবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন এবং একটিতেও ভুল করলেননি।

কলবের (উল্টানোর) কারণসমূহ

اَلْأَسْبَابُ الْحَامِلَةُ عَلَى الْقَلْبِ
ক. অদ্ভুত (গরীব) করার উদ্দেশ্য; যাতে মানুষ তাঁর হাদীস বর্ণনায় আগ্রহী হয় এবং তাঁর কাছ থেকে গ্রহণ করে।
খ. পরীক্ষার উদ্দেশ্য; মুহাদ্দিসের মুখস্থশক্তি ও পূর্ণ দবত (সংরক্ষণ ক্ষমতা) যাচাই করা।
গ. অনিচ্ছাকৃত ভুল ও স্মৃতিবিভ্রাট।

কলবের হুকুম

حُكْمُ الْقَلْبِ

কলবের হুকুম এর পেছনের কারণ অনুযায়ী ভিন্ন হয়:

ক. অদ্ভুত করার উদ্দেশ্যে হলে: নিঃসন্দেহে নাজায়েয; কারণ এতে হাদীসের পরিবর্তন রয়েছে, আর এটি বানোয়াটকারীদের কাজ।
খ. পরীক্ষার উদ্দেশ্যে হলে: জায়েয; মুহাদ্দিসের মুখস্থশক্তি ও যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য। তবে শর্ত হলো মজলিস শেষ হওয়ার আগেই সঠিকটি স্পষ্ট করে দিতে হবে।
গ. ভুল ও স্মৃতিবিভ্রাটের কারণে হলে: নিঃসন্দেহে কর্তা তাঁর ভুলে মাযূর (ক্ষমাপ্রাপ্ত), তবে এটি ঘন ঘন ঘটলে তাঁর দবতে (সংরক্ষণ ক্ষমতায়) ত্রুটি সৃষ্টি হয় এবং তিনি দঈফ হয়ে যান।

মাকলূব হাদীসের হুকুম

حُكْمُ الْحَدِيْثِ الْمَقْلُوْبِ

মাকলূব হাদীস দঈফ মারদূদের অন্তর্ভুক্ত; কারণ এটি সিকাহগণের বর্ণনার বিরোধী।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

রাফিউল ইরতিয়াব ফিল মাকলূবি মিনাল আসমাই ওয়াল আলকাব (رَافِعُ الْاِرْتِيَابِ فِي الْمَقْلُوْبِ مِنَ الْأَسْمَاءِ وَالْأَلْقَابِ)

খতীব বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ

গ্রন্থের নাম থেকে প্রতীয়মান হয় যে এটি শুধু সনদে মাকলূবের বিষয়ে।

পাদটীকা

[১২৫] দেখুন: আন-নুখবাহ সহ নুযহাতুন নাযার শরাহ, পৃষ্ঠা ৪৮-৪৯।

[১২৬] দেখুন: আন-নুখবাহ সহ শরাহ, পৃষ্ঠা ৪৮।

[১২৭] ইবনু মাজাহ, অধ্যায়: কিয়ামুল লায়ল; খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২২, হাদীস নং ১৩৩৩।

[১২৮] মুস্তামলী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি মজলিসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে মুহাদ্দিসের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দেন।

[১২৯] তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৭০।

[১৩০] দেখুন: আল-কামূস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১২৩।

[১৩১] দেখুন: আন-নুখবাহ সহ শরাহ, পৃষ্ঠা ৪৯; আন-নুকাত, হাফিয ইবনু হাজার, ২/৮৬৪ (উভয় মর্মার্থ অনুযায়ী)।

আল-মাযীদ ফী মুত্তাসিলিল আসানীদ (সংযুক্ত সনদে অতিরিক্ত সংযোজন)

اَلْمَزِيْدُ فِيْ مُتَّصِلِ الْأَسَانِيْدِ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مَزِيْد মাযীদ শব্দটি ইসমে মাফঊল, زِيَادَة (বৃদ্ধি) থেকে উদ্ভূত। مُتَّصِل মুত্তাসিল হলো مُنْقَطِع-এর (বিচ্ছিন্নের) বিপরীত। أَسَانِيْد আসানীদ হলো ইসনাদের বহুবচন।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

زِيَادَةُ رَاوٍ فِيْ أَثْنَاءِ سَنَدٍ ظَاهِرُهُ الْاِتِّصَالُ

বাহ্যত সংযুক্ত (মুত্তাসিল) কোনো সনদের মাঝখানে একজন অতিরিক্ত রাবী যোগ হওয়া।[১৩২]

উদাহরণ

مِثَالُهُ
আল-মাযীদের উদাহরণ

ইবনুল মুবারক বলেন: আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন সুফিয়ান, আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ থেকে। আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন বিশর ইবনু উবায়দুল্লাহ, তিনি বলেন: আমি আবূ ইদরীসকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: আমি ওয়াসিলাহকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: আমি আবূ মারসাদকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি:

لَا تَجْلِسُوْا عَلَى الْقُبُوْرِ، وَلَا تُصَلُّوْا إِلَيْهَا

“তোমরা কবরের উপর বসো না এবং কবরের দিকে ফিরে সালাত পড়ো না।”[১৩৩]

এই উদাহরণে যিয়াদাহ (অতিরিক্ত সংযোজন)

اَلزِّيَادَةُ فِيْ هَذَا الْمِثَالِ

এই উদাহরণে দুটি স্থানে যিয়াদাহ রয়েছে এবং উভয়ের কারণ ওয়াহম (ভ্রান্তি):

“সুফিয়ান”-এর যিয়াদাহ

এটি ইবনুল মুবারকের নিচের কোনো রাবীর ওয়াহম। কারণ বেশ কয়েকজন সিকাহ রাবী ইবনুল মুবারক থেকে সরাসরি আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ থেকে বর্ণনা করেছেন, সুফিয়ানের নাম উল্লেখ করেননি। এবং তাদের কেউ কেউ (ইবনুল মুবারকের কাছ থেকে) সরাসরি শ্রবণ স্পষ্ট করেছেন।

“আবূ ইদরীস”-এর যিয়াদাহ

এটি ইবনুল মুবারকের ওয়াহম। কারণ বেশ কয়েকজন সিকাহ রাবী আব্দুর রহমান ইবনু ইয়াযীদ থেকে বর্ণনা করেছেন এবং আবূ ইদরীসের নাম উল্লেখ করেননি। এবং তাদের কেউ কেউ বিশরের (সরাসরি) ওয়াসিলাহ থেকে শ্রবণ স্পষ্ট করেছেন।

যিয়াদাহ প্রত্যাখ্যান ও ওয়াহম গণ্য করার শর্ত

شُرُوْطُ رَدِّ الزِّيَادَةِ

যিয়াদাহ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে যিয়াদাহকারীর ওয়াহম গণ্য করার জন্য দুটি শর্ত:

যিনি যিয়াদাহ করেননি তিনি যিয়াদাহকারীর চেয়ে অধিক ইতকানসম্পন্ন (নিখুঁত) হওয়া

যিয়াদাহর স্থানে সামা’ (শ্রবণ) স্পষ্টভাবে উল্লেখিত থাকা

এই দুটি শর্ত বা কোনো একটি পূরণ না হলে যিয়াদাহ প্রাধান্য পাবে এবং গৃহীত হবে। সেক্ষেত্রে যিয়াদাহমুক্ত সনদ মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) গণ্য হবে, তবে এর বিচ্ছিন্নতা গোপন (খফী); এটিই “মুরসালে খফী” নামে পরিচিত।

যিয়াদাহ দাবির বিরুদ্ধে আপত্তিসমূহ

اَلْاِعْتِرَاضَاتُ الْوَارِدَةُ عَلَى ادِّعَاءِ وُقُوْعِ الزِّيَادَةِ

যিয়াদাহ দাবির বিরুদ্ধে দুটি আপত্তি উত্থাপিত হয়:

প্রথম আপত্তি

যিয়াদাহমুক্ত সনদে যিয়াদাহর স্থানে যদি “عَنْ” শব্দ থাকে, তাহলে সেটিকে মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) গণ্য করা উচিত।

জবাব: এই আপত্তি যথার্থ; আপত্তিকারী যেমন বলেছেন তেমনই।

দ্বিতীয় আপত্তি

যিয়াদাহমুক্ত সনদে যিয়াদাহর স্থানে যদি সামা’ (শ্রবণ) স্পষ্ট করা থাকে, তাহলে সম্ভাবনা আছে যে রাবী প্রথমে অন্যের মাধ্যমে শুনেছেন, পরে সরাসরি শুনেছেন।

জবাব: এই সম্ভাবনা বিদ্যমান। তবে উলামায়ে কিরাম কোনো যিয়াদাহকে ওয়াহম বলে রায় দেন কেবল তখনই যখন এর পক্ষে কারীনাহ (সূচক) থাকে।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

তাময়ীযুল মাযীদ ফী মুত্তাসিলিল আসানীদ (تَمْيِيْزُ الْمَزِيْدِ فِيْ مُتَّصِلِ الْأَسَانِيْدِ)

খতীব বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ


মুদতারিব (অস্থির)

اَلْمُضْطَرِبُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُضْطَرِب মুদতারিব শব্দটি ইসমে ফাইল, اِضْطِرَاب ইদতিরাব (বিশৃঙ্খলা, নিয়মের বিপর্যয়) থেকে উদ্ভূত। এর মূল উৎপত্তি সমুদ্রের ঢেউয়ের ইদতিরাব থেকে; অর্থাৎ ঢেউয়ের গতি অত্যধিক বেড়ে যাওয়া এবং পরস্পরে আঘাত করা।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

مَا رُوِيَ عَلَى أَوْجُهٍ مُخْتَلِفَةٍ مُتَسَاوِيَةٍ فِي الْقُوَّةِ

যে হাদীস বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী আকারে বর্ণিত হয়েছে এবং সকল বর্ণনা শক্তিতে সমান।[১৩৪]

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ সেই হাদীস যা পরস্পরবিরোধী ও পরস্পরবিদ্ধ বিভিন্ন আকারে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে কোনোভাবেই সমন্বয় সম্ভব নয় এবং সকল বর্ণনা সকল দিক থেকে শক্তিতে সমান, ফলে কোনো একটিকে অপরটির উপর কোনো তারজীহের (প্রাধান্য নির্ণয়ের) উপায়ে প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব নয়।

ইদতিরাব প্রমাণিত হওয়ার শর্ত

شُرُوْطُ تَحَقُّقِ الْاِضْطِرَابِ

সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোনো হাদীসকে মুদতারিব বলা যাবে না, যতক্ষণ না দুটি শর্ত পূরণ হয়:

বর্ণনাগুলোর পারস্পরিক বিরোধিতা, যেগুলোর মধ্যে সমন্বয় সম্ভব নয়

বর্ণনাগুলো শক্তিতে সমান হওয়া, ফলে কোনো একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব না হওয়া

তবে যদি কোনো একটি বর্ণনা অপরটির উপর প্রাধান্য পায়, অথবা গ্রহণযোগ্যভাবে সমন্বয় সম্ভব হয়, তাহলে হাদীস থেকে ইদতিরাবের বিশেষণ দূর হয়ে যাবে। তারজীহের ক্ষেত্রে প্রাধান্যপ্রাপ্ত বর্ণনার উপর আমল করব, আর সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সকল বর্ণনার উপর আমল করব।

প্রকারভেদ

أَقْسَامُهُ

ইদতিরাব কোথায় ঘটেছে তার ভিত্তিতে দুই প্রকার: মুদতারিবুস সানাদ (সনদে ইদতিরাব) ও মুদতারিবুল মতন (মতনে ইদতিরাব)। সনদে ইদতিরাব অধিক ঘটে।

ক. মুদতারিবুস সানাদের উদাহরণ:

সনদে ইদতিরাবের উদাহরণ

আবূ বকর রদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস; তিনি বলেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি দেখছি আপনি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন।” তিনি ﷺ বললেন: “شَيَّبَتْنِيْ هُوْدٌ وَأَخَوَاتُهَا” “সূরা হূদ ও তার বোনেরা (অনুরূপ সূরাসমূহ) আমাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে।”[১৩৫]

দারাকুতনী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “এটি মুদতারিব। কারণ এটি শুধু আবূ ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত এবং তাঁর থেকে প্রায় দশটি ভিন্ন ভিন্ন আকারে বর্ণিত হয়েছে। কেউ মুরসাল হিসেবে, কেউ মাওসূল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কেউ আবূ বকরের মুসনাদে, কেউ সা’দের মুসনাদে, কেউ আইশার মুসনাদে রেখেছেন, ইত্যাদি। সকল রাবী সিকাহ, কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দেওয়া সম্ভব নয় এবং সমন্বয়ও অসম্ভব।”[১৩৬]

খ. মুদতারিবুল মতনের উদাহরণ:

মতনে ইদতিরাবের উদাহরণ

তিরমিযী শারীকের সূত্রে, আবূ হামযাহ থেকে, শা’বী থেকে, ফাতিমাহ বিনতু কায়স রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে যাকাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:

তিরমিযীর বর্ণনা: “إِنَّ فِي الْمَالِ لَحَقًّا سِوَى الزَّكَاةِ” “নিশ্চয়ই সম্পদে যাকাত ছাড়াও অধিকার রয়েছে।”[১৩৭]

ইবনু মাজাহর বর্ণনা (একই সূত্রে): “لَيْسَ فِي الْمَالِ حَقٌّ سِوَى الزَّكَاةِ” “সম্পদে যাকাত ছাড়া কোনো অধিকার নেই।”[১৩৮]

ইরাকী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “এটি এমন ইদতিরাব যা তা’বীলের (ব্যাখ্যার) অবকাশ রাখে না।”

কার থেকে ইদতিরাব ঘটে?

مِمَّنْ يَقَعُ الْاِضْطِرَابُ؟
ক. একজন রাবী থেকে; তিনি হাদীসটি বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী আকারে বর্ণনা করেন।
খ. একদল রাবী থেকে; তাদের প্রত্যেকে হাদীসটি অন্যদের থেকে ভিন্ন আকারে বর্ণনা করেন।

মুদতারিব দুর্বল হওয়ার কারণ

سَبَبُ ضَعْفِ الْمُضْطَرِبِ

মুদতারিব দুর্বল হওয়ার কারণ হলো: ইদতিরাব রাবীগণের দবত (সংরক্ষণ ক্ষমতা)-এর ঘাটতির নির্দেশক।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আল-মুকতারিব ফী বায়ানিল মুদতারিব (اَلْمُقْتَرِبُ فِيْ بَيَانِ الْمُضْطَرِبِ)

হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ


মুসাহহাফ (বিকৃত)

اَلْمُصَحَّفُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُصَحَّف মুসাহহাফ শব্দটি ইসমে মাফঊল, تَصْحِيْف তাসহীফ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ: সহীফাহ (পাণ্ডুলিপি) পাঠে ভুল করা। এ থেকে صُحُفِيّ সুহুফী শব্দ এসেছে, যার অর্থ: সেই ব্যক্তি যে সহীফাহ পাঠে ভুল করে[১৩৯] এবং কিছু শব্দ বিকৃত করে ফেলে; ভুল পাঠের কারণে।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

تَغْيِيْرُ الْكَلِمَةِ فِي الْحَدِيْثِ إِلَى غَيْرِ مَا رَوَاهَا الثِّقَاتُ، لَفْظًا أَوْ مَعْنًى

হাদীসের কোনো শব্দকে সিকাহগণ যেভাবে বর্ণনা করেছেন তা থেকে ভিন্নভাবে পরিবর্তন করা; শব্দগতভাবে হোক বা অর্থগতভাবে হোক।[১৪০]

গুরুত্ব ও সূক্ষ্মতা

أَهَمِّيَّتُهُ وَدِقَّتُهُ

এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সূক্ষ্ম শাস্ত্র। এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে কিছু রাবীর ভুলগুলো চিহ্নিত করায়। কেবল দারাকুতনীর মতো সুদক্ষ হাফিযগণই এই দায়িত্ব পালনে সক্ষম।

প্রকারভেদ

تَقْسِيْمَاتُهُ

উলামায়ে কিরাম মুসাহহাফকে তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে ভাগ করেছেন:

ক. অবস্থানের বিবেচনায়: দুই প্রকার

সনদে তাসহীফ

উদাহরণ: শু’বাহর হাদীস, “الْعَوَّامِ بْنِ مُرَاجِمٍ” থেকে। ইবনু মাঈন তাসহীফ করে বলেন: “الْعَوَّامِ بْنِ مُزَاحِمٍ”

মতনে তাসহীফ

উদাহরণ: যায়দ ইবনু সাবিত রদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস: “নবী ﷺ মসজিদে احْتَجَرَ (পর্দা দিলেন)…” ইবনু লাহীআহ তাসহীফ করে বললেন: “احْتَجَمَ” (শিঙ্গা লাগালেন) মসজিদে।

খ. উৎসের বিবেচনায়: দুই প্রকার

তাসহীফুল বাসার (দৃষ্টিজনিত তাসহীফ) (অধিক ঘটে)

অর্থাৎ হস্তলিপির অস্পষ্টতা বা নোকতা না থাকার কারণে পাঠকের দৃষ্টিতে লেখা ভুলভাবে ধরা পড়ে।

উদাহরণ: “مَنْ صَامَ رَمَضَانَ وَأَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ” (যে ব্যক্তি রমদানে রোযা রাখল এবং শাওয়ালের ছয়দিন রোযা রাখল)। আবূ বকর আস-সূলী তাসহীফ করে বললেন: “شَيْئًا مِنْ شَوَّالٍ” (শাওয়ালের কিছু)। অর্থাৎ “سِتًّا” (ছয়)-কে “شَيْئًا” (কিছু) পড়ে ফেলেছেন।

তাসহীফুস সাম’ (শ্রবণজনিত তাসহীফ)

অর্থাৎ শ্রবণশক্তির দুর্বলতা, দূরত্ব বা অনুরূপ কারণে কিছু শব্দ গুলিয়ে যায়; কারণ সেগুলো একই সারফী (রূপতাত্ত্বিক) ছাঁচে।

উদাহরণ: “عَاصِمٌ الْأَحْوَل” (আসিম আল-আহওয়াল) থেকে বর্ণিত হাদীস কেউ তাসহীফ করে বলেন: “وَاصِلٌ الْأَحْدَب” (ওয়াসিল আল-আহদাব)।

গ. শব্দ বা অর্থের বিবেচনায়: দুই প্রকার

শব্দে তাসহীফ (অধিক ঘটে)

উপরের উদাহরণগুলোর মতো।

অর্থে তাসহীফ

অর্থাৎ রাবী শব্দ যেমন আছে তেমনই রাখেন, কিন্তু এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যা থেকে বোঝা যায় তিনি এর অর্থ ভুল বুঝেছেন।

উদাহরণ: আবূ মূসা আল-আনাযী বলেন: “আমরা একটি সম্মানিত গোত্র, আমরা আনাযাহ গোত্রের। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের দিকে ফিরে সালাত পড়েছেন।” তিনি এর দ্বারা হাদীসটি বোঝাতে চেয়েছেন: “নবী ﷺ একটি আনাযাহর দিকে ফিরে সালাত পড়েছেন।” তিনি ভেবেছেন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের গোত্রের দিকে ফিরে সালাত পড়েছেন। অথচ এখানে عَنَزَة আনাযাহ অর্থ হলো ছোট বর্শা, যা মুসল্লীর সামনে পুঁতে রাখা হয় (সুতরাহ হিসেবে)।

হাফিয ইবনু হাজারের প্রকারভেদ

تَقْسِيْمُ الْحَافِظِ ابْنِ حَجَرٍ

হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ তাসহীফকে ভিন্নভাবে দুই ভাগে ভাগ করেছেন:

মুসাহহাফ (مُصَحَّف)

যেখানে পরিবর্তন হরফের নোকতায় (বিন্দুতে), লেখার আকৃতি অপরিবর্তিত থেকে।

মুহাররাফ (مُحَرَّف)

যেখানে পরিবর্তন হরফের শকলে (হারাকাতে), লেখার আকৃতি অপরিবর্তিত থেকে।

তাসহীফ কি রাবীর ক্ষতি করে?

هَلْ يَقْدَحُ التَّصْحِيْفُ فِي الرَّاوِي؟
ক. যদি তাসহীফ বিরলভাবে ঘটে, তাহলে রাবীর দবতে (সংরক্ষণ ক্ষমতায়) ক্ষতি করে না; কারণ ভুল ও সামান্য তাসহীফ থেকে কেউই মুক্ত নয়।
খ. যদি এটি ঘন ঘন ঘটে, তাহলে রাবীর দবতে ক্ষতি করে এবং এটি নির্দেশ করে যে তাঁর দবত দুর্বল এবং তিনি এই শাস্ত্রের যোগ্য ব্যক্তি নন।

অধিক তাসহীফে পতনের কারণ

اَلسَّبَبُ فِيْ وُقُوْعِ الرَّاوِي فِي التَّصْحِيْفِ الْكَثِيْرِ

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কারণ হলো: কিতাব ও সহীফাহর পাতা থেকে হাদীস গ্রহণ করা এবং শায়খ ও উস্তাদগণের কাছ থেকে সরাসরি না শেখা। এজন্যই ইমামগণ এ ধরনের ব্যক্তিদের থেকে হাদীস গ্রহণে সতর্ক করেছেন এবং বলেছেন: “সুহুফী (কিতাব থেকে পাঠকারী) থেকে হাদীস গ্রহণ করো না।” অর্থাৎ যে ব্যক্তি হাদীস সহীফাহ থেকে গ্রহণ করেছে (শায়খ থেকে নয়), তার কাছ থেকে গ্রহণ করো না।

এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি

أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আত-তাসহীফ (اَلتَّصْحِيْف)

ইমাম দারাকুতনী রহিমাহুল্লাহ

ইসলাহু খাতাইল মুহাদ্দিসীন (إِصْلَاحُ خَطَأِ الْمُحَدِّثِيْنَ)

খাত্তাবী রহিমাহুল্লাহ

তাসহীফাতুল মুহাদ্দিসীন (تَصْحِيْفَاتُ الْمُحَدِّثِيْنَ)

আবূ আহমাদ আল-আসকারী রহিমাহুল্লাহ

পাদটীকা

[১৩২] দেখুন: আন-নুখবাহ সহ শরাহ, পৃষ্ঠা ৪৯।

[১৩৩] মুসলিম, কিতাবুল জানাইয; খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ৩৮। তিরমিযী, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৬৭। উভয়ে আবূ ইদরীসসহ ও তাঁকে ছাড়া উভয়ভাবে বর্ণনা করেছেন।

[১৩৪] উলূমুল হাদীস, পৃষ্ঠা ৯৩-৯৪; আত-তাকরীব সহ তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৬২ (উভয় মর্মার্থ অনুযায়ী)।

[১৩৫] তিরমিযী, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ওয়াকিআহর তাফসীর; খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ১৮৪ (তুহফাতুল আহওয়াযী শরাহসহ)। তবে তিরমিযীর শব্দ: “شَيَّبَتْنِيْ هُوْدٌ وَالْوَاقِعَةُ وَالْمُرْسَلَاتُ…”। তিনি বলেন: “হাসান গরীব।”

[১৩৬] তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৬৫।

[১৩৭] তিরমিযী, কিতাবুয যাকাত; খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৮, হাদীস নং ৬৫৯ (এই শব্দে)।

[১৩৮] ইবনু মাজাহ, কিতাবুয যাকাত; খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৭০, হাদীস নং ১৭৮৯ (এই শব্দে)।

[১৩৯] আল-কামূস, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৬৬।

[১৪০] নুখবাতুল ফিকার, পৃষ্ঠা ৪৯; তাওদীহুল আফকার (উভয় মর্মার্থ অনুযায়ী)।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading