১ম অধ্যায়: ২য় পরিচ্ছেদ: খ. মারদূদ খবর: (সনদে প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতার কারণে) ৩,৪. মু’দাল ও মুনকাতি’ | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

মু’দাল

اَلْمُعْضَلُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُعْضَل মু’দাল শব্দটি ইসমে মাফঊল (কর্মবাচক বিশেষ্য), أَعْضَلَهُ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ: অক্ষম করা, ক্লান্ত করা।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

مَا سَقَطَ مِنْ إِسْنَادِهِ اثْنَانِ فَأَكْثَرُ عَلَى التَّوَالِي

যে হাদীসের সনদ থেকে ধারাবাহিকভাবে দুই বা ততোধিক রাবী বাদ পড়েছে।[৭৬]

উদাহরণ

مِثَالُهُ
মু’দাল হাদীসের উদাহরণ

হাকিম “মা’রিফাতু উলূমিল হাদীস” গ্রন্থে তাঁর সনদে কা’নাবী থেকে, তিনি মালিক থেকে বর্ণনা করেন যে, তাঁর কাছে এই সংবাদ পৌঁছেছে যে আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لِلْمَمْلُوْكِ طَعَامُهُ وَكِسْوَتُهُ بِالْمَعْرُوْفِ، وَلَا يُكَلَّفُ مِنَ الْعَمَلِ إِلَّا مَا يُطِيْقُ

“দাসের জন্য যথাযথভাবে খাদ্য ও পোশাক দিতে হবে এবং তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।”

হাকিম বলেন: “এটি মালিক থেকে মু’দাল; তিনি মুওয়াত্তায় এভাবেই ই’দাল করেছেন।”[৭৭]

এই হাদীসটি মু’দাল, কারণ মালিক ও আবূ হুরায়রার মধ্যে ধারাবাহিকভাবে দুইজন রাবী বাদ পড়েছে। মুওয়াত্তার বাইরে এই হাদীসের পূর্ণ সনদ থেকে জানা যায় যে বাদ পড়া দুইজন হলেন: মুহাম্মাদ ইবনু আজলান এবং তাঁর পিতা। পূর্ণ সনদ হলো: “… মালিক ← মুহাম্মাদ ইবনু আজলান ← তাঁর পিতা ← আবূ হুরায়রা।”[৭৮]

হুকুম (বিধান)

حُكْمُهُ

মু’দাল হাদীস দঈফ, এবং মুরসাল ও মুনকাতি’র চেয়েও নিকৃষ্ট অবস্থায়[৭৯]; কারণ এতে সনদ থেকে অধিক সংখ্যক রাবী বাদ পড়েছে। এই বিধান উলামাদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।

মু’আল্লাকের কিছু আকৃতির সাথে এর মিলন

اِجْتِمَاعُهُ مَعَ بَعْضِ صُوَرِ الْمُعَلَّقِ

মু’দাল ও মু’আল্লাকের মধ্যে উমূম ওয়া খুসূস মিন ওয়াজহিন (আংশিক মিল ও আংশিক পার্থক্য)-এর সম্পর্ক:

মু’দাল ও মু’আল্লাকের সম্পর্ক
উভয়ে মিলিত হয় একটি আকৃতিতে
  • সনদের শুরু থেকে ধারাবাহিকভাবে দুইজন রাবী বাদ পড়লে এটি একই সাথে মু’দাল ও মু’আল্লাক।
উভয়ে পৃথক হয় দুটি আকৃতিতে
  • ১. সনদের মাঝখান থেকে ধারাবাহিকভাবে দুইজন রাবী বাদ পড়লে এটি মু’দাল, কিন্তু মু’আল্লাক নয়।
  • ২. সনদের শুরু থেকে শুধু একজন রাবী বাদ পড়লে এটি মু’আল্লাক, কিন্তু মু’দাল নয়।

মু’দালের মাযান্ন (প্রাপ্তিস্থান)

مِنْ مَظَانِّ الْمُعْضَلِ

ইমাম সুয়ূতী রহিমাহুল্লাহ[৮০] বলেন: মু’দাল, মুনকাতি’ ও মুরসাল হাদীসের মাযান্ন (প্রাপ্তিস্থান) হলো:

কিতাবুস সুনান (كِتَابُ السُّنَنِ)

সাঈদ ইবনু মানসূর রহিমাহুল্লাহ

ইবনু আবিদ দুনয়ার রচনাবলি


মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন)

اَلْمُنْقَطِعُ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

(ক) শাব্দিক অর্থ: مُنْقَطِع মুনকাতি’ শব্দটি ইসমে ফাইল (কর্তৃবাচক বিশেষ্য), اِنْقِطَاع ইনকিতা’ থেকে উদ্ভূত, যা اِتِّصَال ইত্তিসাল-এর (সংযুক্ততা) বিপরীত।

(খ) পারিভাষিক অর্থ:

مَا لَمْ يَتَّصِلْ إِسْنَادُهُ، عَلَى أَيِّ وَجْهٍ كَانَ انْقِطَاعُهُ

যে হাদীসের সনদ সংযুক্ত নয়, বিচ্ছিন্নতা যেভাবেই ঘটুক না কেন।[৮১]

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ যে কোনো সনদ যেকোনো স্থানে বিচ্ছিন্ন হলে তা মুনকাতি’; সনদের শুরু থেকে হোক, শেষ থেকে হোক বা মাঝখান থেকে হোক। এভাবে দেখলে মুরসাল, মু’আল্লাক ও মু’দাল সবই মুনকাতি’র অন্তর্ভুক্ত হয়। তবে পরবর্তী মুসতালাহবিদগণ মুনকাতি’কে সেই বিচ্ছিন্নতার জন্য নির্দিষ্ট করেছেন যেটি মুরসাল, মু’আল্লাক বা মু’দালের আকৃতিতে পড়ে না। পূর্ববর্তী মুহাদ্দিসগণের ব্যবহারও সাধারণত এরকমই ছিল।

এজন্যই ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় তাবিঈর নিচের রাবী সাহাবী থেকে বর্ণনা করলে; যেমন মালিক ← ইবনু উমার।”[৮২]

মুতাআখখিরীন মুহাদ্দিসগণের নিকট মুনকাতি’

اَلْمُنْقَطِعُ عِنْدَ الْمُتَأَخِّرِيْنَ

মুতাআখখিরীন (পরবর্তী) মুহাদ্দিসগণের নিকট মুনকাতি’ হলো: যে হাদীসের সনদ সংযুক্ত নয়, তবে যা মুরসাল, মু’আল্লাক বা মু’দালের আকৃতিতে পড়ে না। যেন মুনকাতি’ সনদের সকল বিচ্ছিন্নতার সাধারণ নাম, তিনটি আকৃতি ব্যতীত:

১. সনদের শুরু থেকে রাবী বাদ পড়া (এটি মু’আল্লাক)
২. সনদের শেষ থেকে (তাবিঈর পরে) রাবী বাদ পড়া (এটি মুরসাল)
৩. সনদের যেকোনো স্থানে ধারাবাহিকভাবে দুইজন বাদ পড়া (এটি মু’দাল)

হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ নুখবাহ ও তার শরাহতে এই মতই গ্রহণ করেছেন।[৮৩]

বিচ্ছিন্নতা সনদের একটি স্থানে হতে পারে, আবার একাধিক স্থানে (যেমন দুই বা তিন জায়গায়) হতে পারে।

অনুবাদকের টীকা

চার প্রকারের প্রকাশ্য বিচ্ছিন্নতার তুলনা:

মু’আল্লাক: সনদের শুরু (নিচ) থেকে বাদ পড়ে।

মুরসাল: সনদের শেষ (উপর) থেকে বাদ পড়ে (তাবিঈর পরে)।

মু’দাল: যেকোনো স্থানে ধারাবাহিকভাবে দুই বা ততোধিক বাদ পড়ে।

মুনকাতি’: উপরের তিনটি ছাড়া অন্য যেকোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতা; সাধারণত মাঝখানে একজন বাদ পড়া।

উদাহরণ

مِثَالُهُ
মুনকাতি’ হাদীসের উদাহরণ

আব্দুর রাযযাক ← সাওরী ← আবূ ইসহাক ← যায়দ ইবনু ইউসাই’ ← হুযায়ফাহ রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফূআন:

إِنْ وَلَّيْتُمُوْهَا أَبَا بَكْرٍ فَقَوِيٌّ أَمِيْنٌ

“যদি তোমরা আবূ বকরকে (নেতা) বানাও, তাহলে (তিনি) শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।”[৮৪]

এই সনদের মাঝখান থেকে একজন রাবী বাদ পড়েছে: সাওরী ও আবূ ইসহাকের মধ্যে “শারীক” বাদ পড়েছে। কারণ সাওরী এই হাদীস আবূ ইসহাক থেকে সরাসরি শোনেননি, বরং শারীকের মাধ্যমে শুনেছেন, আর শারীক আবূ ইসহাক থেকে শুনেছেন।

এই বিচ্ছিন্নতা মুরসাল, মু’আল্লাক বা মু’দালের কোনো আকৃতিতে পড়ে না, তাই এটি মুনকাতি’।

হুকুম (বিধান)

حُكْمُهُ

মুনকাতি’ হাদীস উলামাদের ইজমা দ্বারা দঈফ। কারণ এতে গ্রহণযোগ্যতার শর্ত, অর্থাৎ সনদের ইত্তিসাল (সংযুক্ততা) অনুপস্থিত এবং বাদ পড়া রাবীর অবস্থা অজানা।

পাদটীকা

[৭৬] উলূমুল হাদীস, পৃষ্ঠা ৫৯; আন-নুখবাহ, পৃষ্ঠা ৪৪।

[৭৭] মা’রিফাতু উলূমিল হাদীস, পৃষ্ঠা ৪৬।

[৭৮] পূর্বোক্ত সূত্র, পৃষ্ঠা ৪৭।

[৭৯] দেখুন: আল-কিফায়াহ, পৃষ্ঠা ২১; তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৯৫।

[৮০] তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১৪।

[৮১] আত-তাকরীব সহ তাদরীবুর রাবী, দশম প্রকার: মুনকাতি’, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০৭।

[৮২] আত-তাকরীব সহ তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২০৮।

[৮৩] আন-নুখবাহ সহ নুযহাতুন নাযার শরাহ, পৃষ্ঠা ৪৪।

[৮৪] হাকিম মা’রিফাতুল হাদীসে বর্ণনা করেছেন, পৃষ্ঠা ৩৬। আহমাদ, বাযযার ও তবারানী আল-আওসাতে অনুরূপ অর্থে বর্ণনা করেছেন। দেখুন: মাজমাউয যাওয়াইদ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৭৬।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading