তৃতীয় অধ্যায়: রিওয়ায়াত (বর্ণনা), তার আদব ও সংরক্ষণ পদ্ধতি
প্রথম পরিচ্ছেদ: রিওয়ায়াত সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং তাহাম্মুলের (গ্রহণের) উপায়সমূহ
প্রথম মাবহাস: হাদীস শ্রবণ, তাহাম্মুল ও সংরক্ষণের পদ্ধতি
ভূমিকা
تَمْهِيْدٌএই অংশে তিনটি বিষয় আলোচিত হবে: (১) হাদীস শোনার নিয়ম কী, (২) হাদীস গ্রহণ (তাহাম্মুল) করার উপায়গুলো কী কী, (৩) হাদীস কীভাবে সংরক্ষণ (যাবত) করতে হয়। আগে এই তিনটি শব্দের মানে পরিষ্কার করে নেওয়া যাক।
كَيْفِيَّةُ سَمَاعِ الحَدِيْثِ কাইফিয়্যাতু সামা’ইল হাদীস (হাদীস শ্রবণের পদ্ধতি) বলতে বোঝায়: যে ব্যক্তি রিওয়ায়াত ও তাহাম্মুলের উদ্দেশ্যে শায়খদের কাছ থেকে হাদীস শুনতে চান, তাঁর জন্য কী কী শর্ত ও নিয়ম মেনে চলা উচিত বা আবশ্যক; যেমন নির্দিষ্ট বয়সের শর্ত (ওয়াজিব হিসেবে বা মুস্তাহাব হিসেবে)।
تَحَمُّلُهُ তাহাম্মুলুহু (তাহাম্মুল) বলতে বোঝায়: শায়খদের কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ ও সংগ্রহের বিভিন্ন উপায়।
صِفَةُ ضَبْطِهِ সিফাতু যাবতিহি (সংরক্ষণের পদ্ধতি) বলতে বোঝায়: ছাত্র শায়খদের কাছ থেকে যে হাদীস গ্রহণ করেছেন, সেটা এমনভাবে সংরক্ষণ করা যাতে পরবর্তীতে তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে সেটা অন্যদের কাছে বর্ণনা করতে পারেন।
মুহাদ্দিসগণ হাদীস শাস্ত্রের এই বিভাগে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁরা এর জন্য সূক্ষ্ম ও চমৎকার নিয়মাবলি, শর্তাবলি ও মানদণ্ড প্রণয়ন করেছেন। তাঁরা হাদীস তাহাম্মুলের (গ্রহণের) বিভিন্ন উপায়কে আলাদা করেছেন এবং সেগুলোকে স্তরে স্তরে সাজিয়েছেন; কিছু উপায় অন্যগুলোর চেয়ে শক্তিশালী। এই সবকিছু তাঁরা করেছেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের প্রতি যত্নশীলতা নিশ্চিত করার জন্য এবং এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে হাদীসের নিরাপদ স্থানান্তর নিশ্চিত করার জন্য; যাতে একজন মুসলিম আশ্বস্ত হতে পারেন যে, নবী ﷺ-এর হাদীস তাঁর কাছে পৌঁছানোর পদ্ধতি পূর্ণ নিরাপত্তা ও নির্ভুলতার উপর প্রতিষ্ঠিত।
হাদীস তাহাম্মুলের জন্য কি ইসলাম ও বুলূগ শর্ত?
هَلْ يُشْتَرَطُ لِتَحَمُّلِ الحَدِيْثِ الإِسْلَامُ وَالبُلُوْغُ؟বিশুদ্ধ মতে, হাদীস تَحَمُّل তাহাম্মুল – গ্রহণ করার জন্য ইসলাম ও বুলূগ (প্রাপ্তবয়স্কতা) শর্ত নয়।
তবে أَدَاء আদা – বর্ণনা করা / অন্যকে শোনানো এর জন্য ইসলাম ও বুলূগ শর্ত[১]; যেমনটা আমরা রাবীর শর্তাবলি অধ্যায়ে আগেই পড়েছি।
সুতরাং একজন মুসলিম প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি ইসলাম গ্রহণের আগে বা বুলূগের আগে কোনো হাদীস শুনে থাকেন (তাহাম্মুল করে থাকেন), তাহলে সেই বর্ণনা গ্রহণযোগ্য। তবে অপ্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে অবশ্যই التَّمْيِيْز আত-তাময়ীয – বুঝবার ক্ষমতা থাকতে হবে।
কেউ কেউ বলেছেন: তাহাম্মুলের জন্যও বুলূগ শর্ত। কিন্তু এই মত নির্ভরযোগ্য নয়; কারণ মুসলিমগণ ছোট সাহাবীদের (যেমন হাসান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, ইবনু ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা প্রমুখ) বর্ণনা গ্রহণ করেছেন; বুলূগের আগে তাহাম্মুল করা হাদীস ও পরে তাহাম্মুল করা হাদীসের মধ্যে কোনো পার্থক্য না করেই।
কোন বয়সে হাদীস শোনা শুরু করা মুস্তাহাব?
مَتٰى يُسْتَحَبُّ الاِبْتِدَاءُ بِسَمَاعِ الحَدِيْثِ؟ক. কেউ বলেছেন: ৩০ বছর বয়সে। শামবাসী (সিরিয়া) আলিমদের মত এটা।
খ. কেউ বলেছেন: ২০ বছর বয়সে। কূফাবাসী আলিমদের মত এটা।
গ. কেউ বলেছেন: ১০ বছর বয়সে। বাসরাবাসী আলিমদের মত এটা।
পরবর্তী যুগসমূহে সঠিক মত হলো: যখন থেকে শিশুর শোনা সঠিকভাবে সম্ভব হয়, তখন থেকেই তাড়াতাড়ি হাদীস শোনানো শুরু করা উচিত। কারণ (পরবর্তী যুগে) হাদীস কিতাবে সংরক্ষিত ও সুবিন্যস্ত রয়েছে।
ছোট শিশুর শ্রবণ সঠিক হওয়ার কি নির্দিষ্ট বয়স আছে?
هَلْ لِصِحَّةِ سَمَاعِ الصَّغِيْرِ سِنٌّ مُعَيَّنَةٌ؟পাঁচ বছর
কিছু আলিম পাঁচ বছর নির্ধারণ করেছেন। মুহাদ্দিসগণের মধ্যে এই মতের উপরই আমল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাময়ীয (বোঝার ক্ষমতা) অনুসারে
সঠিক মত হলো, বয়স নয় বরং তাময়ীয বিবেচ্য। শিশু যদি কথা বুঝতে পারে এবং উত্তর দিতে পারে, তাহলে সে মুমাইয়িয (বুদ্ধিসম্পন্ন) এবং তার শ্রবণ সঠিক। অন্যথায় নয়।
তথ্যসূত্র ও টীকা
[১] التَّحَمُّل আত-তাহাম্মুল এর অর্থ হলো: শায়খদের কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করা ও সংগ্রহ করা। আর الأَدَاء আল-আদা এর অর্থ হলো: হাদীস বর্ণনা করা ও ছাত্রদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
দ্বিতীয় মাবহাস: তাহাম্মুলের উপায়সমূহ ও আদায়ের শব্দাবলি
طُرُقُ التَّحَمُّلِ তুরুকুত তাহাম্মুল বলতে বোঝায়: শায়খদের কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ ও সংগ্রহের বিভিন্ন পদ্ধতি। আর صِيَغُ الأَدَاءِ সিয়াগুল আদা বলতে বোঝায়: মুহাদ্দিস হাদীস বর্ণনা করার সময় যেসব শব্দ ব্যবহার করেন; যেমন: “সামি’তু” (আমি শুনেছি), “হাদ্দাসানী” (আমাকে বলেছেন), “আখবারানী” (আমাকে জানিয়েছেন) ইত্যাদি।
হাদীস তাহাম্মুলের (গ্রহণের) উপায় আটটি। নিচে সেগুলো একনজরে দেখুন:
আস-সামা’
السَّمَاعُআল-কিরাআহ
القِرَاءَةُআল-ইজাযাহ
الإِجَازَةُআল-মুনাওয়ালাহ
المُنَاوَلَةُআল-কিতাবাহ
الكِتَابَةُআল-ই’লাম
الإِعْلَامُআল-ওয়াসিয়্যাহ
الوَصِيَّةُআল-ওয়িজাদাহ
الوِجَادَةُনিচে প্রতিটি উপায় সংক্ষেপে আলোচনা করা হচ্ছে, সাথে প্রতিটির আদায়ের শব্দাবলিও:
শায়খের মুখ থেকে শ্রবণ (আস-সামা’)
السَّمَاعُ مِنْ لَفْظِ الشَّيْخِক. পদ্ধতি: শায়খ পড়বেন (বর্ণনা করবেন), আর ছাত্র শুনবেন। শায়খ তাঁর মুখস্থ থেকে পড়ুন বা কিতাব থেকে পড়ুন; আর ছাত্র শুনে লিখে নিন বা শুধু শুনুন (না লিখে); সবই এই উপায়ের অন্তর্ভুক্ত।
খ. মর্যাদা: অধিকাংশ আলিমের মতে, তাহাম্মুলের সকল উপায়ের মধ্যে সামা’ (শায়খের মুখ থেকে সরাসরি শোনা) হলো সর্বোচ্চ।
গ. আদায়ের শব্দাবলি:
প্রতিটি তাহাম্মুলের উপায়ের জন্য নির্দিষ্ট শব্দ নির্ধারিত হওয়ার আগে, সামা’ দ্বারা হাদীস গ্রহণকারী ব্যক্তি আদায়ের সময় নিম্নোক্ত যেকোনো শব্দ ব্যবহার করতে পারতেন:
২. পরবর্তীতে যখন তাহাম্মুলের প্রতিটি উপায়ের জন্য নির্দিষ্ট শব্দ প্রচলিত হয়ে গেল, তখন আদায়ের শব্দাবলি নিম্নরূপ নির্ধারিত হলো:
শায়খের কাছে পড়া (আল-কিরাআহ ‘আলাশ শায়খ)
القِرَاءَةُ عَلَى الشَّيْخِঅধিকাংশ মুহাদ্দিস এটিকে عَرْضًا ‘আরদান – উপস্থাপন বলে অভিহিত করেন।
ক. পদ্ধতি: ছাত্র পড়বেন, আর শায়খ শুনবেন[৩]। ছাত্র নিজে পড়ুন বা অন্য কেউ পড়ুক আর তিনি শুনুন; মুখস্থ থেকে পড়া হোক বা কিতাব থেকে; শায়খ নিজের স্মৃতি থেকে যাচাই করুন বা নিজের কিতাব ধরে থাকুন অথবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির কিতাব ধরে থাকুন; সব অবস্থাতেই এটি কিরাআহ হিসেবে গণ্য।
খ. এর দ্বারা বর্ণনার হুকুম: কিরাআহ (শায়খের কাছে পড়া) পদ্ধতিতে হাদীস বর্ণনা করা সর্বসম্মতিক্রমে সহীহ (বিশুদ্ধ); উপরোক্ত সকল পদ্ধতিতেই। কিছু অতিকঠোরপন্থী (মুতাশাদ্দিদ) ব্যক্তি থেকে ভিন্ন মত বর্ণিত আছে, তবে তাঁদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়।
গ. মর্যাদা: কিরাআহর মর্যাদা নিয়ে তিনটি মত রয়েছে:
ইমাম মালিক, ইমাম বুখারী এবং হিজায ও কূফার অধিকাংশ আলিমের মত।
পূর্বাঞ্চলের (মাশরিক) অধিকাংশ আলিমের মত। এটিই বিশুদ্ধ মত।
ইমাম আবূ হানীফা, ইবনু আবী যি’ব এবং ইমাম মালিকের একটি বর্ণনা অনুযায়ী।
তথ্যসূত্র ও টীকা
[২] سَمَاعُ المُذَاكَرَةِ সামা’উল মুযাকারাহ (মুযাকারাহর শ্রবণ) আর سَمَاعُ التَّحْدِيْثِ সামা’উত তাহদীস (তাহদীসের শ্রবণ) এক নয়। তাহদীসের শ্রবণে শায়খ ও ছাত্র উভয়ই মজলিসে আসার আগে প্রস্তুতি ও যাচাই সম্পন্ন করে আসেন। কিন্তু মুযাকারাহ (আলোচনা) তে সেই ধরনের প্রস্তুতি থাকে না।
[৩] এখানে মূল উদ্দেশ্য হলো: ছাত্র শায়খের নিজস্ব মারবিয়্যাত (বর্ণনাসমূহ) পড়বেন; যেকোনো হাদীস ইচ্ছামতো পড়বেন না। কারণ শায়খের কাছে পড়ার মূল লক্ষ্য হলো শায়খ সেগুলো শুনবেন এবং ছাত্রের জন্য সেগুলো যাচাই করে দিবেন।
ঘ. কিরাআহর আদায়ের শব্দাবলি:
ইজাযাহ
الإِجَازَةُক. সংজ্ঞা: الإِجَازَةُ আল-ইজাযাহ হলো মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে বর্ণনার অনুমতি প্রদান করা।
খ. পদ্ধতি: শায়খ তাঁর কোনো ছাত্রকে বলবেন: “আমি তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি আমার সূত্রে সহীহুল বুখারী বর্ণনা করার।”
গ. প্রকারভেদ: ইজাযাহর অনেক প্রকার রয়েছে। এখানে পাঁচটি উল্লেখ করা হচ্ছে:
এটি মুনাওয়ালাহবিহীন ইজাযাহর মধ্যে সর্বোচ্চ।
অথবা স্বতন্ত্রভাবে; যেমন: “অমুকের যে সন্তান জন্মাবে তাকে ইজাযাহ দিলাম।”
ঘ. হুকুম:
প্রথম প্রকার সম্পর্কে বিশুদ্ধ মত (যার উপর জমহূর এবং আমল প্রতিষ্ঠিত) হলো: এর দ্বারা বর্ণনা ও আমল জায়িয। তবে কিছু আলিম এটিকে বাতিল বলেছেন; এটি ইমাম শাফি’ঈ থেকে বর্ণিত দুটি মতের একটি।
বাকি প্রকারগুলো সম্পর্কে মতভেদ আরো বেশি এবং আরো কঠিন। যাই হোক, ইজাযাহর মাধ্যমে তাহাম্মুল ও রিওয়ায়াত একটি দুর্বল পদ্ধতি; এতে শিথিলতা করা উচিত নয়।
ঙ. আদায়ের শব্দাবলি:
মুনাওয়ালাহ (পাণ্ডুলিপি হস্তান্তর করা)
المُنَاوَلَةُক. প্রকারভেদ: মুনাওয়ালাহ দুই প্রকার:
ইজাযাহসহ মুনাওয়ালাহ
এটি সকল প্রকার ইজাযাহর মধ্যে সর্বোচ্চ।
পদ্ধতি: শায়খ তাঁর কিতাব ছাত্রকে দিবেন এবং বলবেন: “এটা অমুকের সূত্রে আমার রিওয়ায়াত; তুমি এটা আমার সূত্রে বর্ণনা করো।” তারপর মালিকানা হিসেবে বা ধার হিসেবে ছাত্রের কাছে রেখে দিবেন; যাতে সে নকল করে নিতে পারে।
ইজাযাহবিহীন মুনাওয়ালাহ
পদ্ধতি: শায়খ তাঁর কিতাব ছাত্রকে দিবেন, শুধু এটুকু বলবেন: “এটা আমার শ্রুত বর্ণনা (সামা’ঈ)।” রিওয়ায়াতের অনুমতি দিবেন না।
খ. বর্ণনার হুকুম:
এর দ্বারা বর্ণনা করা জায়িয। তবে মর্যাদায় এটি সামা’ ও শায়খের কাছে কিরাআহর চেয়ে নিম্ন।
বিশুদ্ধ মতে, এর দ্বারা বর্ণনা করা জায়িয নয়।
গ. আদায়ের শব্দাবলি:
তথ্যসূত্র ও টীকা
[৪] তিনি হলেন আবুল ‘আব্বাস আল-ওয়ালীদ ইবনু বাকর আল-মা’মারী। তাঁর কিতাবের পূর্ণ নাম হলো: “আল-ওয়াজাযাহ ফী তাজওীযিল ইজাযাহ” (الوَجَازَة فِي تَجْوِيْزِ الإِجَازَة)।
কিতাবাহ (লিখিতভাবে প্রেরণ)
الكِتَابَةُক. পদ্ধতি: শায়খ তাঁর শ্রুত হাদীস কোনো উপস্থিত বা অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্য নিজ হাতে লিখে পাঠান, অথবা অন্যকে দিয়ে লেখান।
খ. প্রকারভেদ:
ইজাযাহসহ কিতাবাহ
যেমন: “আমি তোমার জন্য যা লিখেছি বা তোমার কাছে যা পাঠিয়েছি, তা বর্ণনার ইজাযাহ দিলাম।”
→ বর্ণনা সহীহ। ইজাযাহসহ মুনাওয়ালাহর সমপর্যায়ের।
ইজাযাহবিহীন কিতাবাহ
শায়খ কিছু হাদীস লিখে পাঠালেন, কিন্তু বর্ণনার ইজাযাহ দিলেন না।
→ কেউ বর্ণনা নিষেধ বলেছেন, কেউ জায়িয বলেছেন। বিশুদ্ধ মতে মুহাদ্দিসদের কাছে জায়িয; কারণ লিখে পাঠানোর মধ্যে ইজাযাহর ইঙ্গিত রয়েছে।
গ. হাতের লেখা চেনার জন্য কি সাক্ষী লাগবে?
কেউ কেউ বলেছেন: হাতের লেখার উপর সাক্ষী (বাইয়িনাহ) লাগবে; কারণ একজনের লেখা আরেকজনের লেখার সাথে মিলে যেতে পারে।
প্রাপক যদি লেখকের হাতের লেখা চেনেন, তাহলে তাই যথেষ্ট। কারণ একজন মানুষের হাতের লেখা অন্যের সাথে মিলে যায় না।
ঘ. আদায়ের শব্দাবলি:
২. সামা’ ও কিরাআহর শব্দ সীমাবদ্ধ রেখে; যেমন: حَدَّثَنِيْ فُلَانٌ كِتَابَةً (হাদ্দাসানী ফুলানুন কিতাবাতান) অথবা أَخْبَرَنِيْ فُلَانٌ كِتَابَةً (আখবারানী ফুলানুন কিতাবাতান)।
ই’লাম (অবহিতকরণ)
الإِعْلَامُক. পদ্ধতি: শায়খ ছাত্রকে জানান যে, এই হাদীস বা এই কিতাব তাঁর শ্রুত বর্ণনা (সামা’)।
খ. বর্ণনার হুকুম:
অনেক মুহাদ্দিস, ফকীহ ও উসূলবিদের মত।
একাধিক মুহাদ্দিস ও অন্যান্যদের মত। কারণ শায়খ হয়তো জানেন যে এটি তাঁর রিওয়ায়াত, কিন্তু হাদীসে কোনো ত্রুটি থাকায় বর্ণনা করতে চাননি। হ্যাঁ, যদি তিনি বর্ণনার ইজাযাহও দেন, তাহলে জায়িয।
গ. আদায়ের শব্দ: أَعْلَمَنِيْ شَيْخِيْ بِكَذَا (আ’লামানী শায়খী বিকাযা; আমার শায়খ আমাকে এই বিষয়ে অবহিত করেছেন)।
ওয়াসিয়্যাহ (ওসিয়তকরণ)
الوَصِيَّةُক. পদ্ধতি: শায়খ মৃত্যুর সময় বা সফরের প্রাক্কালে তাঁর কোনো কিতাব (যা তিনি বর্ণনা করেন) কোনো ব্যক্তির জন্য ওসিয়ত করেন।
খ. বর্ণনার হুকুম:
কিছু সালাফের মত। তবে এটি ভুল; কারণ তিনি কিতাবটি দেওয়ার ওসিয়ত করেছেন, বর্ণনার অনুমতি দেননি।
গ. আদায়ের শব্দ: أَوْصٰى إِلَيَّ فُلَانٌ بِكَذَا (আওসা ইলাইয়্যা ফুলানুন বিকাযা) অথবা حَدَّثَنِيْ فُلَانٌ وَصِيَّةً (হাদ্দাসানী ফুলানুন ওয়াসিয়্যাতান)।
ওয়িজাদাহ (প্রাপ্তি)
الوِجَادَةُالوِجَادَة আল-ওয়িজাদাহ শব্দটি “ওয়াজাদা” (পেয়েছে) থেকে গঠিত। এই মাসদার (ক্রিয়ামূল) মুওয়াল্লাদ (পরবর্তীকালে তৈরি); আরবদের কাছ থেকে শোনা যায়নি।
ক. পদ্ধতি: ছাত্র তাঁর কোনো শায়খের হাতে লেখা কিছু হাদীস পান, যেগুলো সেই শায়খ বর্ণনা করতেন। ছাত্র শায়খের হাতের লেখা চেনেন, কিন্তু শায়খের কাছ থেকে তাঁর কোনো সামা’ (শ্রবণ) বা ইজাযাহ নেই।
খ. বর্ণনার হুকুম: ওয়িজাদাহর মাধ্যমে বর্ণনা المُنْقَطِع আল-মুনকাতি’ – বিচ্ছিন্ন সনদ এর অন্তর্ভুক্ত; তবে এতে এক ধরনের সংযোগ (ইত্তিসাল) রয়েছে।
গ. আদায়ের শব্দ: প্রাপক বলবেন: وَجَدْتُ بِخَطِّ فُلَانٍ (ওয়াজাদতু বিখাত্তি ফুলান; অমুকের হাতের লেখায় পেয়েছি) অথবা قَرَأْتُ بِخَطِّ فُلَانٍ كَذَا (কারা’তু বিখাত্তি ফুলানিন কাযা; অমুকের হাতের লেখায় এটি পড়েছি)। তারপর সনদ ও মতন উল্লেখ করবেন।
তৃতীয় মাবহাস: হাদীস লিখন, সংরক্ষণ ও সংকলন[৫]
হাদীস লেখার হুকুম
حُكْمُ كِتَابَةِ الحَدِيْثِসাহাবা ও তাবি’ঈনদের মধ্যে হাদীস লেখার ব্যাপারে মতভেদ ছিল:
ক. কেউ কেউ মাকরূহ (অপছন্দনীয়) মনে করতেন। তাঁদের মধ্যে: ইবনু ‘উমার, ইবনু মাস’ঊদ এবং যাইদ ইবনু সাবিত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম।
খ. কেউ কেউ মুবাহ (বৈধ) মনে করতেন। তাঁদের মধ্যে: ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর, আনাস, ‘উমার ইবনু ‘আব্দিল ‘আযীয এবং অধিকাংশ সাহাবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম।
এরপর সকলে হাদীস লেখার বৈধতার উপর ইজমা’ (ঐকমত্য) করেন এবং মতভেদ শেষ হয়ে যায়। যদি হাদীস কিতাবে লিপিবদ্ধ করা না হতো, তাহলে পরবর্তী যুগসমূহে, বিশেষত আমাদের এই যুগে, হাদীস হারিয়ে যেত।
মতভেদের কারণ
سَبَبُ الاِخْتِلَافِ فِي حُكْمِ كِتَابَتِهِমতভেদের কারণ হলো, বৈধতা ও নিষেধ সংক্রান্ত পরস্পরবিরোধী হাদীস বর্ণিত হয়েছে:
ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আমার থেকে (কুরআন ছাড়া অন্য কিছু) লেখো না। যে আমার থেকে কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখেছে, সে যেন তা মুছে ফেলে।”[৬]
ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“আবূ শাহ-এর জন্য লিখে দাও।”[৭]
এছাড়া লেখার বৈধতায় আরো হাদীস রয়েছে; যেমন ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমরকে হাদীস লেখার অনুমতি দেওয়া।
বৈধতা ও নিষেধের হাদীসসমূহের মধ্যে সমন্বয়
الجَمْعُ بَيْنَ أَحَادِيْثِ الإِبَاحَةِ وَأَحَادِيْثِ النَّهْيِআলিমগণ বিভিন্নভাবে সমন্বয় করেছেন:
ব্যক্তিভেদে
যার ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, তাঁকে লেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর যার ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা নেই কিন্তু লেখার উপর নির্ভর করে স্মৃতিচর্চা ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কা আছে, তাঁকে নিষেধ করা হয়েছে।
সময়ভেদে (নাসখ)
যখন কুরআনের সাথে হাদীস মিশে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, তখন নিষেধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন সেই আশঙ্কা দূর হলো, তখন অনুমতি এলো। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা মানসূখ (রহিত)।
হাদীস লেখকের কর্তব্য
مَاذَا يَجِبُ عَلٰى كَاتِبِ الحَدِيْثِ؟হাদীস লেখককে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে মনোযোগী হতে হবে:
হাদীসের শব্দ সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও যাচাই করা; হারাকাত (স্বরচিহ্ন) ও নুকতা (বিন্দু) দিয়ে সুনির্দিষ্ট করা যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না হয়। বিশেষ করে ব্যক্তিনাম (আ’লাম) সুস্পষ্টভাবে লেখা; কারণ ব্যক্তিনাম পূর্ব-পরের শব্দ থেকে অনুমান করা যায় না। হাতের লেখা প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পরিষ্কার হওয়া উচিত। নিজস্ব এমন সংক্ষিপ্ত চিহ্ন ব্যবহার করা উচিত নয় যা অন্যরা বুঝবে না।
নবী ﷺ-এর নাম আসলে পূর্ণাঙ্গভাবে সালাত ও সালাম লেখা উচিত; এতে বিরক্ত বা অলস হওয়া উচিত নয়। মূল পাণ্ডুলিপিতে সংক্ষিপ্ত থাকলেও নকলকারী পূর্ণাঙ্গ লিখবেন। একইভাবে আল্লাহর প্রশংসা (যেমন: ‘আযযা ওয়া জাল্লা), সাহাবাদের জন্য “রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু” এবং আলিমদের জন্য “রাহিমাহুল্লাহ” লেখাও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু সালাত বা শুধু সালাম লেখা মাকরূহ। “ص” বা “صلعم” ইত্যাদি সংক্ষিপ্ত চিহ্ন ব্যবহারও মাকরূহ; পূর্ণাঙ্গ লেখা আবশ্যক।
মুকাবালাহ (পাণ্ডুলিপি মিলিয়ে দেখা) ও তার পদ্ধতি
المُقَابَلَةُ وَكَيْفِيَّتُهَاহাদীস লেখা শেষ হলে লেখককে অবশ্যই তাঁর কিতাব শায়খের মূল কপির (আসল[৮]) সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে, এমনকি যদি ইজাযাহর মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকেন তাহলেও।
পদ্ধতি: লেখক ও শায়খ উভয়ে তাঁদের কিতাব ধরে হাদীস শোনানোর সময় মিলিয়ে দেখবেন। অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি যেকোনো সময় মিলিয়ে দিলেও যথেষ্ট, পড়ার সময় হোক বা পরে হোক। শায়খের আসলের সাথে মিলিয়ে দেখা কোনো নকলের সাথে মেলানোও যথেষ্ট।
আদায়ের শব্দ ও অন্যান্য লেখার পরিভাষাসমূহ
اِصْطِلَاحَاتٌ فِي كِتَابَةِ أَلْفَاظِ الأَدَاءِ وَغَيْرِهَاঅধিকাংশ হাদীস লেখকেরা আদায়ের শব্দ সংক্ষেপে লিখতেন:
খ. أَخْبَرَنَا → أنا অথবা أرنا
তবে পাঠককে এগুলো পড়ার সময় অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ শব্দ উচ্চারণ করতে হবে; সংক্ষিপ্ত আকারে পড়া জায়িয নয়।
হাদীস অন্বেষণে সফর (রিহলাহ)
الرِّحْلَةُ فِي طَلَبِ الحَدِيْثِআমাদের সালাফে সালিহীন হাদীসের প্রতি অতুলনীয় যত্ন নিয়েছেন। হাদীস সংগ্রহ ও সংরক্ষণে তাঁরা যে পরিমাণ মনোযোগ, শ্রম ও সময় ব্যয় করেছেন, তা বিশ্বাস করা কঠিন। তাঁদের কেউ নিজ শহরের শায়খদের কাছ থেকে হাদীস সংগ্রহ শেষ করে নিকটবর্তী ও দূরবর্তী বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে সফর করতেন; সেই সব অঞ্চলের শায়খদের কাছ থেকে হাদীস নেওয়ার জন্য। সফরের কষ্ট সহ্য করতেন, কঠিন জীবনযাপন মেনে নিতেন; তৃপ্ত মনে।
গ্রন্থকার: খতীব আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ
সাহাবা, তাবি’ঈন ও পরবর্তী আলিমদের হাদীস অন্বেষণে সফরের চমকপ্রদ ঘটনাবলি সংকলিত।
হাদীস সংকলনের প্রকারভেদ
أَنْوَاعُ التَّصْنِيْفِ فِي الحَدِيْثِযাঁর মধ্যে সংকলনের সামর্থ্য আছে, তাঁর উচিত সংকলনে এগিয়ে আসা; বিক্ষিপ্ত বিষয় একত্রিত করা, জটিল বিষয় স্পষ্ট করা, অগোছালো বিষয় সুসজ্জিত করা এবং ফিহরিসবিহীন বিষয়ের ফিহরিস তৈরি করার জন্য। তবে সাবধান, যথাযথ পরিমার্জন, সম্পাদনা ও যাচাই ছাড়া কিতাব প্রকাশ করা উচিত নয়। সংকলন এমন বিষয়ে হওয়া উচিত যার উপকার ব্যাপক এবং ফায়দা বেশি।
আলিমগণ বিভিন্ন প্রকারে হাদীস সংকলন করেছেন। প্রসিদ্ধ প্রকারগুলো:
আল-জাওয়ামি’ (الجَوَامِع)
আল-মাসানীদ (المَسَانِيد)
আস-সুনান (السُّنَن)
আল-মা’আজিম (المَعَاجِم)
আল-‘ইলাল (العِلَل)
আল-আজযা (الأَجْزَاء)
আল-আতরাফ (الأَطْرَاف)
আল-মুসতাদরাকাত (المُسْتَدْرَكَات)
আল-মুসতাখরাজাত (المُسْتَخْرَجَات)
তথ্যসূত্র ও টীকা
[৫] লেখক বলেন: আমি এই বিষয়টি সংক্ষেপে আলোচনা করব; কারণ লেখা ও সংশোধনের অনেক নিয়ম বর্তমান যুগে মুহাক্কিক (সম্পাদক) ও প্রকাশকের দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের জন্য রয়ে গেছে; প্রাচীন পাণ্ডুলিপির লেখার পরিভাষা এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য বিবেচনা জানার জন্য।
[৬] মুসলিম, কিতাবুয যুহদি ওয়ার রাকাইক, বাবুত তাসাব্বুতি ফিল হাদীস: ৪/২২৯৮, হাদীস নং ৭২।
[৭] বুখারী, কিতাবুল লুকাতাহ: ৫/৮৭, হাদীস নং ২৪৩৪।
[৮] অর্থাৎ শায়খের মূল নকল (আসলী নুসখা) যা থেকে তিনি গ্রহণ করেছেন।
চতুর্থ মাবহাস: হাদীস বর্ণনার পদ্ধতি
এই শিরোনামের উদ্দেশ্য
المُرَادُ بِهٰذِهِ التَّسْمِيَةِএই শিরোনামের উদ্দেশ্য হলো: হাদীস কীভাবে বর্ণনা করা হয়, বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন আদবসমূহ মেনে চলা উচিত এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের বিবরণ[৯]। এর কিছু আলোচনা পূর্ববর্তী মাবহাসসমূহে হয়ে গেছে; বাকিগুলো এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।
রাবী কি কিতাব থেকে বর্ণনা করতে পারবেন, যদি মুখস্থ না থাকে?
هَلْ يَجُوْزُ رِوَايَةُ الرَّاوِي مِنْ كِتَابِهِ إِذَا لَمْ يَحْفَظْ مَا فِيْهِ؟এই বিষয়ে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তিনটি দল:
তাঁরা বলেন: “শুধুমাত্র মুখস্থ থেকে বর্ণনাই দলীলযোগ্য।” এই মত ইমাম মালিক, আবূ হানীফা এবং আবূ বকর আস-সাইদালানী আশ-শাফি’ঈ থেকে বর্ণিত।
এরা এমন নুসখা (পাণ্ডুলিপি) থেকে বর্ণনা করতেন যা মূলের সাথে মিলিয়ে দেখা (মুকাবালা) হয়নি। তাঁদের মধ্যে: ইবনু লাহী’আহ।
তাঁরা বলেন: রাবী যদি তাহাম্মুল ও মুকাবালায় পূর্বোক্ত শর্তসমূহ পূরণ করে থাকেন, তাহলে কিতাব থেকে বর্ণনা করা জায়িয। এমনকি কিতাব কিছু সময়ের জন্য তাঁর কাছে না থাকলেও; যদি প্রবল ধারণা থাকে যে কিতাব পরিবর্তন-বিকৃতি থেকে নিরাপদ আছে। বিশেষত যদি তিনি এমন ব্যক্তি হন যার কাছে পরিবর্তন সাধারণত গোপন থাকে না।
অন্ধ ব্যক্তির বর্ণনার হুকুম, যিনি শ্রুত হাদীস মুখস্থ রাখতে পারেন না
حُكْمُ رِوَايَةِ الضَّرِيْرِ الَّذِي لَا يَحْفَظُ مَا سَمِعَهُযে অন্ধ ব্যক্তি শ্রুত হাদীস মুখস্থ রাখতে পারেন না, তিনি যদি কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সাহায্যে তাঁর শোনা হাদীস লিখিয়ে নেন, সংরক্ষণ করেন, কিতাবের হিফাযত করেন এবং তাঁকে পড়ে শোনানোর সময় সতর্কতা অবলম্বন করেন; যাতে প্রবল ধারণা হয় যে কিতাব পরিবর্তন থেকে নিরাপদ; তাহলে অধিকাংশ আলিমের মতে তাঁর বর্ণনা সহীহ। তিনি সেই চোখওয়ালা নিরক্ষর ব্যক্তির মতো যিনি মুখস্থ রাখতে পারেন না।
হাদীস অর্থানুসারে বর্ণনা (রিওয়ায়াহ বিল মা’না) এবং তার শর্তসমূহ
رِوَايَةُ الحَدِيْثِ بِالمَعْنٰى وَشُرُوْطُهَاহাদীসের শব্দ হুবহু না বলে অর্থানুসারে বর্ণনা করা নিয়ে সালাফদের মধ্যে মতভেদ আছে:
কিছু মুহাদ্দিস, ফকীহ ও উসূলবিদ; তাঁদের মধ্যে ইবনু সীরীন ও আবূ বকর আর-রাযী।
সালাফ ও খালাফের অধিকাংশ মুহাদ্দিস এবং ফিকহ ও উসূলের আলিমগণ; তাঁদের মধ্যে চার ইমাম। তবে শর্ত হলো, রাবী নিশ্চিত হবেন যে তিনি মূল অর্থ সঠিকভাবে আদায় করছেন।
যাঁরা অর্থানুসারে বর্ণনা জায়িয বলেছেন, তাঁরা দুটি শর্ত দিয়েছেন:
২. কোন শব্দ অর্থ পাল্টে দেয় সে বিষয়ে অভিজ্ঞ হবেন।
এই সব কথা মুসান্নাফাত (সংকলিত কিতাব) ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সংকলিত কিতাবের কোনো কিছু অর্থানুসারে বর্ণনা করা এবং তার শব্দ পরিবর্তন করা জায়িয নয়; সেই পরিবর্তিত শব্দ একই অর্থ বহন করলেও। কারণ অর্থানুসারে বর্ণনা ছিল প্রয়োজনের কারণে, যখন রাবীর কোনো শব্দ মনে পড়ত না। কিন্তু কিতাবে হাদীস লিপিবদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর অর্থানুসারে বর্ণনার কোনো প্রয়োজন নেই।
অর্থানুসারে বর্ণনাকারীর উচিত হাদীস বর্ণনার পর বলা: أَوْ كَمَا قَالَ (আও কামা কলা; অথবা তিনি যেভাবে বলেছেন) অথবা نَحْوَهُ (নাহওয়াহু; এর কাছাকাছি) অথবা شَبَهَهُ (শাবাহাহু; এর মতো)।
হাদীসে লাহন (ব্যাকরণগত ভুল) এবং তার কারণ
اللَّحْنُ فِي الحَدِيْثِ وَسَبَبُهُاللَّحْن আল-লাহন অর্থাৎ হাদীস পড়ার সময় ভুল করা। এর প্রধান কারণসমূহ:
ক. নাহু (ব্যাকরণ) ও লুগাহ (ভাষা) না শেখা:
হাদীসের ছাত্রকে এতটুকু নাহু ও লুগাহ শিখতে হবে যাতে তিনি লাহন ও তাসহীফ (বিকৃত পাঠ) থেকে রক্ষা পান। খতীব আল-বাগদাদী, হাম্মাদ ইবনু সালামাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি হাদীস শিখে কিন্তু নাহু জানে না, সে ঐ গাধার মতো যার পিঠে খাদ্যের থলি আছে কিন্তু ভেতরে কোনো যব নেই।”[১০]
খ. কিতাব ও পাণ্ডুলিপি থেকে গ্রহণ, শায়খদের কাছ থেকে সরাসরি না নেওয়া:
পূর্বে আমরা পড়েছি যে, হাদীস তাহাম্মুলের সর্বোত্তম উপায় হলো শায়খের মুখ থেকে সরাসরি শোনা অথবা শায়খের কাছে পড়া। তাই হাদীসের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তির উচিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীস বিশেষজ্ঞ ও মুহাক্কিক আলিমদের মুখ থেকে গ্রহণ করা; যাতে তাসহীফ ও ভুল থেকে রক্ষা পান। শুধু কিতাব ও পাণ্ডুলিপি থেকে নিয়ে সেগুলোকে “শায়খ” বানিয়ে নেওয়া হাদীসের ছাত্রের জন্য শোভনীয় নয়; কারণ এতে ভুল ও তাসহীফ বেড়ে যায়। তাই আলিমগণ বলেছেন: “মুসহাফী (শুধু কিতাব থেকে কুরআন শেখা) ব্যক্তি থেকে কুরআন নিও না, এবং সুহুফী (শুধু পাণ্ডুলিপি থেকে হাদীস নেওয়া) ব্যক্তি থেকে হাদীস নিও না।”[১১]
গরীবুল হাদীস (হাদীসের দুর্বোধ্য শব্দাবলি)
সংজ্ঞা
تَعْرِيْفُهُক. ভাষাগত অর্থে: الغَرِيْب আল-গরীব মানে আত্মীয়দের থেকে দূরে থাকা ব্যক্তি। এখানে উদ্দেশ্য হলো এমন শব্দ যার অর্থ অস্পষ্ট। সাহিবুল কামূস বলেন: غَرُبَ كَكَرُمَ: غَمُضَ وَخَفِيَ (গরুবা মানে অস্পষ্ট ও গোপন হওয়া)[১২]।
খ. পারিভাষিক অর্থে: হাদীসের মতনে এমন দুর্বোধ্য শব্দ যা কম ব্যবহারের কারণে বোঝা কঠিন[১৩]।
গুরুত্ব ও কাঠিন্য
أَهَمِّيَّتُهُ وَصُعُوْبَتُهُএটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মুহাদ্দিসদের জন্য এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকা লজ্জাজনক। তবে এতে প্রবেশ করা কঠিন; তাই যিনি এতে প্রবেশ করবেন তাঁর সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং আল্লাহকে ভয় করা উচিত যেন তিনি শুধু ধারণার উপর ভিত্তি করে নবী ﷺ-এর কথার ব্যাখ্যা না করেন। সালাফগণ এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন।
সর্বোত্তম তাফসীর (ব্যাখ্যা)
أَجْوَدُ تَفْسِيْرِهِগরীব শব্দের সর্বোত্তম ব্যাখ্যা হলো সেটি যা অন্য কোনো রিওয়ায়াতে ব্যাখ্যাসহ এসেছে।
‘ইমরান ইবনু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর হাদীস, অসুস্থ ব্যক্তির সালাত সম্পর্কে:
“দাঁড়িয়ে সালাত পড়ো; যদি না পারো তাহলে বসে; যদি না পারো তাহলে কাত হয়ে।”[১৪]
এখানে “কাত হয়ে” (عَلٰى جَنْبٍ) কথাটি ব্যাখ্যা করেছে ‘আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর হাদীস, যার শব্দ হলো: عَلٰى جَنْبِهِ الأَيْمَنِ مُسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةِ بِوَجْهِهِ (ডান কাতে, চেহারা কিবলামুখী করে)[১৫]।
এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ
أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِগরীবুল হাদীস
আন-নিহায়াহ ফী গরীবিল হাদীসি ওয়াল আসার
আদ-দুররুন নাসীর
আল-ফাইক
তথ্যসূত্র ও টীকা
[৯] লেখক বলেন: আমি এই বিষয়টিও সংক্ষেপে আলোচনা করব; কারণ এর কিছু বিস্তারিত বিষয় রিওয়ায়াতের যুগে প্রয়োজনীয় ছিল। বর্তমান যুগে এগুলো রিওয়ায়াতের ইতিহাস অধ্যয়নের আওতায় পড়ে এবং এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের জন্য প্রযোজ্য।
[১০] তাদরীবুর রাবী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১০৬।
[১১] মুসহাফী হলো যে ব্যক্তি কুরআন শুধু মুসহাফ (কিতাব) থেকে শেখে; কারী ও শায়খদের কাছ থেকে তালাক্কী (সরাসরি গ্রহণ) করে না। সুহুফী হলো যে ব্যক্তি হাদীস শুধু সুহুফ (পাণ্ডুলিপি) থেকে নেয়; শায়খদের কাছ থেকে তালাক্কী করে না। সাহিবুল কামূস (৩/১৬৬) বলেন: “সুহুফী: যে সহীফা পড়তে ভুল করে।”
[১২] আল-কামূস, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৫।
[১৩] ‘উলূমুল হাদীস (ইবনুস সালাহ), পৃষ্ঠা ২৭২।
[১৪] বুখারী, কিতাবু তাকসীরিস সালাহ: ২/৫৮৭, হাদীস নং ১১১৭।
[১৫] সুনানুদ দারাকুতনী।
الفَصْلُ الأَوَّلُ: كَيْفِيَّةُ ضَبْطِ الرِّوَايَةِ وَطُرُقِ تَحَمُّلِهَا
| মাবহাস | মূল বিষয়বস্তু |
|---|---|
| প্রথম মাবহাস হাদীস শ্রবণ, তাহাম্মুল ও সংরক্ষণ |
তাহাম্মুলের জন্য ইসলাম ও বুলূগ শর্ত নয় (আদায়ের জন্য শর্ত)। শ্রবণ শুরুর বয়স নিয়ে মতভেদ; পরবর্তী যুগে তাড়াতাড়ি শুরু করা উত্তম। ছোট শিশুর ক্ষেত্রে তাময়ীয (বোঝার ক্ষমতা) বিবেচ্য। |
| দ্বিতীয় মাবহাস তাহাম্মুলের আটটি উপায় |
১. সামা’ (সর্বোচ্চ), ২. কিরাআহ, ৩. ইজাযাহ (৫ প্রকার), ৪. মুনাওয়ালাহ (২ প্রকার), ৫. কিতাবাহ (২ প্রকার), ৬. ই’লাম, ৭. ওয়াসিয়্যাহ, ৮. ওয়িজাদাহ। প্রতিটির পদ্ধতি, হুকুম ও আদায়ের শব্দাবলি। |
| তৃতীয় মাবহাস হাদীস লিখন, সংরক্ষণ ও সংকলন |
হাদীস লেখায় ইজমা’, নিষেধ ও বৈধতার সমন্বয়, লেখকের কর্তব্য, মুকাবালাহ, পরিভাষা, রিহলাহ, এবং ৯ প্রকারের সংকলন (জাওয়ামি’, মাসানীদ, সুনান, মা’আজিম, ‘ইলাল, আজযা, আতরাফ, মুসতাদরাকাত, মুসতাখরাজাত)। |
| চতুর্থ মাবহাস হাদীস বর্ণনার পদ্ধতি |
কিতাব থেকে বর্ণনা (তিন মত; জমহূর মধ্যপন্থী), অন্ধ ব্যক্তির বর্ণনা, অর্থানুসারে বর্ণনা (জমহূরের মতে জায়িয; ২ শর্তসহ; মুসান্নাফাতে নিষেধ), এবং লাহনের কারণ। |
| গরীবুল হাদীস | হাদীসের দুর্বোধ্য শব্দের সংজ্ঞা, গুরুত্ব, সর্বোত্তম ব্যাখ্যা পদ্ধতি (অন্য রিওয়ায়াত দ্বারা) এবং ৪টি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। |
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: রিওয়ায়াতের আদব
(এই পরিচ্ছেদের বিস্তারিত আসছে …)
প্রথম মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): মুহাদ্দিসের আদব
ভূমিকা
مُقَدِّمَةٌযেহেতু হাদীসের সাথে সম্পৃক্ত থাকা আল্লাহ তা’আলার সবচেয়ে উত্তম নৈকট্যমূলক কাজগুলোর অন্যতম এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশা; তাই যিনি হাদীস নিয়ে কাজ করেন এবং মানুষের মাঝে তা প্রচার করেন, তাঁর উচিত উত্তম আখলাক ও সুন্দর চরিত্রে নিজেকে সজ্জিত করা। তিনি নিজে যা মানুষকে শেখাচ্ছেন তার সত্যিকার দৃষ্টান্ত হবেন; অন্যদের আদেশ করার আগে নিজের জীবনে তা বাস্তবায়ন করবেন।
মুহাদ্দিসের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আদবসমূহ
أَبْرَزُ مَا يَنْبَغِيْ أَنْ يَتَحَلّٰى بِهِ المُحَدِّثُক. নিয়্যাত সহীহ ও খালিস (একনিষ্ঠ) করা এবং অন্তরকে দুনিয়াবি উদ্দেশ্য থেকে পবিত্র রাখা; যেমন নেতৃত্বের লোভ বা খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা।
খ. তাঁর সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হবে হাদীস প্রচার করা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পক্ষ থেকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া; আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম প্রতিদানের আশায়।
গ. তাঁর চেয়ে অধিক যোগ্য ব্যক্তির (বয়সে বা ইলমে) উপস্থিতিতে হাদীস বর্ণনা না করা।
ঘ. কেউ হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, এবং তিনি জানেন যে সেটা অন্য কারো কাছে আছে, তাহলে সেই ব্যক্তির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া।
ঙ. কাউকে হাদীস শোনানো থেকে বিরত না থাকা এই অজুহাতে যে, তার নিয়্যাত সহীহ নয়। কারণ আশা করা যায় যে, পরবর্তীতে তার নিয়্যাত সহীহ হয়ে যাবে।
চ. যদি যোগ্য হন, তাহলে হাদীস إِمْلَاء ইমলা (শ্রুতলিখন) ও শিক্ষাদানের মজলিস করা। কারণ এটি রিওয়ায়াতের সর্বোচ্চ স্তর।
ইমলার মজলিসে উপস্থিত হওয়ার সময় যা করা মুস্তাহাব
مَا يُسْتَحَبُّ فِعْلُهُ إِذَا أَرَادَ حُضُوْرَ مَجْلِسِ الإِمْلَاءِক. পবিত্রতা অর্জন করা, সুগন্ধি লাগানো এবং দাড়ি পরিপাটি করা।
খ. ভাবগম্ভীর ও স্থিরভাবে বসা; রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনস্বরূপ।
গ. উপস্থিত সকলের প্রতি মনোযোগ দেওয়া; কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে অন্যদের তুলনায় আলাদা গুরুত্ব না দেওয়া।
ঘ. মজলিস আল্লাহর হামদ, নবী ﷺ-এর উপর সালাত এবং উপযুক্ত দু’আ দিয়ে শুরু ও শেষ করা।
ঙ. উপস্থিতদের বুদ্ধি ও ধারণক্ষমতার বাইরে অথবা তাঁরা বুঝবেন না এমন হাদীস থেকে বিরত থাকা।
চ. ইমলা শেষ করার সময় কিছু গল্প ও মজার ঘটনা বলা; মনকে চাঙ্গা করতে এবং একঘেয়েমি দূর করতে।
কোন বয়সে মুহাদ্দিস তাহদীসের জন্য বসবেন?
مَا هِيَ السِّنُّ الَّتِيْ يَنْبَغِيْ لِلمُحَدِّثِ أَنْ يَتَصَدّٰى لِلتَّحْدِيْثِ فِيْهَا؟এ বিষয়ে কয়েকটি মত আছে:
ক. কেউ বলেছেন ৫০ বছর, কেউ বলেছেন ৪০ বছর, কেউ অন্য বয়সও বলেছেন।
যখনই তিনি যোগ্যতা অর্জন করবেন এবং তাঁর কাছে যা আছে তার প্রয়োজন দেখা দিবে, তখনই তিনি যেকোনো বয়সে তাহদীসের জন্য বসতে পারবেন।
এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ
أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِআল-জামি’ লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামি’ (الجَامِعُ لِأَخْلَاقِ الرَّاوِيْ وَآدَابِ السَّامِعِ)
জামি’উ বায়ানিল ‘ইলমি ওয়া ফাদলিহি ওয়া মা ইয়ানবাগী ফী রিওয়ায়াতিহি ওয়া হামলিহি (جَامِعُ بَيَانِ العِلْمِ وَفَضْلِهِ وَمَا يَنْبَغِيْ فِيْ رِوَايَتِهِ وَحَمْلِهِ)
দ্বিতীয় মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): হাদীসের ছাত্রের আদব
ভূমিকা
مُقَدِّمَةٌহাদীসের ছাত্রের আদব বলতে বোঝায়: তিনি যে ইলম অন্বেষণ করছেন, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীস, তার মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নত আদব ও উত্তম আখলাক যা তাঁর মধ্যে থাকা উচিত। এই আদবসমূহের কিছু মুহাদ্দিসের সাথে মিল রাখে, আর কিছু শুধু ছাত্রের জন্য নির্দিষ্ট।
মুহাদ্দিসের সাথে যেসব আদবে মিল রয়েছে
الآدَابُ الَّتِيْ يَشْتَرِكُ فِيْهَا مَعَ المُحَدِّثِক. নিয়্যাত সহীহ করা এবং ইলম অন্বেষণে আল্লাহ তা’আলার জন্য ইখলাস রাখা।
খ. ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্য যেন দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিল না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।
আবূ দাউদ ও ইবনু মাজাহ, আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি এমন ইলম শিখল যার দ্বারা আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা হয়, কিন্তু সে তা কেবল দুনিয়ার কোনো সুবিধা লাভের জন্যই শিখল; সে কিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না।”[১৬]
গ. যে হাদীস শোনেন, সেই অনুযায়ী আমল করা।
শুধু ছাত্রের জন্য নির্দিষ্ট আদবসমূহ
الآدَابُ الَّتِيْ يَنْفَرِدُ بِهَا عَنِ المُحَدِّثِক. আল্লাহ তা’আলার কাছে তাওফীক, সঠিক পথনির্দেশনা, সহজতা এবং হাদীস দবত (সংরক্ষণ) ও বুঝার ক্ষেত্রে সাহায্য চাওয়া।
খ. পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে হাদীস অন্বেষণে নিজেকে নিয়োজিত করা এবং তা অর্জনে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করা।
গ. নিজ শহরের সবচেয়ে উত্তম শায়খ থেকে শুরু করা; সনদ, ইলম ও দীনদারিতে যিনি সবচেয়ে অগ্রগণ্য।
ঘ. শায়খকে এবং যাঁর কাছ থেকে শোনেন তাঁকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা। কারণ এটাই ইলমের মর্যাদা রক্ষা এবং ইলম দ্বারা উপকৃত হওয়ার উপায়। শায়খের সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা এবং তাঁর কাছ থেকে কখনো রূঢ় ব্যবহার পেলেও ধৈর্য ধরা।
ঙ. ইলমের যে ফায়দা (উপকারী জ্ঞান) অর্জন করেছেন, তা সহপাঠী ও ভাইদের কাছে পৌঁছে দেওয়া; তাদের কাছ থেকে গোপন না রাখা। কারণ ছাত্রদের কাছ থেকে ইলমী ফায়দা গোপন করা এক ধরনের নীচতা, যা মূর্খ ও নীচ শ্রেণির ছাত্ররাই করে থাকে। ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যই হলো তা প্রচার করা।
চ. লজ্জা বা অহংকার যেন ইলম অন্বেষণ, সামা’ ও তাহসীলের পথে বাধা না হয়। এমনকি বয়সে বা মর্যাদায় যিনি তাঁর চেয়ে ছোট, তাঁর কাছ থেকেও ইলম নিতে হবে।
ছ. শুধু হাদীস শোনা ও লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকা; বরং তা বোঝা ও জানাও জরুরি। অন্যথায় নিজেকে কষ্ট দেওয়া হবে কিন্তু কোনো লাভ হবে না।
জ. শ্রবণ, দবত ও বোঝার ক্ষেত্রে কিতাবের প্রাধান্যক্রম মেনে চলা:
তারপর: সুনানু আবী দাউদ (سُنَنُ أَبِيْ دَاوُدَ), জামি’উত তিরমিযী (جَامِعُ التِّرْمِذِيِّ) ও সুনানুন নাসাঈ (سُنَنُ النَّسَائِيِّ)।
তারপর: আস-সুনানুল কুবরা (السُّنَنُ الكُبْرٰى) লিল বাইহাকী।
তারপর: প্রয়োজন অনুসারে মাসানীদ ও জাওয়ামি’ থেকে; যেমন মুসনাদু আহমাদ (مُسْنَدُ أَحْمَدَ) ও মুওয়াত্তা মালিক (مُوَطَّأُ مَالِكٍ)।
‘ইলালের কিতাব থেকে: ‘ইলালুদ দারাকুতনী (عِلَلُ الدَّارَقُطْنِيِّ)।
আসমা (রাবীদের পরিচিতি) থেকে: আত-তারীখুল কাবীর (التَّارِيْخُ الكَبِيْرُ) লিল বুখারী, আল-জারহু ওয়াত তা’দীল (الجَرْحُ وَالتَّعْدِيْلُ) লি ইবনি আবী হাতিম।
আসমার দবত থেকে: কিতাবু ইবনি মাকূলা (كِتَابُ ابْنِ مَاكُوْلَا)।
গরীবুল হাদীস থেকে: আন-নিহায়াহ (النِّهَايَةُ) লি ইবনিল আসীর।
তথ্যসূত্র ও টীকা
[১৬] হাকিম, আল-মুসতাদরাক (المُسْتَدْرَكُ), কিতাবুল ‘ইলম: ১/৮৫। হাকিম বলেন: “এটি বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ হাদীস, তবে তাঁরা এটি বর্ণনা করেননি।” যাহাবী তাঁকে সমর্থন করেছেন।
الفَصْلُ الثَّانِي: آدَابُ الرِّوَايَةِ
| মাবহাস | মূল বিষয়বস্তু |
|---|---|
| প্রথম মাবহাস মুহাদ্দিসের আদব |
নিয়্যাতে ইখলাস, হাদীস প্রচারের আগ্রহ, যোগ্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে নম্রতা, ইমলার মজলিসের আদব (পবিত্রতা, গাম্ভীর্য, সকলের প্রতি মনোযোগ, দু’আ দিয়ে শুরু ও শেষ, শ্রোতাদের ধারণক্ষমতা বিবেচনা), এবং তাহদীসে বসার বয়স (যোগ্যতা অনুসারে, নির্দিষ্ট বয়স নয়)। |
| দ্বিতীয় মাবহাস হাদীসের ছাত্রের আদব |
মুহাদ্দিসের সাথে অভিন্ন ৩টি আদব (ইখলাস, দুনিয়াবি উদ্দেশ্য বর্জন, আমল)। ছাত্রের নিজস্ব আদব: তাওফীকের দু’আ, পূর্ণ মনোযোগ, সেরা শায়খ থেকে শুরু, শায়খকে সম্মান, সহপাঠীদের সাথে ইলম ভাগাভাগি, লজ্জা-অহংকার বর্জন, বোঝার গুরুত্ব, এবং কিতাব অধ্যয়নের প্রাধান্যক্রম (সহীহাইন → সুনান → মাসানীদ → ‘ইলাল → আসমা → গরীব)। |
البَابُ الثَّالِثُ: الرِّوَايَةُ وَآدَابُهَا وَكَيْفِيَّةُ ضَبْطِهَا
| পরিচ্ছেদ | মূল বিষয়বস্তু |
|---|---|
| প্রথম পরিচ্ছেদ রিওয়ায়াত সংরক্ষণ ও তাহাম্মুলের উপায় |
৪টি মাবহাস ও গরীবুল হাদীস: তাহাম্মুলের শর্ত (ইসলাম ও বুলূগ আদায়ে শর্ত, তাহাম্মুলে নয়), শ্রবণ শুরুর বয়স, তাহাম্মুলের ৮টি উপায় (সামা’, কিরাআহ, ইজাযাহ, মুনাওয়ালাহ, কিতাবাহ, ই’লাম, ওয়াসিয়্যাহ, ওয়িজাদাহ) ও প্রতিটির আদায়ের শব্দাবলি, হাদীস লিখন ও সংকলনের ৯ প্রকার, কিতাব থেকে বর্ণনা, অর্থানুসারে বর্ণনা, লাহনের কারণ, এবং গরীবুল হাদীসের ৪টি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। |
| দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ রিওয়ায়াতের আদব |
মুহাদ্দিসের আদব (ইখলাস, প্রচার, নম্রতা, ইমলার মজলিসের নিয়মাবলি) এবং হাদীসের ছাত্রের আদব (অভিন্ন ৩টি ও নিজস্ব আদবসমূহ; কিতাব অধ্যয়নের প্রাধান্যক্রমসহ)। |
Discover more from Debunking Misguidance
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
