প্রথম অধ্যায়: খবর
اَلْبَابُ الْأَوَّلُ: اَلْخَبَرُ
اَلْفَصْلُ الْأَوَّلُ: تَقْسِيْمُ الْخَبَرِ بِالنِّسْبَةِ لِوُصُوْلِهِ إِلَيْنَا
প্রথম পরিচ্ছেদ: আমাদের নিকট পৌঁছানোর বিবেচনায় খবরের প্রকারভেদ
ভূমিকা
আমাদের নিকট পৌঁছানোর দিক থেকে خَبَر খবর দুই প্রকারে বিভক্ত:
মুতাওয়াতির (اَلْمُتَوَاتِرُ)
যদি খবরটির طُرُق তুরুক (বর্ণনাসূত্রসমূহ) নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না হয়।
আহাদ (اَلْآحَادُ)
যদি খবরটির তুরুক (বর্ণনাসূত্রসমূহ) নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়।
এই উভয় প্রকারেরই শাখা-প্রশাখা ও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ইনশাআল্লাহ তাআলা, আমি সেগুলো দুটি মাবহাসে (আলোচ্য বিষয়ে) উল্লেখ ও বিশ্লেষণ করব।
প্রথম মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): মুতাওয়াতির খবর
সংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُ(ক) শাব্দিক অর্থ: مُتَوَاتِر মুতাওয়াতির শব্দটি ইসমে ফাইল (কর্তৃবাচক বিশেষ্য), যা تَوَاتُر তাওয়াতুর থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ تَتَابُع তাতাবু’ অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে একের পর এক আসা। যেমন বলা হয়: تَوَاتَرَ الْمَطَرُ, অর্থাৎ বৃষ্টি ধারাবাহিকভাবে পড়তে থাকল।
(খ) পারিভাষিক অর্থ:
যে খবর এত অধিকসংখ্যক বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন যে, সাধারণ বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী তাদের সকলের মিথ্যার উপর একমত হওয়া অসম্ভব।
সংজ্ঞার ব্যাখ্যা
شَرْحُ التَّعْرِيْفِউপর্যুক্ত সংজ্ঞার মর্মার্থ হলো: মুতাওয়াতির সেই হাদীস বা খবর, যার سَنَد সনদের (বর্ণনাসূত্রের) প্রতিটি طَبَقَة তবাকায় (স্তরে) এত বিপুলসংখ্যক রাবী (বর্ণনাকারী) রয়েছেন যে, বিবেক-বুদ্ধি সাধারণ নিয়মানুযায়ী এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ঐ সকল রাবীর পক্ষে এই খবরটি বানিয়ে বলার ব্যাপারে একমত হওয়া অসম্ভব।
তবাকাহ (طَبَقَة) বলতে সনদের প্রতিটি স্তর বোঝায়। যেমন: সাহাবীগণ একটি তবাকাহ, তাবিঈগণ আরেকটি তবাকাহ, তাবি’ তাবিঈগণ আরেকটি তবাকাহ; এভাবে প্রতিটি স্তরকে একটি তবাকাহ বলা হয়। মুতাওয়াতির হওয়ার জন্য শুধু সাহাবী পর্যায়ে বহু রাবী থাকলেই চলবে না, বরং প্রতিটি তবাকায় এই বিপুলসংখ্যক রাবী থাকতে হবে।
শর্তাবলি
شُرُوْطُهُসংজ্ঞার ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোনো খবরে তাওয়াতুর (ধারাবাহিক বহুসংখ্যক বর্ণনা) প্রমাণিত হতে হলে চারটি শর্ত পূরণ হতে হবে:
- অনেক বেশি সংখ্যক রাবী বর্ণনা করবেন।
- “অনেক বেশি” এর সর্বনিম্ন সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে; বিশুদ্ধ মত হলো কমপক্ষে দশজন।[১]
- সনদের সকল স্তরে এই বিপুলসংখ্যক রাবী থাকতে হবে।
- কোনো একটি স্তরে কমে গেলে তাওয়াতুর থাকবে না।
- সাধারণ বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী তাদের সকলের মিথ্যার উপর একমত হওয়া অসম্ভব হতে হবে।[২]
- তাদের খবরের ভিত্তি হতে হবে حِسّ হিস্স (ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতা); যেমন তারা বলবেন: “আমরা শুনেছি”, “আমরা দেখেছি”, “আমরা স্পর্শ করেছি” ইত্যাদি।
- যদি তাদের খবরের ভিত্তি হয় বিবেক-বুদ্ধি (যেমন: বিশ্বজগতের সূচনা আছে বলা), তাহলে সেই খবরকে মুতাওয়াতির বলা হবে না।
হুকুম (বিধান)
حُكْمُهُমুতাওয়াতির খবর اَلْعِلْمُ الضَّرُوْرِيّ ইলমে দরূরী (অকাট্য জ্ঞান) প্রদান করে। অর্থাৎ এমন নিশ্চিত জ্ঞান, যা মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে দৃঢ় বিশ্বাসের দিকে নিয়ে যায়; ঠিক যেমন কেউ নিজ চোখে কোনো বিষয় প্রত্যক্ষ করলে তা বিশ্বাস করতে এতটুকুও দ্বিধা করে না, মুতাওয়াতির খবরও তেমনই।
এ কারণেই সকল মুতাওয়াতির খবর مَقْبُوْل মাকবূল (গ্রহণযোগ্য)। এর রাবীগণের অবস্থা যাচাই-বাছাইয়ের কোনো প্রয়োজন নেই।
সাধারণত হাদীস গ্রহণযোগ্য কি না তা যাচাইয়ের জন্য রাবীগণের আদালত (ন্যায়পরায়ণতা) ও দবত (সংরক্ষণ ক্ষমতা) পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু মুতাওয়াতিরের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার প্রয়োজন নেই, কারণ এত বিপুলসংখ্যক মানুষের একই মিথ্যায় জড়িত থাকা যুক্তিগতভাবে অসম্ভব।
পাদটীকা
[১] তাদরীবুর রাবী (تَدْرِيْبُ الرَّاوِي), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৭৭।
[২] এটি এভাবে হতে পারে যে, রাবীগণ বিভিন্ন দেশের অধিবাসী, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সদস্য, বিভিন্ন মাযহাবের অনুসারী ইত্যাদি। এর ভিত্তিতে বলা যায়: কখনো বর্ণনাকারীদের সংখ্যা বেশি হওয়া সত্ত্বেও খবরটি মুতাওয়াতিরের মর্যাদা লাভ করে না, আবার কখনো আপেক্ষিকভাবে সংখ্যা কম হওয়া সত্ত্বেও খবরটি মুতাওয়াতিরের মর্যাদা লাভ করে; এটি নির্ভর করে রাবীগণের অবস্থার উপর।
প্রকারভেদ
أَقْسَامُهُমুতাওয়াতির খবর দুই প্রকার: لَفْظِيّ লফযী (শাব্দিক) এবং مَعْنَوِيّ মা’নাবী (অর্থগত)।
মুতাওয়াতির লফযী (اَلْمُتَوَاتِرُ اللَّفْظِيّ)
যার শব্দ ও অর্থ উভয়ই মুতাওয়াতির পর্যায়ে বর্ণিত।
মুতাওয়াতির মা’নাবী (اَلْمُتَوَاتِرُ الْمَعْنَوِيّ)
যার অর্থ মুতাওয়াতির পর্যায়ে বর্ণিত, কিন্তু শব্দ নয়।
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যা আরোপ করল, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।”[৩]
এই হাদীসটি সত্তরেরও অধিক সাহাবী বর্ণনা করেছেন। অতঃপর সনদের অবশিষ্ট তবাকাগুলোতে এই সংখ্যাধিক্য বজায় থেকেছে, বরং আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
দু’আর সময় দুই হাত তোলা সংক্রান্ত হাদীসসমূহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এ বিষয়ে প্রায় একশটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি হাদীসেই উল্লেখ আছে যে, তিনি দু’আর সময় হাত তুলেছেন; কিন্তু এগুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বর্ণিত।
প্রতিটি প্রেক্ষাপট পৃথকভাবে মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছেনি, তবে সকল বর্ণনার মধ্যে যে বিষয়টি সাধারণ (অর্থাৎ দু’আর সময় হাত তোলা), সেটি সকল সূত্র মিলিয়ে মুতাওয়াতির পর্যায়ে পৌঁছেছে।[৪]
লফযী ও মা’নাবীর পার্থক্য সহজ করে বললে:
লফযী: একই হাদীস, একই শব্দে, বহু সাহাবী থেকে বর্ণিত। যেমন “مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ…” হাদীসটি ৭০+ সাহাবী প্রায় একই শব্দে বর্ণনা করেছেন।
মা’নাবী: বিভিন্ন হাদীস, বিভিন্ন শব্দে, কিন্তু সবগুলোতে একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে যা মুতাওয়াতির। যেমন: ১০০টি ভিন্ন ভিন্ন হাদীসে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে হাত তোলার কথা এসেছে; প্রতিটি হাদীস পৃথকভাবে মুতাওয়াতির নয়, কিন্তু “দু’আয় হাত তোলা” বিষয়টি সামগ্রিকভাবে মুতাওয়াতির।
এর বিদ্যমানতা
وُجُوْدُهُমুতাওয়াতির হাদীসের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এর মধ্যে রয়েছে:
- হাউযের (পুকুর) হাদীস
- মোজার উপর মাসাহ সংক্রান্ত হাদীস
- সালাতে হাত তোলা সংক্রান্ত হাদীস
- نَضَّرَ اللهُ امْرَأً (আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে উজ্জ্বল করুন…) হাদীস
- এবং আরও অনেক
তবে আহাদ হাদীসের সংখ্যার তুলনায় দেখলে মুতাওয়াতির হাদীসের সংখ্যা অত্যন্ত কম।
মুতাওয়াতির হাদীস বিদ্যমান এবং এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য; তবে সামগ্রিক হাদীস ভাণ্ডারের অনুপাতে এটি খুবই সীমিত।
এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি
أَشْهَرُ الْمُصَنَّفَاتِ فِيْهِউলামায়ে কিরাম মুতাওয়াতির হাদীসসমূহ সংকলন করে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন, যাতে শিক্ষার্থীদের জন্য সেগুলো খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। এ ধরনের কিছু গ্রন্থ হলো:
আল-আযহারুল মুতানাসিরাহ ফিল আখবারিল মুতাওয়াতিরাহ (اَلْأَزْهَارُ الْمُتَنَاثِرَةُ فِي الْأَخْبَارِ الْمُتَوَاتِرَةِ)
অধ্যায় অনুযায়ী বিন্যস্ত।
কতফুল আযহার (قَطْفُ الْأَزْهَارِ)
পূর্বোক্ত গ্রন্থের সংক্ষিপ্তসার।
নাযমুল মুতানাসির মিনাল হাদীসিল মুতাওয়াতির (نَظْمُ الْمُتَنَاثِرِ مِنَ الْحَدِيْثِ الْمُتَوَاتِرِ)
পাদটীকা
[৩] সহীহুল বুখারী (صَحِيْحُ الْبُخَارِيّ), কিতাবুল ইলম, অধ্যায়: নবী ﷺ-এর উপর মিথ্যা আরোপের গুনাহ; ১/২০২, হাদীস নং ১১০ (এই শব্দে)। সহীহ মুসলিম (صَحِيْحُ مُسْلِم), কিতাবুয যুহদ, অধ্যায়: হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা এবং ইলম লিপিবদ্ধ করার বিধান; ৪/২২৯৮, হাদীস নং ৭২ (এই শব্দে)। এছাড়া আবূ দাঊদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারিমী এবং আহমাদও এটি বর্ণনা করেছেন।
[৪] তাদরীবুর রাবী (تَدْرِيْبُ الرَّاوِي), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৮০।
দ্বিতীয় মাবহাস: খবরে আহাদ
সংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُ(ক) শাব্দিক অর্থ: آحَاد আহাদ শব্দটি أَحَد আহাদ-এর বহুবচন, যার অর্থ وَاحِد ওয়াহিদ অর্থাৎ এক। خَبَرُ الْوَاحِدِ খবরুল ওয়াহিদ বলতে বোঝায় সেই খবর যা একজন ব্যক্তি বর্ণনা করেন।
(খ) পারিভাষিক অর্থ:
যে খবরে মুতাওয়াতিরের শর্তসমূহ একত্রিত হয়নি।[৫]
পারিভাষিক সংজ্ঞা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, খবরে আহাদ শুধু “একজন বর্ণনাকারীর খবর” নয়। বরং যে কোনো খবর যাতে মুতাওয়াতিরের চারটি শর্তের যে কোনো একটি অনুপস্থিত, সেটিই খবরে আহাদ। সুতরাং দুই, তিন, এমনকি নয়জন রাবী বর্ণনা করলেও যদি মুতাওয়াতিরের মানদণ্ড পূরণ না হয়, তাহলে সেটি খবরে আহাদ।
হুকুম (বিধান)
حُكْمُهُখবরে আহাদ اَلْعِلْمُ النَّظَرِيّ ইলমে নাযারী (তাত্ত্বিক জ্ঞান) প্রদান করে; অর্থাৎ এমন জ্ঞান যা অর্জনের জন্য চিন্তা-ভাবনা ও প্রমাণ-যুক্তির উপর নির্ভর করতে হয়।
ইলমে দরূরী (عِلْم ضَرُوْرِيّ)
অকাট্য ও স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান; প্রমাণ-যুক্তি ছাড়াই মানুষ বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়।
ইলমে নাযারী (عِلْم نَظَرِيّ)
তাত্ত্বিক জ্ঞান; গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে সনদ ও রাবী যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
খবরে আহাদের দুটি প্রকারভেদ রয়েছে, প্রতিটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। এই দুটি প্রকারভেদ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হবে।
পাদটীকা
[৫] নুযহাতুন নাযার (نُزْهَةُ النَّظَرِ), পৃষ্ঠা ২৬।
Discover more from Debunking Misguidance
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
