১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: ২. গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় খবরে আহাদের প্রকারভেদ (ক.মাকবুল হাদিস: সহীহ লিযাতিহী) | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

اَلْمَبْحَثُ الثَّانِي: تَقْسِيْمُ خَبَرِ الْآحَادِ بِالنِّسْبَةِ إِلَى قُوَّتِهِ وَضَعْفِهِ

দ্বিতীয় মাবহাস: শক্তি ও দুর্বলতার বিবেচনায় খবরে আহাদের প্রকারভেদ

অনুবাদকের কথা

পূর্ববর্তী মাবহাসে আমরা খবরে আহাদকে রাবী সংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ করেছি (মাশহূর, আযীয, গরীব)। এই মাবহাসে খবরে আহাদকে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ডে ভাগ করা হবে: হাদীসটি গ্রহণযোগ্য না প্রত্যাখ্যানযোগ্য সেই বিচারে। এতে দুটি মাতলাব:

প্রথম মাতলাব: مَقْبُوْل মাকবূল (গ্রহণযোগ্য খবর): এর অধীনে চার প্রকার হাদীস: সহীহ লিযাতিহী, সহীহ লিগয়রিহী, হাসান লিযাতিহী, এবং হাসান লিগয়রিহী।

দ্বিতীয় মাতলাব: مَرْدُوْد মারদূদ (প্রত্যাখ্যাত খবর): এর অধীনে দঈফ হাদীস এবং এর বিভিন্ন প্রকার।

اَلْمَطْلَبُ الْأَوَّلُ: اَلْخَبَرُ الْمَقْبُوْلُ

প্রথম মাতলাব: গ্রহণযোগ্য খবর

এই মাতলাবে দুটি মাকসাদ (উদ্দেশ্য) রয়েছে:

প্রথম মাকসাদ: মাকবূলের প্রকারভেদ।
দ্বিতীয় মাকসাদ: মাকবূলকে মা’মূলুন বিহী (আমলযোগ্য) ও গয়রু মা’মূলিন বিহী (আমলের অযোগ্য)-তে বিভক্তকরণ।

প্রথম মাকসাদ: মাকবূলের প্রকারভেদ

গ্রহণযোগ্য খবর তার মর্যাদার তারতম্য অনুযায়ী দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: صَحِيْح সহীহحَسَن হাসান। প্রতিটি আবার দুটি উপভাগে বিভক্ত: لِذَاتِهِ লিযাতিহী (স্বয়ং) ও لِغَيْرِهِ লিগয়রিহী (অন্যের সহায়তায়)। ফলে মাকবূল খবরের মোট চারটি প্রকার দাঁড়ায়:

মাকবূল খবরের প্রকারভেদ
মাকবূল (গ্রহণযোগ্য)
সহীহ (صَحِيْح)
  • ১. সহীহ লিযাতিহী (স্বয়ং সহীহ)
  • ২. সহীহ লিগয়রিহী (অন্যের সহায়তায় সহীহ)
হাসান (حَسَن)
  • ৩. হাসান লিযাতিহী (স্বয়ং হাসান)
  • ৪. হাসান লিগয়রিহী (অন্যের সহায়তায় হাসান)

এবার এই প্রকারগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

সহীহ[১৮]

اَلصَّحِيْحُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: صَحِيْح সহীহ শব্দটি سَقِيْم সাকীম-এর (অসুস্থ) বিপরীত। মূলত এটি শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং হাদীস ও অন্যান্য ক্ষেত্রে রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

مَا اتَّصَلَ سَنَدُهُ بِنَقْلِ الْعَدْلِ الضَّابِطِ، عَنْ مِثْلِهِ إِلَى مُنْتَهَاهُ، مِنْ غَيْرِ شُذُوْذٍ، وَلَا عِلَّةٍ

যে হাদীসের সনদ আদ্যোপান্ত সংযুক্ত (মুত্তাসিল), যেখানে ন্যায়পরায়ণ (আদিল) ও সংরক্ষণক্ষম (দাবিত) রাবী তার সমপর্যায়ের রাবী থেকে বর্ণনা করেন, এবং তাতে কোনো শুযূয (বিচ্ছিন্ন মতানৈক্য) ও ইল্লত (গূঢ় ত্রুটি) নেই।

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

উপর্যুক্ত সংজ্ঞায় এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা একটি হাদীসে সহীহ হওয়ার জন্য অবশ্যই বিদ্যমান থাকতে হবে। সেগুলো হলো:

সনদের ইত্তিসাল (সংযুক্ততা) (اِتِّصَالُ السَّنَدِ)

এর অর্থ হলো: সনদের প্রতিটি রাবী তার ঊর্ধ্বতন রাবী থেকে সরাসরি হাদীস গ্রহণ করেছেন; সনদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত।

রাবীগণের আদালত (ন্যায়পরায়ণতা) (عَدَالَةُ الرُّوَاةِ)

অর্থাৎ সনদের প্রতিটি রাবী এমন ব্যক্তি যিনি মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগ), সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন (আকিল), ফাসিক নন এবং মুরূওয়াহ (ব্যক্তিত্ব ও শালীনতা) বিবর্জিত নন।

রাবীগণের দবত (সংরক্ষণ ক্ষমতা) (ضَبْطُ الرُّوَاةِ)

অর্থাৎ সনদের প্রতিটি রাবী পূর্ণ দবতের অধিকারী; তা হোক ضَبْطُ صَدْرٍ দবতে সদর (স্মৃতির সংরক্ষণ), অথবা ضَبْطُ كِتَابٍ দবতে কিতাব (লিখিত সংরক্ষণ)।

শুযূযের অনুপস্থিতি (عَدَمُ الشُّذُوْذِ)

অর্থাৎ হাদীসটি شَاذّ শায (বিচ্ছিন্ন) না হওয়া। শুযূয হলো: কোনো সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবীর বর্ণনা তার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য রাবীর বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়া।

ইল্লতের অনুপস্থিতি (عَدَمُ الْعِلَّةِ)

অর্থাৎ হাদীসটি مُعَلَّل মু’আল্লাল (ত্রুটিপূর্ণ) না হওয়া। ইল্লত হলো: এমন একটি গূঢ় ও সূক্ষ্ম কারণ যা হাদীসের সিহহাতে (বিশুদ্ধতায়) ত্রুটি সৃষ্টি করে, অথচ বাহ্যত হাদীসটি ত্রুটিমুক্ত মনে হয়।

শর্তাবলি

شُرُوْطُهُ

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, একটি হাদীস সহীহ হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত অবশ্যই পূরণ হতে হবে:

সহীহ হাদীসের পাঁচটি শর্ত
সহীহ হাদীস
শর্ত ১: সনদের ইত্তিসাল (সংযুক্ততা)
শর্ত ২: রাবীগণের আদালত (ন্যায়পরায়ণতা)
শর্ত ৩: রাবীগণের দবত (সংরক্ষণ ক্ষমতা)
শর্ত ৪: শুযূযের (বিচ্ছিন্ন মতানৈক্যের) অনুপস্থিতি
শর্ত ৫: ইল্লতের (গূঢ় ত্রুটির) অনুপস্থিতি
গুরুত্বপূর্ণ

এই পাঁচটি শর্তের যে কোনো একটি অনুপস্থিত হলে হাদীসটিকে সহীহ বলা যাবে না।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
সহীহ হাদীসের উদাহরণ

ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে বলেন:

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ يُوْسُفَ، قَالَ: أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ، عَنْ أَبِيْهِ، قَالَ: سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَرَأَ فِي الْمَغْرِبِ بِالطُّوْرِ

“আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মাগরিবের সালাতে সূরা আত-তূর তিলাওয়াত করতে শুনেছি।”[১৯]

এই হাদীসটি সহীহ, কারণ:

এর সনদ মুত্তাসিল (সংযুক্ত)

প্রতিটি রাবী তাঁর শায়খ (উস্তায) থেকে সরাসরি শুনেছেন। মালিক, ইবনু শিহাব ও ইবনু জুবায়রের عَنْعَنَة আনআনাহ[২০] সংযুক্ততার উপর প্রযোজ্য; কারণ তাঁরা কেউই মুদাল্লিস নন।

খ,গ

এর রাবীগণ আদিল (ন্যায়পরায়ণ) ও দাবিত (সংরক্ষণক্ষম)

জারহ-তা’দীলের (রাবী মূল্যায়ন শাস্ত্রের) উলামাদের নিকট এই রাবীগণের বিবরণ:

সনদের রাবীগণের মর্যাদা
আব্দুল্লাহ ইবনু ইউসুফ
সিকাহ, মুতকিন (নির্ভরযোগ্য, নিখুঁত)
মালিক ইবনু আনাস
ইমাম, হাফিয
ইবনু শিহাব আয-যুহরী
ফকীহ, হাফিয; তাঁর জালালত (মহত্ত্ব) ও ইতকান (নিখুঁততা) সর্বসম্মত
মুহাম্মাদ ইবনু জুবায়র
সিকাহ (নির্ভরযোগ্য)
জুবায়র ইবনু মুত’ইম
সাহাবী

এটি শায নয়

কারণ এর চেয়ে শক্তিশালী কোনো বর্ণনা এর সাথে সাংঘর্ষিক হয়নি।

এতে কোনো ইল্লত (গূঢ় ত্রুটি) নেই

হুকুম (বিধান)

حُكْمُهُ

সহীহ হাদীস অনুযায়ী আমল করা ওয়াজিব (অবশ্য পালনীয়); মুহাদ্দিসীন, উসূলবিদ ও ফুকাহাদের মধ্যে যাদের মতামত গ্রহণযোগ্য তাদের সকলের ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা এটি প্রমাণিত। সহীহ হাদীস শরীআতের দলীলসমূহের অন্যতম। কোনো মুসলিমের পক্ষে এর উপর আমল পরিত্যাগ করা সমীচীন নয়।

“হাদীস সহীহ” বা “হাদীস গয়র সহীহ” বলার অর্থ কী

اَلْمُرَادُ بِقَوْلِهِمْ: هَذَا حَدِيْثٌ صَحِيْحٌ
Also Read:  চতুর্থ অধ্যায়: ইসনাদ এবং তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনা; ১ম অংশ| তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

“এটি সহীহ হাদীস”

এর অর্থ হলো: উপর্যুক্ত পাঁচটি শর্ত এই হাদীসে পূরণ হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, হাদীসটি বাস্তবে সন্দেহাতীতভাবে সহীহ; কারণ সিকাহ রাবীরও ভুল বা বিস্মৃতি হওয়া সম্ভব।

“এটি সহীহ হাদীস নয়”

এর অর্থ হলো: সিহহাতের পাঁচটি শর্তের সবকটি বা কিছু এই হাদীসে পূরণ হয়নি। এর অর্থ এই নয় যে, হাদীসটি বাস্তবে মিথ্যা; কারণ অধিক ভুলকারী ব্যক্তিও সঠিক বর্ণনা করতে পারেন।[২১]

অনুবাদকের টীকা

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। “সহীহ” বলা মানে হাদীসটি সিহহাতের শর্তগুলো পূরণ করেছে বলে গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, আর “গয়র সহীহ” বলা মানে শর্তগুলো পূরণ হয়নি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই এটি মুহাদ্দিসের গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত (ইজতিহাদ), চূড়ান্ত ও অকাট্য রায় নয়।

কোনো সনদকে কি নিঃশর্তভাবে সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ বলা যায়?

هَلْ يُجْزَمُ فِيْ إِسْنَادٍ أَنَّهُ أَصَحُّ الْأَسَانِيْدِ مُطْلَقًا؟

বিশুদ্ধ মত হলো: কোনো নির্দিষ্ট সনদকে নিঃশর্তভাবে সর্বাধিক বিশুদ্ধ সনদ বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কারণ সিহহাতের মর্যাদার তারতম্য নির্ভর করে সনদটি সিহহাতের শর্তগুলো কতটা পরিপূর্ণভাবে পূরণ করেছে তার উপর। সকল শর্তে সর্বোচ্চ মানে পৌঁছানো অত্যন্ত বিরল, তাই কোনো সনদ সম্পর্কে নিঃশর্ত রায় না দেওয়াই উত্তম।

তবে কিছু ইমাম সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন। প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেক ইমাম তাঁর নিকট যা প্রবল মনে হয়েছে তা বলেছেন। সেসব মতামতের কিছু হলো:

সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ সম্পর্কে ইমামগণের মতামত
যুহরী ← সালিম ← তাঁর পিতা (আব্দুল্লাহ ইবনু উমার)[২২]
এই মত বর্ণিত হয়েছে: ইসহাক ইবনু রাহূয়াহ ও ইমাম আহমাদ থেকে
ইবনু সীরীন ← উবায়দাহ ← আলী[২৩]
এই মত বর্ণিত হয়েছে: ইবনুল মাদীনী ও ফাল্লাস থেকে
আ’মাশ ← ইবরাহীম ← আলকামাহ ← আব্দুল্লাহ (ইবনু মাসঊদ)[২৪]
এই মত বর্ণিত হয়েছে: ইবনু মাঈন থেকে
যুহরী ← আলী ইবনুল হুসায়ন ← তাঁর পিতা ← আলী
এই মত বর্ণিত হয়েছে: আবূ বকর ইবনু আবী শায়বাহ থেকে
মালিক ← নাফি’ ← ইবনু উমার
এই মত বর্ণিত হয়েছে: ইমাম বুখারী থেকে

পাদটীকা

[১৮] অর্থাৎ সহীহ লিযাতিহী।

[১৯] বুখারী, কিতাবুল আযান, অধ্যায়: মাগরিবে উচ্চৈঃস্বরে কিরাআত; ২/২৪৭, হাদীস নং ৭৬৫ (এই শব্দে)।

[২০] আনআনাহ হলো: শায়খ থেকে “عَنْ” শব্দ দিয়ে হাদীস বর্ণনা করা। আনআনাহর বিধান সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা মু’আনআন প্রকারে আসবে।

[২১] দেখুন: তাদরীবুর রাবী (تَدْرِيْبُ الرَّاوِي), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬।

[২২] তিনি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনু উমার ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহুমা।

[২৩] তিনি হলেন আলী ইবনু আবী তালিব রদিয়াল্লাহু আনহু।

[২৪] তিনি হলেন আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রদিয়াল্লাহু আনহু।

সহীহ হাদীসের প্রথম স্বতন্ত্র সংকলন কোনটি?

مَا هُوَ أَوَّلُ مُصَنَّفٍ فِي الصَّحِيْحِ الْمُجَرَّدِ؟

শুধু সহীহ হাদীস সংকলনের উদ্দেশ্যে রচিত প্রথম গ্রন্থ হলো সহীহুল বুখারী (صَحِيْحُ الْبُخَارِيّ), অতঃপর সহীহ মুসলিম (صَحِيْحُ مُسْلِم)। কুরআনের পর এই দুটি গ্রন্থ সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব এবং উম্মত ঐকমত্যের সাথে এই দুটি গ্রন্থকে গ্রহণ করেছে।

ক. কোনটি অধিক বিশুদ্ধ?

সহীহুল বুখারী উভয়ের মধ্যে অধিক বিশুদ্ধ এবং অধিক ফায়দাপূর্ণ। এর কারণ হলো: বুখারীর হাদীসসমূহের সনদ অধিক সংযুক্ত, রাবীগণ অধিক নির্ভরযোগ্য এবং এতে এমন ফিকহী ইস্তিম্বাত (শরঈ বিধান উদ্ঘাটন) ও হিকমতপূর্ণ সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে যা সহীহ মুসলিমে নেই।

তবে সহীহুল বুখারী অধিক বিশুদ্ধ হওয়ার এই কথাটি সামগ্রিক বিবেচনায়। অন্যথায় মুসলিমের কিছু হাদীস বুখারীর কিছু হাদীসের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। কেউ কেউ বলেছেন যে সহীহ মুসলিম অধিক বিশুদ্ধ, তবে সঠিক মত হলো প্রথম মতটিই।

খ. তাঁরা কি সকল সহীহ হাদীস সংকলন করেছেন বা তার অঙ্গীকার করেছেন?

বুখারী ও মুসলিম তাঁদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে সকল সহীহ হাদীস সংকলন করেননি এবং তার অঙ্গীকারও করেননি।

ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “আমি আমার কিতাব আল-জামি’তে শুধু সহীহ হাদীসই অন্তর্ভুক্ত করেছি এবং কিতাব দীর্ঘ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক সহীহ হাদীস বাদ দিয়েছি।”[২৫]

ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন: “আমার নিকট যা কিছু সহীহ তার সবই আমি এখানে অন্তর্ভুক্ত করিনি। বরং আমি শুধু সেগুলোই অন্তর্ভুক্ত করেছি যেগুলোর ব্যাপারে (মুহাদ্দিসগণের) ঐকমত্য রয়েছে।”[২৬]

গ. তাঁদের কি অনেক সহীহ হাদীস বাদ পড়েছে, না অল্প?
প্রথম মত

হাফিয ইবনুল আখরাম বলেন: তাঁদের সামান্যই বাদ পড়েছে। তবে এই মতের সমালোচনা করা হয়েছে।

বিশুদ্ধ মত

তাঁদের অনেক সহীহ হাদীস বাদ পড়েছে। ইমাম বুখারী নিজেই বলেছেন: “আমি যা বাদ দিয়েছি তা (অন্তর্ভুক্ত করা হাদীসের চেয়ে) বেশি।” তিনি আরও বলেন: “আমি এক লক্ষ সহীহ হাদীস এবং দুই লক্ষ গয়র সহীহ হাদীস মুখস্থ রাখি।”

ঘ. প্রতিটি গ্রন্থে হাদীস সংখ্যা কত?
গ্রন্থ পুনরাবৃত্তিসহ পুনরাবৃত্তি বাদে
সহীহুল বুখারী ৭,২৭৫ প্রায় ৪,০০০
সহীহ মুসলিম ১২,০০০ প্রায় ৪,০০০
ঙ. বুখারী-মুসলিমে নেই এমন সহীহ হাদীস কোথায় পাওয়া যাবে?

সেগুলো অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলিতে পাওয়া যাবে, যেমন:

সহীহ ইবনু খুযায়মাহ (صَحِيْحُ ابْنِ خُزَيْمَةَ), সহীহ ইবনু হিব্বান (صَحِيْحُ ابْنِ حِبَّانَ), মুস্তাদরাকুল হাকিম (مُسْتَدْرَكُ الْحَاكِمِ), সুনানে আরবা’আহ (السُّنَنُ الْأَرْبَعَة) (চার সুনান গ্রন্থ), সুনানুদ দারাকুতনী (سُنَنُ الدَّارَقُطْنِيّ), সুনানুল বায়হাকী (سُنَنُ الْبَيْهَقِيّ) প্রভৃতি।

গুরুত্বপূর্ণ

এসব গ্রন্থে হাদীস থাকলেই তা সহীহ হয়ে যায় না। বরং সিহহাতের (বিশুদ্ধতার) স্পষ্ট বিবৃতি থাকতে হবে। তবে যেসব গ্রন্থ শুধু সহীহ হাদীস সংকলনের শর্ত করেছে (যেমন সহীহ ইবনু খুযায়মাহ), সেগুলো ব্যতিক্রম।

Also Read:  ১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: (ক. মাকবুল হাদিস: হাসান লিযাতিহী) | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

মুস্তাদরাক, সহীহ ইবনু খুযায়মাহ ও সহীহ ইবনু হিব্বান

اَلْكَلَامُ عَلَى مُسْتَدْرَكِ الْحَاكِمِ وَصَحِيْحِ ابْنِ خُزَيْمَةَ وَصَحِيْحِ ابْنِ حِبَّانَ

ক. মুস্তাদরাকুল হাকিম (مُسْتَدْرَكُ الْحَاكِمِ)

এটি হাদীসের বিশাল গ্রন্থসমূহের অন্যতম। এর মুসান্নিফ (লেখক) এতে সেসব সহীহ হাদীস উল্লেখ করেছেন যেগুলো বুখারী-মুসলিমের শর্তানুযায়ী অথবা তাঁদের যে কোনো একজনের শর্তানুযায়ী সহীহ, অথচ তাঁরা সংকলন করেননি। একইসাথে তিনি এমন হাদীসও উল্লেখ করেছেন যেগুলো তাঁর নিকট সহীহ, যদিও বুখারী-মুসলিম কারোরই শর্তানুযায়ী নয়; এগুলোকে তিনি “সহীহুল ইসনাদ” (সনদ সহীহ) বলে উল্লেখ করেছেন। মাঝে মাঝে তিনি কিছু অসহীহ হাদীসও উল্লেখ করেছেন, তবে সেগুলোতে সতর্কতা দিয়েছেন।

তিনি তাসহীহের (সহীহ বলে রায় দেওয়ার) ক্ষেত্রে মুতাসাহিল (শিথিল)। তাই তাঁর গ্রন্থের হাদীসগুলো অনুসন্ধান করে প্রতিটির যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত। ইমাম যাহাবী রহিমাহুল্লাহ এই কাজ করেছেন এবং অধিকাংশ হাদীসের যথাযথ মূল্যায়ন দিয়েছেন, তবে গ্রন্থটি এখনও আরও অনুসন্ধান ও যত্নের প্রয়োজন।[২৭]

খ. সহীহ ইবনু হিব্বান (صَحِيْحُ ابْنِ حِبَّانَ)

এই গ্রন্থের বিন্যাস অভিনব; এটি অধ্যায় অনুসারেও সাজানো নয় এবং মুসনাদ আকারেও সাজানো নয়। এজন্যই মুসান্নিফ এর নাম রেখেছেন “আত-তাকাসীম ওয়াল আনওয়া'” (التَّقَاسِيْمُ وَالْأَنْوَاعُ)। এই গ্রন্থ থেকে হাদীস খুঁজে বের করা অত্যন্ত কঠিন। পরবর্তীকালে কিছু আলিম[২৮] এটিকে অধ্যায় অনুসারে পুনর্বিন্যস্ত করেছেন।

এর মুসান্নিফও তাসহীহের ক্ষেত্রে মুতাসাহিল (শিথিল), তবে হাকিমের তুলনায় তাঁর শিথিলতা কম।[২৯]

গ. সহীহ ইবনু খুযায়মাহ (صَحِيْحُ ابْنِ خُزَيْمَةَ)

এটি সহীহ ইবনু হিব্বানের চেয়ে উচ্চতর মর্যাদার; কারণ মুসান্নিফের তাহাররী (যাচাই-বাছাই) অত্যন্ত কঠোর। এমনকি সনদে সামান্যতম আপত্তি থাকলেও তিনি তাসহীহ থেকে বিরত থাকেন।[২৯]

অনুবাদকের টীকা

তিনটি গ্রন্থের মর্যাদাক্রম: সহীহ ইবনু খুযায়মাহ (সবচেয়ে কঠোর) > সহীহ ইবনু হিব্বান (মাঝামাঝি) > মুস্তাদরাকুল হাকিম (সবচেয়ে শিথিল)। তাই এই গ্রন্থগুলো থেকে কোনো হাদীসকে সহীহ বলে গ্রহণ করার সময় এই তারতম্য মাথায় রাখতে হবে।

১০

সহীহায়নের উপর মুস্তাখরাজাত

اَلْمُسْتَخْرَجَاتُ عَلَى الصَّحِيْحَيْنِ
ক. মুস্তাখরাজের বিষয়বস্তু কী?

مُسْتَخْرَج মুস্তাখরাজ হলো: কোনো মুসান্নিফ হাদীসের কোনো গ্রন্থের হাদীসগুলো তাঁর নিজস্ব সনদে, মূল গ্রন্থকারের সূত্র ব্যতীত অন্য সূত্রে বর্ণনা করেন, অতঃপর মূল গ্রন্থকারের শায়খের কাছে অথবা তাঁর উপরের কোনো রাবীর কাছে গিয়ে উভয় সনদ মিলিত হয়।

খ. সহীহায়নের উপর প্রসিদ্ধ মুস্তাখরাজাত

মুস্তাখরাজ (اَلْمُسْتَخْرَجُ)

আবূ বকর আল-ইসমাঈলী রহিমাহুল্লাহ

বুখারীর উপর।

মুস্তাখরাজ (اَلْمُسْتَخْرَجُ)

আবূ আওয়ানাহ আল-ইসফারাইয়ীনী রহিমাহুল্লাহ

মুসলিমের উপর।

মুস্তাখরাজ (اَلْمُسْتَخْرَجُ)

আবূ নুআইম আল-আসবাহানী রহিমাহুল্লাহ

উভয়ের (বুখারী ও মুসলিম) উপর।

গ. মুস্তাখরাজকারীরা কি সহীহায়নের শব্দের সাথে মিল রক্ষার অঙ্গীকার করেছেন?

মুস্তাখরাজকারীগণ সহীহায়নের শব্দের সাথে মিল রক্ষার অঙ্গীকার করেননি; কারণ তাঁরা তাঁদের নিজ শায়খদের সূত্রে প্রাপ্ত শব্দই বর্ণনা করেন। তাই কিছু কিছু শব্দে সামান্য তারতম্য ঘটেছে।

একইভাবে বায়হাকী, বাগাবী প্রমুখ প্রাচীন মুসান্নিফগণ তাঁদের স্বতন্ত্র গ্রন্থে “বুখারী বর্ণনা করেছেন” বা “মুসলিম বর্ণনা করেছেন” বলে যা উল্লেখ করেছেন, তাতেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ ও শব্দে তারতম্য ঘটেছে। তাঁরা “বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন” বলে মূলত এই হাদীসের মূলকথা তাঁরা বর্ণনা করেছেন, সেটাই বোঝাতে চান।

ঘ. মুস্তাখরাজাত থেকে হাদীস উদ্ধৃত করে বুখারী বা মুসলিমের দিকে সম্বন্ধ করা কি জায়েয?

উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে, কারো জন্য মুস্তাখরাজাত বা উল্লিখিত গ্রন্থসমূহ থেকে হাদীস উদ্ধৃত করে “বুখারী বর্ণনা করেছেন” বা “মুসলিম বর্ণনা করেছেন” বলা জায়েয নয়; তবে দুটি শর্তের যে কোনো একটি পূরণ হলে ভিন্ন কথা:

বুখারী বা মুসলিমের মূল বর্ণনার সাথে মিলিয়ে দেখা

অর্থাৎ মুস্তাখরাজের হাদীসটি বুখারী-মুসলিমের মূল বর্ণনার সাথে তুলনা করে নিশ্চিত হওয়া যে শব্দ অভিন্ন।

মুস্তাখরাজকারী বা মুসান্নিফ নিজেই বলেছেন: “তাঁরা এই শব্দে বর্ণনা করেছেন”

অর্থাৎ “أَخْرَجَاهُ بِلَفْظِهِ” জাতীয় বক্তব্য থাকা।

ঙ. সহীহায়নের উপর মুস্তাখরাজাতের ফায়দা

সহীহায়নের উপর মুস্তাখরাজাতের অনেক ফায়দা রয়েছে, যা প্রায় দশটি পর্যন্ত পৌঁছায়। ইমাম সুয়ূতী রহিমাহুল্লাহ তাঁর তাদরীবুর রাবীতে সেগুলো উল্লেখ করেছেন।[৩০] সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফায়দাগুলো হলো:

সনদের উলুও (ঊর্ধ্বগামিতা)

কারণ মুস্তাখরাজকারী যদি বুখারীর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করতেন, তাহলে সনদ অধিক নিম্নগামী হতো; কিন্তু তিনি নিজস্ব সূত্রে বর্ণনা করায় সনদ অধিক ঊর্ধ্বগামী হয়েছে।

সহীহ হাদীসের পরিমাণ বৃদ্ধি

কারণ কিছু হাদীসে অতিরিক্ত শব্দ ও পূর্ণতা পাওয়া যায়।

বহু সূত্রে শক্তি অর্জন

এর ফায়দা হলো: বিরোধপূর্ণ হাদীসের ক্ষেত্রে একটিকে অপরটির উপর তারজীহ (প্রাধান্য) দেওয়া।

১১

বুখারী-মুসলিমের কোন হাদীসগুলো সহীহ বলে সাব্যস্ত?

مَا هُوَ الْمَحْكُوْمُ بِصِحَّتِهِ مِمَّا رَوَاهُ الشَّيْخَانِ؟

পূর্বে আমরা জেনেছি যে বুখারী ও মুসলিম তাঁদের সহীহ গ্রন্থে শুধু সহীহ হাদীসই অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং উম্মত তাঁদের গ্রন্থদ্বয় গ্রহণ করেছে। তাহলে কোন হাদীসগুলো সহীহ বলে সাব্যস্ত এবং উম্মত কোনগুলো গ্রহণ করেছে?

উত্তর হলো: তাঁরা যেসব হাদীস মুত্তাসিল সনদে (সংযুক্ত সনদে) বর্ণনা করেছেন, সেগুলোই সহীহ বলে সাব্যস্ত। তবে যেসব হাদীসের সনদের শুরু থেকে এক বা একাধিক রাবী বাদ পড়েছে, সেগুলোকে مُعَلَّق মু’আল্লাক[৩১] বলা হয়।

বুখারীতে মু’আল্লাক হাদীস অনেক আছে, তবে সেগুলো অধ্যায়ের শিরোনাম ও ভূমিকায় রয়েছে; অধ্যায়ের মূল অংশে এমন একটিও নেই। মুসলিমে মাত্র একটি মু’আল্লাক হাদীস আছে, তায়াম্মুমের অধ্যায়ে, যা তিনি অন্য কোথাও মুত্তাসিল সনদে সংযুক্ত করেননি।

মু’আল্লাক হাদীসের বিধান নিম্নরূপ:

Also Read:  দ্বিতীয় অধ্যায়: রাবীর বৈশিষ্ট্য ও জারহ-তা'দীল | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

জাযম (নিশ্চিত) ভাষায় হলে

যেমন: قَالَ (তিনি বলেছেন), أَمَرَ (তিনি আদেশ করেছেন), ذَكَرَ (তিনি উল্লেখ করেছেন); তাহলে এটি যাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে তাঁর থেকে সহীহ বলে হুকুম।

জাযম ছাড়া হলে

যেমন: يُرْوَى (বর্ণিত আছে), يُذْكَرُ (উল্লেখ করা হয়), يُحْكَى (বলা হয়), رُوِيَ (বর্ণনা করা হয়েছে), ذُكِرَ (উল্লেখ করা হয়েছে); তাহলে এতে যাঁর দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে তাঁর থেকে সহীহ হওয়ার হুকুম নেই। তবে এতে কোনো একেবারে দুর্বল হাদীসও নেই; কারণ “সহীহ” নামের কিতাবে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পাদটীকা

[২৫] কিছু বর্ণনায় “لِمَلَالِ الطُّوْلِ” শব্দ এসেছে। অর্থাৎ তিনি অনেক সহীহ হাদীস তাঁর কিতাবে অন্তর্ভুক্ত করেননি, পাছে কিতাব দীর্ঘ হয়ে যায় এবং পাঠকরা এর দৈর্ঘ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

[২৬] অর্থাৎ তাঁর নিকট সিহহাতের সর্বসম্মত শর্তগুলো যেসব হাদীসে পাওয়া গেছে।

[২৭] বর্তমানে আমাদের ভাই, মুহাক্কিক, ড. মাহমূদ আল-মীরাহ মুস্তাদরাকের যেসব হাদীসের ব্যাপারে যাহাবী কোনো মূল্যায়ন দেননি সেগুলোর মূল্যায়ন দিচ্ছেন এবং এই কাজ শেষে গ্রন্থটি প্রকাশের ইচ্ছা রাখেন। আল্লাহ তাঁকে মুসলিমদের পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

[২৮] তিনি হলেন আমীর আলাউদ্দীন আবুল হাসান আলী ইবনু বালাবান (মৃত্যু: ৭৩৯ হি.)। তিনি তাঁর পুনর্বিন্যাসের নাম রেখেছেন আল-ইহসান ফী তাকরীবি ইবনি হিব্বান (اَلْإِحْسَانُ فِيْ تَقْرِيْبِ ابْنِ حِبَّانَ)।

[২৯] তাদরীবুর রাবী (تَدْرِيْبُ الرَّاوِي), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৯।

[৩০] তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৫-১১৬।

[৩১] মু’আল্লাক হাদীসের বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে আসবে।

১২

সহীহ হাদীসের মর্যাদাক্রম

مَرَاتِبُ الصَّحِيْحِ

পূর্বে আমরা জেনেছি যে কিছু উলামা তাঁদের নিকট সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ কোনটি সে সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন। এর ভিত্তিতে এবং সিহহাতের অন্যান্য শর্ত কতটা পরিপূর্ণভাবে পূরণ হয়েছে তার বিবেচনায় বলা যায়: সহীহ হাদীসের, সনদের রাবীগণের বিবেচনায়, তিনটি মর্যাদা রয়েছে:

রাবীগণের বিবেচনায় সহীহ হাদীসের তিন মর্যাদা
সর্বোচ্চ মর্যাদা
যা সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদের কোনো একটি দ্বারা বর্ণিত। যেমন: মালিক ← নাফি’ ← ইবনু উমার
এর পরের মর্যাদা
যার রাবীগণ প্রথম সনদের রাবীগণের চেয়ে কিছুটা নিম্ন মর্যাদার। যেমন: হাম্মাদ ইবনু সালামাহ ← সাবিত ← আনাস
এর পরের মর্যাদা
যার রাবীগণের মধ্যে সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) বলার ন্যূনতম শর্ত পূরণ হয়েছে। যেমন: সুহায়ল ইবনু আবী সালিহ ← তাঁর পিতা ← আবূ হুরায়রা

এই আলোচনার সাথে সংযুক্ত হলো সহীহ হাদীসের আরেকটি মর্যাদাক্রম; যে গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণিত সেই বিবেচনায়। এই মর্যাদাক্রম সাতটি:

গ্রন্থের বিবেচনায় সহীহ হাদীসের সাত মর্যাদা
বুখারী ও মুসলিম উভয়ে সংকলন করেছেন (মুত্তাফাকুন আলাইহি)
সর্বোচ্চ
শুধু বুখারী একক সংকলন করেছেন
শুধু মুসলিম একক সংকলন করেছেন
উভয়ের শর্তানুযায়ী সহীহ, কিন্তু তাঁরা সংকলন করেননি
শুধু বুখারীর শর্তানুযায়ী সহীহ, কিন্তু তিনি সংকলন করেননি
শুধু মুসলিমের শর্তানুযায়ী সহীহ, কিন্তু তিনি সংকলন করেননি
অন্যান্য ইমামগণের নিকট সহীহ (যেমন ইবনু খুযায়মাহ, ইবনু হিব্বান), যা বুখারী-মুসলিমের শর্তানুযায়ী বা তাঁদের কোনো একজনের শর্তানুযায়ী নয়
১৩

শায়খায়নের (বুখারী-মুসলিমের) শর্ত

شَرْطُ الشَّيْخَيْنِ

শায়খায়ন (বুখারী ও মুসলিম) সহীহ হাদীসের সর্বসম্মত শর্তগুলোর অতিরিক্ত কোনো নির্দিষ্ট শর্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেননি বা চিহ্নিত করেননি। তবে গবেষক উলামায়ে কিরাম তাঁদের রচনারীতি অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা করে যা বুঝতে পেরেছেন, তাকেই প্রত্যেকে তাঁদের শর্ত বা তাঁদের কোনো একজনের শর্ত মনে করেছেন।

সর্বোত্তম ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে সর্বোত্তম যা বলা হয়েছে তা হলো: শায়খায়ন বা তাঁদের কোনো একজনের “শর্ত” বলতে বোঝায়, হাদীসটি তাঁদের উভয়ের বা কোনো একজনের গ্রন্থে ব্যবহৃত রাবীগণের সূত্রে বর্ণিত হওয়া, সেই সাথে শায়খায়ন সেসব রাবী থেকে বর্ণনায় যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তা বিবেচনায় রাখা।

১৪

“মুত্তাফাকুন আলাইহি” বলার অর্থ কী?

مَعْنَى قَوْلِهِمْ: مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ

মুহাদ্দিসগণ কোনো হাদীস সম্পর্কে مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ মুত্তাফাকুন আলাইহি বললে তাঁদের উদ্দেশ্য হলো শায়খায়নের ইত্তিফাক (ঐকমত্য), অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম উভয়ে হাদীসটির সিহহাতের ব্যাপারে একমত; উম্মতের ইজমা (সর্বসম্মতি) নয়।

তবে ইবনুস সালাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন: “কিন্তু উম্মতের ঐকমত্য এর অনিবার্য পরিণতি এবং এর সাথেই অর্জিত হয়; কারণ শায়খায়ন যে বিষয়ে একমত, উম্মত তা গ্রহণযোগ্য বলে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।”[৩২]

১৫

সহীহ হাদীসের জন্য আযীয হওয়া কি শর্ত?

هَلْ يُشْتَرَطُ فِي الصَّحِيْحِ أَنْ يَكُوْنَ عَزِيْزًا؟

বিশুদ্ধ মত হলো: সহীহ হাদীসের জন্য আযীয হওয়া শর্ত নয়; অর্থাৎ হাদীসের দুটি সনদ থাকা জরুরি নয়। কারণ সহীহায়ন (বুখারী-মুসলিম) ও অন্যান্য গ্রন্থে এমন অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে যেগুলো গরীব (একক সূত্রে বর্ণিত)।

বিপরীত মত

কিছু আলিম আযীয হওয়া শর্ত করেছেন, যেমন আবূ আলী আল-জুব্বাঈ আল-মু’তাযিলী এবং হাকিম। তবে তাঁদের এই মত উম্মতের ঐকমত্যের পরিপন্থী।

অনুবাদকের টীকা

“ইন্নামাল আ’মালু বিন্নিয়্যাত” হাদীসটি এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ: এটি গরীব (সাহাবী পর্যায়ে শুধু উমার রদিয়াল্লাহু আনহু একক), অথচ সকলের ঐকমত্যে সহীহ। সুতরাং গরীব হওয়া সিহহাতের (বিশুদ্ধতার) পরিপন্থী নয়।

পাদটীকা

[৩২] উলূমুল হাদীস (عُلُوْمُ الْحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ২৪।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading