দ্বিতীয় অধ্যায়: রাবীর বৈশিষ্ট্য ও জারহ-তা’দীল | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

البَابُ الثَّانِي: صِفَةُ مَنْ تُقْبَلُ رِوَايَتُهُ وَمَا يَتَعَلَّقُ بِذٰلِكَ مِنَ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيْلِ

দ্বিতীয় অধ্যায়: যাঁর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য তাঁর বৈশিষ্ট্য
এবং জারহ ও তা’দীল সম্পর্কিত আলোচনা

الفصل الأول: في الراوي، وشروط قبوله

প্রথম পরিচ্ছেদ: রাবী এবং তাঁর গ্রহণযোগ্যতার শর্তসমূহ

অনুবাদকের কথা

আগের অধ্যায়ে আমরা হাদীসের বিভিন্ন প্রকারভেদ শিখেছি। এখন প্রশ্ন হলো – কোন বর্ণনাকারীর (রাবীর) কথা আমরা গ্রহণ করব, আর কার কথা গ্রহণ করব না? এই অধ্যায়ে সেই আলোচনা আসছে। এখানে দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানবেন: রাবীর যোগ্যতার শর্ত কী কী, এবং জারহ ও তা’দীল (সমালোচনা ও নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়) কীভাবে কাজ করে।

প্রাথমিক ভূমিকা

مُقَدِّمَةٌ تَمْهِيْدِيَّةٌ

যেহেতু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীস আমাদের কাছে পৌঁছে الرُّوَاة রুওয়াতবর্ণনাকারীদের মাধ্যমে; তাই হাদীস সহীহ (বিশুদ্ধ) না অশুদ্ধ, সেটা জানার জন্য রাবীরাই (বর্ণনাকারীরাই) হলেন প্রথম ও প্রধান ভিত্তি।

এই কারণে মুহাদ্দিসগণ (হাদীসের আলিমগণ) রাবীদের নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন এবং তাঁদের বর্ণনা গ্রহণ করার জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট শর্ত নির্ধারণ করেছেন। এই শর্তগুলো তাঁদের গভীর দূরদর্শিতা, চিন্তার সঠিকতা এবং পদ্ধতির উৎকর্ষতার প্রমাণ বহন করে।

লক্ষণীয় বিষয়

রাবীর ক্ষেত্রে এবং হাদীস ও খবর গ্রহণের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ যে শর্তসমূহ নির্ধারণ করেছেন সেগুলো পৃথিবীর আর কোনো জাতি কখনো করেনি। এমনকি আজকের যুগেও – যাকে মানুষ “গবেষণা ও নির্ভুলতার যুগ” বলে, তারাও সংবাদ বহনকারীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনো শর্ত আরোপ করেনি।

বরং সরকারি সংবাদ সংস্থাগুলোর অনেক খবরও বিশ্বাসযোগ্য নয়; কারণ তাদের সংবাদদাতারা অজ্ঞাতপরিচয় (মাজহূল)। কবির ভাষায়:

“সংবাদের বিপদ হলো তার বর্ণনাকারীরাই”
(وَمَا آفَةُ الأَخْبَارِ إِلَّا رُوَاتُهَا)

আর অনেক সময় অল্প কিছুদিন পরেই সেই সংবাদগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়।


রাবী গ্রহণযোগ্য হওয়ার শর্তসমূহ

شُرُوْطُ قَبُوْلِ الرَّاوِي

হাদীস ও ফিকহের ইমামগণের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ একমত যে, একজন রাবীর বর্ণনা গ্রহণ করার জন্য দুটি মূল শর্ত পূরণ করতে হবে:

রাবী গ্রহণযোগ্য হওয়ার দুটি মূল শর্ত
রাবীর গ্রহণযোগ্যতা

┣━━━━━━━━━━━━━━━━━┳━━━━━━━━━━━━━━━━━┫
১. আল-‘আদালাহ (الْعَدَالَةُ)
ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততা
  • মুসলিম হওয়া
  • বালিগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়া
  • ‘আকিল (সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন) হওয়া
  • الفِسْق ফিস্‌ক (পাপাচার) থেকে মুক্ত হওয়া
  • خَوَارِمُ المُرُوءَةِ খাওয়ারিমুল মুরূআহ (মর্যাদা খেলাফ কাজ) থেকে মুক্ত হওয়া
২. আয-যাবত (الضَّبْطُ)
স্মৃতির নির্ভুলতা ও সংরক্ষণ
  • الثِّقَات সিকাত (নির্ভরযোগ্য) রাবীদের বিরোধী না হওয়া
  • মন্দ স্মৃতির অধিকারী না হওয়া
  • মারাত্মক রকম ভুলকারী না হওয়া
  • مُغَفَّل মুগাফফাল (অমনোযোগী) না হওয়া
  • অতিরিক্ত ভুল-ভ্রান্তিকারী না হওয়া
অনুবাদকের কথা

خَوَارِمُ المُرُوءَةِ খাওয়ারিমুল মুরূআহ বলতে এমন কাজকে বোঝায় যা একজন মানুষের মর্যাদা ও শালীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে। এগুলো সরাসরি গুনাহ নয়, কিন্তু একজন রাবীর ব্যক্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতায় প্রশ্ন তোলে। আলিমগণ যেসব কাজকে মুরূআহ নষ্টকারী বলে উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে: রাস্তায় বা বাজারে দাঁড়িয়ে খাওয়া, মানুষের সামনে অশোভনভাবে ঢেকুর তোলা বা হাই তোলা, অতিরিক্ত রসিকতা বা ঠাট্টা করা, অমর্যাদাশীল লোকদের সাথে অতিমাত্রায় ওঠাবসা করা, নিজের মর্যাদার সাথে বেমানান পোশাক পরা, প্রকাশ্যে এমন আচরণ করা যা সমাজে হীন বলে গণ্য ইত্যাদি।

সহজ করে বুঝুন

ধরুন আপনি কোনো সাক্ষীর সাক্ষ্য নিচ্ছেন। আপনি দুটো জিনিস দেখবেন: প্রথমত – লোকটি কি সৎ এবং বিশ্বস্ত? (এটা হলো ‘আদালাহ)। দ্বিতীয়ত – লোকটির স্মৃতিশক্তি কি ভালো? সে কি ঠিকমতো মনে রাখতে পারে? (এটা হলো যাবত)।

একজন সৎ কিন্তু ভুলোমনা মানুষ – তার কথাও নির্ভরযোগ্য নয়। আবার একজন চমৎকার স্মৃতিশক্তির মানুষ কিন্তু মিথ্যাবাদী – তার কথাও নির্ভরযোগ্য নয়। দুটোই একসাথে থাকতে হবে।


‘আদালাহ কীভাবে প্রমাণিত হয়?

بِمَ تَثْبُتُ الْعَدَالَةُ؟

একজন রাবীর ‘আদালাহ (ন্যায়পরায়ণতা) দুটি উপায়ের যেকোনো একটি দ্বারা প্রমাণিত হয়:

উপায় ১

মু’আদ্দিলদের সুস্পষ্ট বক্তব্য

অর্থাৎ عُلَمَاءُ التَّعْدِيْلِ উলামাউত তা’দীল (নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ের বিশেষজ্ঞগণ) অথবা তাঁদের কোনো একজন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করবেন যে, এই রাবী ‘আদিল (ন্যায়পরায়ণ)।

উপায় ২

ব্যাপক প্রসিদ্ধি ও সুখ্যাতি

যে রাবীর ‘আদালাহ আহলুল ‘ইলমের (আলিমদের) মধ্যে সুপরিচিত এবং যাঁর প্রশংসা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে; তাঁর জন্য আলাদা কোনো মু’আদ্দিলের সনদ লাগে না।

যেমন: চার ইমাম (আবূ হানীফা, মালিক, শাফি’ঈ, আহমাদ), দুই সুফিয়ান (সুফিয়ান সাওরী ও সুফিয়ান ইবনু ‘উয়াইনাহ), ইমাম আওযা’ঈ প্রমুখ।


‘আদালাহ প্রমাণে হাফিয ইবনু ‘আব্দিল বার-এর মত

مَذْهَبُ الحَافِظِ ابْنِ عَبْدِ البَرِّ فِي ثُبُوْتِ الْعَدَالَةِ

ইবনু ‘আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ-এর মত হলো: যে ব্যক্তি ইলমের ধারক হিসেবে পরিচিত এবং ইলমের প্রতি তাঁর যত্ন ও মনোযোগ সুবিদিত; তাঁকে ‘আদিল (ন্যায়পরায়ণ) হিসেবে ধরে নেওয়া হবে – যতক্ষণ না তাঁর ব্যাপারে কোনো جَرْح জারহসমালোচনা / ত্রুটি প্রমাণিত হয়।

তিনি দলীল হিসেবে এই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন:

يَحْمِلُ هٰذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُوْلُهُ، يَنْفُوْنَ عَنْهُ تَحْرِيْفَ الْغَالِيْنَ، وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِيْنَ، وَتَأْوِيْلَ الْجَاهِلِيْنَ

“প্রতিটি প্রজন্ম থেকে এই ইলমকে বহন করবে তার ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা; তারা এর থেকে দূর করবে সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিলপন্থীদের মিথ্যা দাবি এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা।” [১]

আলিমদের পর্যালোচনা

তবে ইবনু ‘আব্দিল বার-এর এই মত আলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ:

প্রথমত: এই হাদীসটি সহীহ (বিশুদ্ধ) নয়।
দ্বিতীয়ত: যদি এটি সহীহ হতো, তাহলেও এর অর্থ হতো – “এই ইলমকে বহন করা উচিত প্রতিটি প্রজন্মের ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের।” অর্থাৎ এটি একটি আদেশমূলক বাক্য (সংবাদমূলক নয়)। কারণ বাস্তবে এমন মানুষও আছে যারা ইলম বহন করে কিন্তু ‘আদিল নয়।

অনুবাদকের কথা

সহজ কথায়, ইবনু ‘আব্দিল বার বলছিলেন: “কেউ যদি আলিম হিসেবে পরিচিত হয়, তাকে আমরা নির্ভরযোগ্য ধরে নেব।” কিন্তু অন্য আলিমরা বললেন: “না, এটা ঠিক নয়। শুধু আলিম হলেই চলবে না; তার ‘আদালাহ আলাদাভাবে প্রমাণিত হতে হবে। কারণ আলিমদের মধ্যেও অবিশ্বস্ত মানুষ থাকতে পারে।”


রাবীর যাবত কীভাবে জানা যায়?

كَيْفَ يُعْرَفُ ضَبْطُ الرَّاوِي؟

একজন রাবীর ضَبْط যাবতস্মৃতির নির্ভুলতা জানা যায় তাঁর বর্ণনাকে অন্যান্য الثِّقَات الْمُتْقِنِيْنَ সিকাত মুতকিনীননির্ভরযোগ্য ও দক্ষ বর্ণনাকারীদের বর্ণনার সাথে মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে।

যদি তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁদের সাথে মিলে যান – তাহলে তিনি যাবিত (নির্ভুল স্মৃতির অধিকারী)। মাঝে মাঝে সামান্য অমিল ক্ষতিকর নয়। কিন্তু যদি তাঁদের সাথে ঘন ঘন অমিল হয়, তাহলে তাঁর যাবত ত্রুটিপূর্ণ বলে গণ্য হবে এবং তাঁকে দিয়ে দলীল দেওয়া হবে না।

সহজ করে বুঝুন

ধরুন একটি হাদীসের ক্লাসে একজন শায়খ তাঁর ছাত্রদের কাছে একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। পরবর্তীতে পাঁচজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করা হলো; শায়খ কী বলেছিলেন? চারজনের বর্ণনা পরস্পর মিলে গেল। কিন্তু একজনের বর্ণনা ঘন ঘন অমিল হচ্ছে অন্যদের সাথে। এতে বোঝা যায় তার যাবতে (স্মৃতির সংরক্ষণে) দুর্বলতা আছে। মুহাদ্দিসগণ ঠিক এভাবেই রাবীর যাবত যাচাই করতেন।


জারহ ও তা’দীল কি কারণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য?

هَلْ يُقْبَلُ الجَرْحُ وَالتَّعْدِيْلُ مِنْ غَيْرِ بَيَانِ سَبَبِهِ؟
অনুবাদকের কথা

এই অংশটি বোঝার আগে দুটো শব্দ পরিষ্কার করে নেওয়া যাক: الجَرْحُ আল-জারহ মানে হলো – কোনো আলিম যখন বলেন, “এই রাবী দুর্বল / অনির্ভরযোগ্য”; অর্থাৎ রাবীর ত্রুটি চিহ্নিত করা। আর التَّعْدِيْلُ আত-তা’দীল মানে হলো – কোনো আলিম যখন বলেন, “এই রাবী নির্ভরযোগ্য / বিশ্বস্ত”; অর্থাৎ রাবীকে নির্ভরযোগ্য ঘোষণা করা

এখন প্রশ্ন হলো: কোনো আলিম যদি শুধু বলেন “এই রাবী দুর্বল” বা “এই রাবী নির্ভরযোগ্য” – কিন্তু কেন তা ব্যাখ্যা না করেন – তাহলে কি সেটা গ্রহণ করা হবে?

বিষয় তা’দীল (নির্ভরযোগ্য ঘোষণা) জারহ (সমালোচনা / ত্রুটি)
কারণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য? হ্যাঁ, গ্রহণযোগ্য ✓ না, গ্রহণযোগ্য নয় ✗
কেন? কারণ ‘আদালাহর কারণগুলো অনেক বেশি; সব উল্লেখ করা কঠিন। মু’আদ্দিলকে বলতে হতো: “সে এটা করেনি, ওটা করেনি…” – এভাবে বলা শেষ হতো না। কারণ জারহের কারণ উল্লেখ করা কঠিন নয়। আর মানুষ জারহের কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রাখে; কেউ এমন কারণে জারহ করতে পারেন যা আসলে জারহের কারণ নয়।
শর্ত মু’আদ্দিল বিশ্বস্ত হলেই যথেষ্ট কারণ অবশ্যই مُفَسَّرًا মুফাসসারান (ব্যাখ্যাসহ) হতে হবে
Also Read:  Al-I'tibār, Al-Mutābi'and Ash-Shāhid (Explainded)

ইবনুস সালাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “এটা ফিকহ ও উসূলে ফিকহে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি। হাফিয খতীব আল-বাগদাদী উল্লেখ করেছেন যে, এটি হাদীসের হাফিয ও সমালোচক ইমামদের মত; যেমন ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম প্রমুখ।”

এই কারণেই ইমাম বুখারী এমন কিছু রাবী দ্বারা দলীল দিয়েছেন যাঁদের ব্যাপারে অন্যরা আগে জারহ করেছিলেন; যেমন ‘ইকরিমাহ, ‘আমর ইবনু মারযূক প্রমুখ। ইমাম মুসলিমও সুওয়াইদ ইবনু সা’ঈদ এবং আরো কিছু রাবী দ্বারা দলীল দিয়েছেন যাঁদের ব্যাপারে সমালোচনা প্রসিদ্ধ ছিল। ইমাম আবূ দাউদও তাই করেছেন।

মূল কথা

এসবই প্রমাণ করে যে, এই ইমামদের মতে – জারহ (সমালোচনা) ততক্ষণ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় না, যতক্ষণ না তার কারণ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়।[2]

সহজ করে বুঝুন

ধরুন একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস বললেন: “এই রাবী সিকাহ (নির্ভরযোগ্য)।” এটা গ্রহণযোগ্য – কারণ নির্ভরযোগ্য হওয়ার পেছনে অসংখ্য কারণ থাকে; তিনি মুসলিম, সৎ, স্মৃতিশক্তি ভালো, পাপাচার করেন না ইত্যাদি – এত কিছু তালিকা করে বলা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু যদি তিনি বলেন: “এই রাবী দ’ঈফ (দুর্বল)” তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হবে: “কেন? তিনি কি মিথ্যা বলতেন? নাকি তাঁর স্মৃতিশক্তি দুর্বল ছিল? নাকি তিনি অন্যদের বিরোধী বর্ণনা করতেন?” কারণ ছাড়া জারহ গ্রহণ করা হবে না; কেননা একজন আলিম হয়তো এমন কারণে জারহ করেছেন যা প্রকৃতপক্ষে জারহের যোগ্য কারণই নয়।

কিন্তু কেউ যদি বলে: “এই লোক খারাপ” – তখন বিচারক জিজ্ঞেস করবেন: “কেন? কী করেছে?” কারণ খারাপ বলার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ থাকে এবং সেই কারণটা আসলেই যথেষ্ট কিনা সেটা যাচাই করা দরকার।


তথ্যসূত্র ও টীকা

[১] হাদীসটি ইবনু ‘আদী “আল-কামিল” গ্রন্থে এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। হাফিয ইরাকী বলেছেন: “এর বিভিন্ন সূত্র আছে, তবে সবগুলোই দুর্বল; এর কোনোটিই প্রমাণিত নয়।” অবশ্য কিছু আলিম এর একাধিক সূত্রের কারণে এটিকে হাসান (গ্রহণযোগ্য) পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। বিস্তারিত দেখুন: আত-তাদরীব, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০২-৩০৩।

[2] উলুমুল হাদিস, পৃষ্ঠা ৯৬, (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

একজনের কথায় কি জারহ ও তা’দীল প্রমাণিত হয়?

هَلْ يَثْبُتُ الجَرْحُ وَالتَّعْدِيْلُ بِقَوْلِ وَاحِدٍ؟
বিশুদ্ধ মত

একজন (মু’আদ্দিল বা জারিহ) এর কথাতেই জারহ ও তা’দীল প্রমাণিত হয়।

দ্বিতীয় মত

কারো কারো মতে, কমপক্ষে দুইজনের বক্তব্য লাগবে। তবে এই মত নির্ভরযোগ্য (মু’তামাদ) নয়।


একই রাবীর ক্ষেত্রে জারহ ও তা’দীল একত্র হলে

اِجْتِمَاعُ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيْلِ فِي رَاوٍ وَاحِدٍ
অনুবাদকের কথা

অর্থাৎ একজন রাবী সম্পর্কে কিছু আলিম বলছেন “তিনি নির্ভরযোগ্য” আবার অন্য কিছু আলিম বলছেন “তিনি দুর্বল”; এই পরিস্থিতিতে কোনটি প্রাধান্য পাবে?

নির্ভরযোগ্য মত (মু’তামাদ)

الجَرْحُ আল-জারহ (সমালোচনা) প্রাধান্য পাবে; তবে শর্ত হলো, সেই জারহ অবশ্যই مُفَسَّرًا মুফাসসারানকারণসহ ব্যাখ্যাকৃত হতে হবে।

দ্বিতীয় মত (দুর্বল)

কেউ কেউ বলেছেন: যদি মু’আদ্দিলদের (যারা নির্ভরযোগ্য বলেছেন) সংখ্যা জারিহদের (যারা সমালোচনা করেছেন) সংখ্যার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে তা’দীল প্রাধান্য পাবে। তবে এই মত দুর্বল এবং নির্ভরযোগ্য নয়।

মূল নীতি

জারহ ও তা’দীল সাংঘর্ষিক হলে জারহ এগিয়ে থাকে। কারণ জারিহ (সমালোচক) রাবী সম্পর্কে এমন তথ্য জানেন যা মু’আদ্দিলের (নির্ভরযোগ্যতা প্রদানকারী) জানা নেই। এটা সংখ্যার বিষয় নয়; তথ্যগত অগ্রাধিকারের বিষয়।


কোনো ‘আদিল রাবী কারো থেকে বর্ণনা করলে কি সেটা তা’দীল?

حُكْمُ رِوَايَةِ الْعَدْلِ عَنْ شَخْصٍ

ক. একজন عَدْل ‘আদিলন্যায়পরায়ণ ও নির্ভরযোগ্য রাবী কোনো ব্যক্তি থেকে হাদীস বর্ণনা করলে, এটা সেই ব্যক্তির তা’দীল (নির্ভরযোগ্যতার স্বীকৃতি) হিসেবে গণ্য হবে না। অধিকাংশ আলিমের মত এটাই এবং এটাই বিশুদ্ধ। তবে কেউ কেউ বলেছেন: এটা তা’দীল হিসেবে গণ্য হবে।

খ. কোনো আলিম যদি একটি হাদীস অনুযায়ী আমল করেন বা ফাতওয়া দেন, তাহলে এটা সেই হাদীসকে সহীহ বলে হুকুম দেওয়া নয়। আবার তিনি যদি সেই হাদীসের বিপরীত আমল করেন, তাহলে এটাও সেই হাদীসে বা তার রাবীদের মধ্যে কোনো ত্রুটি হিসেবে গণ্য হবে না।

তবে কেউ কেউ বলেছেন: বরং আলিমের আমল সেই হাদীসকে সহীহ বলে হুকুম দেওয়ার সমতুল্য। আল-আমিদী এবং আরো কিছু উসূলবিদ এই মতকে সহীহ বলেছেন। এই মাসআলায় বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

১০

ফিস্‌ক থেকে তাওবাকারীর বর্ণনার হুকুম

حُكْمُ رِوَايَةِ التَّائِبِ مِنَ الْفِسْقِ
ক. ফিস্‌ক (পাপাচার) থেকে তাওবাকারী

যে ব্যক্তি الفِسْق আল-ফিস্‌কপাপাচার থেকে তাওবা করেছেন, তাঁর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য

খ. হাদীসে মিথ্যা বলা থেকে তাওবাকারী

কিন্তু যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসে মিথ্যা বলা থেকে তাওবা করেছেন, তাঁর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়; যদিও তিনি তাওবা করে থাকেন। এটা তাঁর জন্য এবং অন্যদের জন্য সতর্কতা ও শাস্তিস্বরূপ।

অনুবাদকের কথা

এখানে পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ গুনাহ (মদ্যপান, চুরি ইত্যাদি) থেকে তাওবা করলে সেই ব্যক্তির বর্ণনা আবার গ্রহণ করা হবে; কারণ তাওবা মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। কিন্তু যদি কেউ হাদীস জাল করে থাকে বা ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে মিথ্যা বলে থাকে, তাহলে তাওবা করলেও তার বর্ণনা আর গ্রহণ করা হবে না। কারণ হাদীসে মিথ্যা বলা এতটাই মারাত্মক যে, এর শাস্তি হিসেবে সারাজীবনের জন্য তার বর্ণনা প্রত্যাখ্যাত থাকবে; যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই কাজে সাহস না করে।


১১

হাদীস বর্ণনার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণকারীর বর্ণনার হুকুম

حُكْمُ رِوَايَةِ مَنْ أَخَذَ عَلَى التَّحْدِيْثِ أَجْرًا

যে ব্যক্তি হাদীস শোনানোর (তাহদীসের) বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন, তাঁর বর্ণনার হুকুম নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:

ক. প্রত্যাখ্যানের মত

কিছু আলিমের মতে তাঁর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। এই মত পোষণ করেন ইমাম আহমাদ, ইসহাক এবং আবূ হাতিম।

খ. গ্রহণের মত

আবার কিছু আলিমের মতে তাঁর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য। এই মত পোষণ করেন আবূ নু’আইম আল-ফাদল ইবনু দুকাইন প্রমুখ।

বিশেষ পরিস্থিতি: আবূ ইসহাক আশ-শীরাযী এমন ব্যক্তির জন্য ফাতওয়া দিয়েছেন, যিনি হাদীস বর্ণনায় ব্যস্ত থাকার কারণে পরিবারের জন্য উপার্জন করতে পারছেন না; তাঁর জন্য পারিশ্রমিক নেওয়া জায়িয (বৈধ)।

১২

অবহেলাকারী, তালকীন গ্রহণকারী ও অধিক ভুলকারীর বর্ণনার হুকুম

حُكْمُ رِوَايَةِ مَنْ عُرِفَ بِالتَّسَاهُلِ أَوْ بِقَبُوْلِ التَّلْقِيْنِ أَوْ كَثْرَةِ السَّهْوِ

নিম্নোক্ত তিন ধরনের ব্যক্তির বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়:

নং ধরন বিবরণ ও উদাহরণ
التَّسَاهُل আত-তাসাহুল
শ্রবণ বা বর্ণনায় অবহেলাকারী
যিনি হাদীস শোনার সময় ঘুমিয়ে পড়ার বিষয়ে উদাসীন থাকেন, অথবা এমন মূল কপি থেকে হাদীস বর্ণনা করেন যা মূল পাণ্ডুলিপির সাথে মিলিয়ে দেখা (মুকাবালা) হয়নি।
قَبُوْلُ التَّلْقِيْنِ কাবূলুত তালকীন
তালকীন গ্রহণকারী
যাঁকে কেউ একটি হাদীস বলে দেয় (শিখিয়ে দেয়), আর তিনি সেটাকে নিজের হাদীস মনে করে বর্ণনা করতে থাকেন; অথচ তিনি জানেনই না যে এটি আসলে তাঁর বর্ণিত হাদীসের অন্তর্ভুক্ত কিনা।
كَثْرَةُ السَّهْوِ কাসরাতুস সাহ্‌ও
অধিক ভুলকারী
যাঁর বর্ণনায় ঘন ঘন ভুল (সাহ্‌ও) হওয়ার বিষয়টি সুপরিচিত।
অনুবাদকের কথা

লক্ষ করুন, এই তিনটি ক্ষেত্রই মূলত الضَّبْط আয-যাবত (স্মৃতির নির্ভুলতা ও সংরক্ষণ) এর ত্রুটি সংক্রান্ত। সেকশন ২ এ আমরা পড়েছিলাম যে, রাবী গ্রহণযোগ্য হতে হলে ‘আদালাহ ও যাবত দুটোই থাকতে হবে। এই তিন ধরনের ব্যক্তির ‘আদালাহ হয়তো ঠিক আছে (তাঁরা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ), কিন্তু যাবতে গুরুতর ত্রুটি থাকায় তাঁদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশেষত التَّلْقِيْن আত-তালকীন (শিখিয়ে দেওয়া) এর বিষয়টি লক্ষণীয়: কেউ যদি কোনো রাবীকে একটি হাদীস বলে দেয় যা আসলে তাঁর নয়, আর সেই রাবী যাচাই ছাড়াই সেটাকে নিজের বলে বর্ণনা করতে থাকেন; এটা তাঁর যাবতের গুরুতর দুর্বলতা প্রমাণ করে।

১৩

যে শায়খ হাদীস বর্ণনা করে ভুলে গেছেন, তাঁর বর্ণনার হুকুম

حُكْمُ رِوَايَةِ مَنْ حَدَّثَ وَنَسِيَ

ক. সংজ্ঞা: مَنْ حَدَّثَ وَنَسِيَ মান হাদ্দাসা ওয়া নাসিয়া বলতে বোঝায়: একজন শায়খ তাঁর ছাত্রকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে শায়খ নিজেই সেই বর্ণনার কথা মনে করতে পারছেন না।

খ. বর্ণনার হুকুম: এখানে দুটি অবস্থা রয়েছে:

১. প্রত্যাখ্যাত হবে

যদি শায়খ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন; যেমন তিনি বলেন: “আমি এটা বর্ণনা করিনি”, অথবা “সে আমার ব্যাপারে মিথ্যা বলছে” ইত্যাদি।

গ. হাদীস প্রত্যাখ্যাত হলে কি তাঁদের কারো মধ্যে ত্রুটি সাব্যস্ত হয়?

গুরুত্বপূর্ণ নীতি

এই হাদীস প্রত্যাখ্যাত হওয়া শায়খ বা ছাত্র কারোর মধ্যেই ত্রুটি (কাদহ) সাব্যস্ত করে না। কারণ তাঁদের কোনো একজনকে অন্যজনের তুলনায় সমালোচনার বেশি যোগ্য বলা যায় না।

ঘ. উদাহরণ:

বাস্তব ঘটনা

আবূ দাউদ, তিরমিযী এবং ইবনু মাজাহ বর্ণনা করেন: রাবী’আহ ইবনু আবী ‘আব্দির রাহমান, সুহাইল ইবনু আবী সালিহ থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন:

أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَضٰى بِالْيَمِيْنِ مَعَ الشَّاهِدِ

“রাসূলুল্লাহ ﷺ একজন সাক্ষী এবং শপথের ভিত্তিতে ফায়সালা করেছেন।”

‘আব্দুল ‘আযীয ইবনু মুহাম্মাদ আদ-দারাওয়ারদী বলেন: “রাবী’আহ আমাকে সুহাইল থেকে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে আমি সুহাইলের সাথে দেখা করলাম এবং তাঁকে এই হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম; কিন্তু তিনি সেটা চিনতে পারলেন না।”

তখন আমি (‘আব্দুল ‘আযীয) তাঁকে বললাম: “রাবী’আহ আপনার সূত্রে আমাকে এই এই হাদীস বর্ণনা করেছেন।” এরপর থেকে সুহাইল নিজে এই হাদীস এভাবে বর্ণনা করতেন: “‘আব্দুল ‘আযীয আমাকে জানিয়েছেন, রাবী’আহ থেকে, আমার সূত্রে; যে আমি আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফূ’ হিসেবে এটি বর্ণনা করেছি …”

অনুবাদকের কথা

এই ঘটনাটি লক্ষ করুন: সুহাইল নিজেই তাঁর বর্ণিত হাদীস ভুলে গেছেন। কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেননি, বরং বলেছেন “আমার মনে পড়ছে না।” পরবর্তীতে যখন তাঁকে জানানো হলো, তিনি সেটা মেনে নিলেন। এখানে সুহাইলের স্মৃতিতে ত্রুটি আছে বলে গণ্য হবে না; কারণ যেকোনো মানুষের পক্ষে বর্ণিত সকল হাদীস সবসময় মনে রাখা সম্ভব নয়। মূল বিচার্য হলো: তিনি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন কিনা।

ঙ. এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ:

📖 “أَخْبَارُ مَنْ حَدَّثَ وَنَسِيَ” (আখবারু মান হাদ্দাসা ওয়া নাসিয়া)
গ্রন্থকার: খতীব আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ

প্রথম পরিচ্ছেদ সমাপ্ত: সারসংক্ষেপ
الفَصْلُ الأَوَّلُ: فِي الرَّاوِي وَشُرُوْطِ قَبُوْلِهِ
নং বিষয় মূল কথা
ভূমিকা হাদীস আমাদের কাছে পৌঁছে রাবীদের মাধ্যমে; তাই রাবী যাচাই হাদীস যাচাইয়ের প্রথম ধাপ।
রাবী গ্রহণের শর্ত দুটি: ‘আদালাহ (ন্যায়পরায়ণতা) ও যাবত (স্মৃতির নির্ভুলতা)।
‘আদালাহ প্রমাণের উপায় মু’আদ্দিলের সুস্পষ্ট বক্তব্য, অথবা আলিমদের মাঝে ব্যাপক সুখ্যাতি।
ইবনু ‘আব্দিল বার এর মত ইলমের ধারককে ‘আদিল ধরে নেওয়া হবে। তবে এই মত গ্রহণযোগ্য নয়।
যাবত যাচাইয়ের পদ্ধতি অন্য সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবীদের বর্ণনার সাথে তুলনা করা।
কারণ ছাড়া জারহ ও তা’দীল তা’দীল কারণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য। জারহ অবশ্যই কারণসহ (মুফাসসার) হতে হবে।
একজনের কথায় প্রমাণ বিশুদ্ধ মতে একজনের কথাতেই জারহ ও তা’দীল প্রমাণিত হয়।
জারহ ও তা’দীল একত্র হলে মুফাসসার (কারণসহ) জারহ প্রাধান্য পাবে; সংখ্যার বিচার নয়।
‘আদিলের বর্ণনা কি তা’দীল? না; বিশুদ্ধ মতে কারো থেকে বর্ণনা করা সেই ব্যক্তির তা’দীল নয়।
১০ তাওবাকারীর বর্ণনা ফিস্‌ক থেকে তাওবাকারীর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য। হাদীসে মিথ্যাবাদীর বর্ণনা তাওবার পরও গ্রহণযোগ্য নয়।
১১ পারিশ্রমিক গ্রহণকারী মতভেদ আছে। বিশেষ প্রয়োজনে জায়িয বলে ফাতওয়া রয়েছে।
১২ অবহেলাকারী, তালকীন গ্রহণকারী, অধিক ভুলকারী তিন ধরনের ব্যক্তির বর্ণনাই প্রত্যাখ্যাত; সবগুলোই যাবতের ত্রুটি সংক্রান্ত।
১৩ বর্ণনা করে ভুলে যাওয়া দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলে প্রত্যাখ্যাত। দ্বিধাগ্রস্তভাবে অস্বীকার করলে গ্রহণযোগ্য। কারোর মধ্যেই ত্রুটি সাব্যস্ত হয় না।
الفَصْلُ الثَّانِي: فِكْرَةٌ عَامَّةٌ عَنْ كُتُبِ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيْلِ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: জারহ ও তা’দীলের কিতাবসমূহ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা

অনুবাদকের কথা

আগের পরিচ্ছেদে আমরা শিখেছি জারহ ও তা’দীল কী, কীভাবে কাজ করে এবং এর নীতিমালা কী। এখন প্রশ্ন হলো: আলিমগণ এই বিশাল কাজ (হাজার হাজার রাবীর যাচাই) কোথায় সংকলন করেছেন? কোন কোন কিতাবে এই তথ্য পাওয়া যায়? এই পরিচ্ছেদে সেই কিতাবগুলোর পরিচয় দেওয়া হচ্ছে।

যেহেতু হাদীসকে সহীহ বা দ’ঈফ বলে হুকুম দেওয়া নির্ভর করে বেশ কিছু বিষয়ের উপর; যার মধ্যে রয়েছে রাবীদের عَدَالَة ‘আদালাহ (ন্যায়পরায়ণতা) ও ضَبْط যাবত (স্মৃতির নির্ভুলতা), অথবা তাঁদের ‘আদালাহ ও যাবতে ত্রুটি চিহ্নিত করা; তাই আলিমগণ এমন কিতাব সংকলন করেছেন যেগুলোতে রাবীদের ‘আদালাহ ও যাবতের বিবরণ রয়েছে, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মু’আদ্দিল ইমামদের বক্তব্য থেকে সংগৃহীত। এটাকে বলা হয় التَّعْدِيْل আত-তা’দীল (নির্ভরযোগ্য ঘোষণা)।

একইভাবে, সেই কিতাবগুলোতে কিছু রাবীর ‘আদালাহ অথবা যাবত ও হিফযের (মুখস্থশক্তি) বিরুদ্ধে যে সমালোচনা রয়েছে তাও বর্ণনা করা হয়েছে; নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন ইমামদের বক্তব্য থেকে সংগৃহীত। এটাকে বলা হয় الجَرْح আল-জারহ (সমালোচনা ও ত্রুটি চিহ্নিতকরণ)। এই কারণেই এসব কিতাবকে “কুতুবুল জারহি ওয়াত তা’দীল” (জারহ ও তা’দীলের কিতাবসমূহ) বলা হয়।


এই কিতাবগুলো সংখ্যায় অনেক এবং প্রকারে বিভিন্ন। এগুলোকে দুইভাবে ভাগ করা যায়:

বিষয়বস্তু অনুসারে:

প্রকার বিবরণ
শুধু সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) রাবীদের জন্য শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য রাবীদের জীবনী ও মর্যাদা সংকলিত।
শুধু দু’আফা (দুর্বল) ও মাজরূহীন (সমালোচিত) রাবীদের জন্য শুধুমাত্র দুর্বল ও সমালোচিত রাবীদের তথ্য সংকলিত।
সিকাহ ও দু’আফা উভয়ের জন্য নির্ভরযোগ্য ও দুর্বল উভয় ধরনের রাবীদের তথ্য একসাথে সংকলিত।

পরিধি অনুসারে:

প্রকার বিবরণ
সাধারণ (عَامّ) সকল হাদীস বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে; নির্দিষ্ট কোনো হাদীস গ্রন্থের সাথে সম্পর্কিত নয়।
বিশেষ (خَاصّ) নির্দিষ্ট কোনো হাদীস গ্রন্থ বা গ্রন্থসমূহের রাবীদের জীবনী সংকলিত; যেমন শুধু কুতুবুস সিত্তাহ (ছয়টি প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ) এর রাবীদের জন্য।

আলিমদের এই কাজের মর্যাদা

জারহ ও তা’দীলের আলিমগণ এই কিতাব সংকলনে যে কাজ করেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর, গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশাল। তাঁরা হাদীসের সকল রাবীর জীবনী অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করেছেন: প্রথমত তাঁদের প্রতি জারহ বা তা’দীল উল্লেখ করেছেন; তারপর তাঁরা কার কাছ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন, কারা তাঁদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন, তাঁরা কোথায় সফর করেছেন, কখন কোন শায়খের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, তাঁদের জীবনকাল ইত্যাদি সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। এটা এমন এক মাত্রার কাজ যা তাঁদের আগে কেউ করেনি; বরং আজকের আধুনিক সভ্য জাতিগুলোও মুহাদ্দিসগণ রাবীদের জীবনী সংকলনে যে বিশাল বিশ্বকোষ (মাওসূ’আত) রচনা করেছেন, তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।

এভাবে তাঁরা যুগ যুগ ধরে হাদীসের রাবী ও বাহকদের পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি সংরক্ষণ করেছেন। আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদান দিন।


জারহ ও তা’দীলের কিছু প্রসিদ্ধ কিতাব:

আত-তারীখুল কাবীর সিকাহ ও দু’আফা উভয়

গ্রন্থকার: ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ
সাধারণ (عَامّ) গ্রন্থ; নির্ভরযোগ্য ও দুর্বল উভয় ধরনের রাবীদের জীবনী সংকলিত।

আল-জারহু ওয়াত তা’দীল সিকাহ ও দু’আফা উভয়

গ্রন্থকার: ইবনু আবী হাতিম রাহিমাহুল্লাহ
সাধারণ গ্রন্থ; নির্ভরযোগ্য ও দুর্বল উভয় ধরনের রাবীদের জন্য। পূর্ববর্তী কিতাবের (আত-তারীখুল কাবীর) সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

আস-সিকাত শুধু সিকাহ

গ্রন্থকার: ইবনু হিব্বান রাহিমাহুল্লাহ
শুধুমাত্র নির্ভরযোগ্য রাবীদের জীবনী সংকলিত।

আল-কামিল ফিদ দু’আফা শুধু দু’আফা

গ্রন্থকার: ইবনু ‘আদী রাহিমাহুল্লাহ
শুধুমাত্র দুর্বল রাবীদের জীবনী সংকলিত; নাম থেকেই বিষয়বস্তু স্পষ্ট।

আল-কামাল ফী আসমাইর রিজাল কুতুবুস সিত্তাহ বিশেষ

গ্রন্থকার: ‘আব্দুল গানী আল-মাকদিসী রাহিমাহুল্লাহ
সিকাহ ও দু’আফা উভয় ধরনের রাবী অন্তর্ভুক্ত; তবে শুধুমাত্র কুতুবুস সিত্তাহ (ছয়টি প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ) এর রাবীদের জন্য বিশেষায়িত।

মীযানুল ই’তিদাল দু’আফা ও মাতরূকীন

গ্রন্থকার: ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ
দুর্বল ও المَتْرُوْكِيْن আল-মাতরূকীনপরিত্যক্ত রাবীদের জন্য বিশেষায়িত। অর্থাৎ যাঁদের ব্যাপারে জারহ করা হয়েছে, এমনকি সেই জারহ গৃহীত না হলেও তাঁদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তাহযীবুত তাহযীব তাহযীবুল কামালের সংক্ষেপণ

গ্রন্থকার: হাফিয ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ
“তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল” গ্রন্থের একটি তাহযীব (পরিমার্জন ও সংক্ষেপণ)।

তাকরীবুত তাহযীব তাহযীবুত তাহযীবের সংক্ষেপণ

গ্রন্থকার: হাফিয ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ
একই গ্রন্থকারের “তাহযীবুত তাহযীব” গ্রন্থের আরো সংক্ষিপ্ত রূপ।
অনুবাদকের কথা

লক্ষ করুন, শেষ তিনটি কিতাব (৫, ৭, ৮) পরস্পর সম্পর্কিত। মূল কিতাব হলো ‘আব্দুল গানী আল-মাকদিসীর “আল-কামাল”। এটিকে হাফিয আল-মিযযী পরিমার্জন করে লেখেন “তাহযীবুল কামাল।” সেটিকে আবার হাফিয ইবনু হাজার আরো সংক্ষেপ করে লেখেন “তাহযীবুত তাহযীব।” এবং সেটিকেও তিনি আরো সংক্ষেপ করে লেখেন “তাকরীবুত তাহযীব।” অর্থাৎ ধারাটি এরকম: আল-কামাল → তাহযীবুল কামাল → তাহযীবুত তাহযীব → তাকরীবুত তাহযীব।


দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ সমাপ্ত: সারসংক্ষেপ
الفَصْلُ الثَّانِي: فِكْرَةٌ عَامَّةٌ عَنْ كُتُبِ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيْلِ
কিতাব গ্রন্থকার বিষয়বস্তু পরিধি
আত-তারীখুল কাবীর বুখারী সিকাহ ও দু’আফা সাধারণ
আল-জারহু ওয়াত তা’দীল ইবনু আবী হাতিম সিকাহ ও দু’আফা সাধারণ
আস-সিকাত ইবনু হিব্বান শুধু সিকাহ সাধারণ
আল-কামিল ফিদ দু’আফা ইবনু ‘আদী শুধু দু’আফা সাধারণ
আল-কামাল ফী আসমাইর রিজাল ‘আব্দুল গানী আল-মাকদিসী সিকাহ ও দু’আফা কুতুবুস সিত্তাহ
মীযানুল ই’তিদাল যাহাবী দু’আফা ও মাতরূকীন সাধারণ
তাহযীবুত তাহযীব ইবনু হাজার সিকাহ ও দু’আফা কুতুবুস সিত্তাহ
তাকরীবুত তাহযীব ইবনু হাজার সিকাহ ও দু’আফা কুতুবুস সিত্তাহ
Also Read:  Al-I'tibār, Al-Mutābi'and Ash-Shāhid (Explainded)
الفَصْلُ الثَّالِثُ: مَرَاتِبُ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيْلِ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ: জারহ ও তা’দীলের স্তরসমূহ

অনুবাদকের কথা

আগের পরিচ্ছেদে আমরা জেনেছি কোন কোন কিতাবে রাবীদের জারহ ও তা’দীল সংকলিত আছে। এখন প্রশ্ন হলো: আলিমগণ যখন কোনো রাবীকে “সিকাহ” বলেন বা “দ’ঈফ” বলেন, তখন সেই শব্দগুলোর মধ্যে কি কোনো তারতম্য আছে? সব প্রশংসা কি সমান? সব সমালোচনা কি সমান? এই পরিচ্ছেদে সেটাই জানবেন; জারহ ও তা’দীলের প্রতিটি স্তর এবং সেই স্তরে ব্যবহৃত শব্দাবলি।

ইবনু আবী হাতিম তাঁর “আল-জারহু ওয়াত তা’দীল” গ্রন্থের ভূমিকায় জারহ ও তা’দীল উভয়ের স্তরকে চারটি করে ভাগ করেছেন এবং প্রতিটি স্তরের হুকুম বর্ণনা করেছেন। পরবর্তীতে আলিমগণ উভয় পক্ষে আরো দুটি করে স্তর যোগ করেন; ফলে জারহ ও তা’দীল প্রতিটির স্তর হয়ে দাঁড়ায় ছয়টি


তা’দীলের স্তরসমূহ ও তাতে ব্যবহৃত শব্দাবলি

مَرَاتِبُ التَّعْدِيْلِ وَبَعْضُ أَلْفَاظِهَا
⬆ সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন ⬇
অতিশয় নির্ভরযোগ্যতা (মুবালাগাহ) বা “আফ’আল” ওযনের শব্দ
যেমন: فُلَانٌ إِلَيْهِ الْمُنْتَهٰى فِي التَّثَبُّتِ (নির্ভরযোগ্যতায় তিনি শীর্ষে) অথবা أَثْبَتُ النَّاسِ (মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য)
হুজ্জাহ (দলীলযোগ্য) ✓
একটি বা দুটি গুণ দ্বারা জোর দেওয়া (তাওকীদ)
যেমন: ثِقَةٌ ثِقَةٌ (সিকাহ সিকাহ) অথবা ثِقَةٌ ثَبَتٌ (সিকাহ, সাবত)
হুজ্জাহ (দলীলযোগ্য) ✓
জোর ছাড়াই নির্ভরযোগ্যতার একটিমাত্র গুণ
যেমন: ثِقَةٌ (সিকাহ) অথবা حُجَّةٌ (হুজ্জাহ)
হুজ্জাহ (দলীলযোগ্য) ✓
তা’দীল আছে, কিন্তু যাবতের (স্মৃতির নির্ভুলতা) ইঙ্গিত নেই
যেমন: صَدُوْقٌ (সাদূক) অথবা مَحَلُّهُ الصِّدْقُ (তাঁর স্থান সত্যবাদিতায়) অথবা لَا بَأْسَ بِهِ (তাঁর মধ্যে কোনো সমস্যা নেই) ইবনু মা’ঈন ব্যতীত অন্যদের পরিভাষায়; কারণ ইবনু মা’ঈন যখন কোনো রাবী সম্পর্কে “লা বা’সা বিহি” বলেন, তখন তাঁর কাছে সেই রাবী সিকাহ।
দলীলযোগ্য নয়; তবে লেখা ও পরীক্ষা করা হবে
নির্ভরযোগ্যতা বা সমালোচনা কোনোটিরই ইঙ্গিত নেই
যেমন: فُلَانٌ شَيْخٌ (তিনি একজন শায়খ) অথবা رَوٰى عَنْهُ النَّاسُ (মানুষ তাঁর থেকে বর্ণনা করেছে)
দলীলযোগ্য নয়; তবে লেখা ও পরীক্ষা করা হবে (৪র্থ স্তরের চেয়ে দুর্বল)
সমালোচনার কাছাকাছি এমন ইঙ্গিত
যেমন: فُلَانٌ صَالِحُ الْحَدِيْثِ (তাঁর হাদীস মোটামুটি গ্রহণযোগ্য) অথবা يُكْتَبُ حَدِيْثُهُ (তাঁর হাদীস লেখা যায়)
দলীলযোগ্য নয়; শুধু ই’তিবারের (তুলনামূলক পরীক্ষা) জন্য লেখা হবে

তা’দীলের স্তরসমূহের হুকুম

حُكْمُ هٰذِهِ الْمَرَاتِبِ

ক. প্রথম তিনটি স্তর (১, ২, ৩): এদের রাবীদের দ্বারা দলীল দেওয়া যাবে (ইহতিজাজ); যদিও কেউ কারো চেয়ে শক্তিশালী।

খ. চতুর্থ ও পঞ্চম স্তর (৪, ৫): এদের রাবীদের দ্বারা দলীল দেওয়া যাবে না; তবে তাঁদের হাদীস লেখা হবে এবং পরীক্ষা করা হবে[৩]। পঞ্চম স্তরের রাবীরা চতুর্থ স্তরের রাবীদের চেয়ে দুর্বল।

গ. ষষ্ঠ স্তর (৬): এদের রাবীদের দ্বারা দলীল দেওয়া যাবে না; তাঁদের হাদীস শুধুমাত্র ই’তিবারের (তুলনামূলক পরীক্ষা) জন্য লেখা হবে, পরীক্ষা (ইখতিবার) করার জন্য নয়। কারণ যাবতে তাঁদের দুর্বলতা সুস্পষ্ট।


জারহের স্তরসমূহ ও তাতে ব্যবহৃত শব্দাবলি

مَرَاتِبُ الجَرْحِ وَأَلْفَاظُهَا
⬆ সবচেয়ে হালকা থেকে সবচেয়ে গুরুতর ⬇
তালয়ীন (নমনীয় সমালোচনা); জারহের মধ্যে সবচেয়ে হালকা
যেমন: فُلَانٌ لَيِّنُ الْحَدِيْثِ (তাঁর হাদীস নরম/দুর্বল) অথবা فِيْهِ مَقَالٌ (তাঁর ব্যাপারে কথা আছে)
দলীলযোগ্য নয়; শুধু ই’তিবারের জন্য লেখা হবে
স্পষ্টভাবে দলীলযোগ্য নয় বলে ঘোষণা
যেমন: فُلَانٌ لَا يُحْتَجُّ بِهِ (তাঁর দ্বারা দলীল দেওয়া যায় না) অথবা ضَعِيْفٌ (দ’ঈফ) অথবা لَهُ مَنَاكِيْرُ (তাঁর মুনকার বর্ণনা আছে)
দলীলযোগ্য নয়; শুধু ই’তিবারের জন্য লেখা হবে (১ম স্তরের চেয়ে দুর্বল)
তাঁর হাদীস লেখাই যাবে না বলে স্পষ্ট ঘোষণা
যেমন: فُلَانٌ لَا يُكْتَبُ حَدِيْثُهُ (তাঁর হাদীস লেখা যাবে না) অথবা لَا تَحِلُّ الرِّوَايَةُ عَنْهُ (তাঁর থেকে বর্ণনা করা বৈধ নয়) অথবা ضَعِيْفٌ جِدًّا (অত্যন্ত দ’ঈফ) অথবা وَاهٍ بِمَرَّةٍ (একেবারেই তুচ্ছ)
সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত ✗
মিথ্যার অভিযোগ (ইত্তিহাম বিল কাযিব)
যেমন: مُتَّهَمٌ بِالْكَذِبِ (মিথ্যার অভিযুক্ত) অথবা مُتَّهَمٌ بِالْوَضْعِ (জাল করার অভিযুক্ত) অথবা يَسْرِقُ الْحَدِيْثَ (হাদীস চুরি করে) অথবা سَاقِطٌ (পতিত) অথবা مَتْرُوْكٌ (মাতরূক/পরিত্যক্ত)
সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত ✗
সরাসরি মিথ্যাবাদী বলে অভিহিতকরণ
যেমন: كَذَّابٌ (মিথ্যাবাদী) অথবা دَجَّالٌ (প্রতারক) অথবা وَضَّاعٌ (জালকারী) অথবা يَكْذِبُ (সে মিথ্যা বলে) অথবা يَضَعُ (সে জাল করে)
সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত ✗
মিথ্যায় অতিশয়তা (মুবালাগাহ); জারহের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট
যেমন: فُلَانٌ أَكْذَبُ النَّاسِ (মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী) অথবা إِلَيْهِ الْمُنْتَهٰى فِي الْكَذِبِ (মিথ্যায় সে শীর্ষে) অথবা هُوَ رُكْنُ الْكَذِبِ (সে মিথ্যার স্তম্ভ)
সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত ✗

জারহের স্তরসমূহের হুকুম

حُكْمُ هٰذِهِ الْمَرَاتِبِ

ক. প্রথম দুটি স্তর (১, ২): এদের রাবীদের দ্বারা দলীল দেওয়া যাবে না; তবে তাঁদের হাদীস শুধুমাত্র ই’তিবারের (তুলনামূলক পরীক্ষা) জন্য লেখা হবে। দ্বিতীয় স্তরের রাবীরা প্রথম স্তরের চেয়ে দুর্বল।

খ. শেষ চারটি স্তর (৩, ৪, ৫, ৬): এদের রাবীদের দ্বারা দলীল দেওয়া যাবে না, তাঁদের হাদীস লেখাও হবে না, এবং ই’তিবারের জন্যও ব্যবহার করা হবে না।


তথ্যসূত্র ও টীকা

[৩] অর্থাৎ তাঁদের যাবত পরীক্ষা করা হবে; তাঁদের হাদীসকে অন্যান্য সিকাহ ও যাবিত রাবীদের হাদীসের সাথে মিলিয়ে দেখা হবে। যদি মিলে যায়, তাহলে তাঁর হাদীস দিয়ে দলীল দেওয়া যাবে; অন্যথায় নয়। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাবীদের মধ্যে যাঁর সম্পর্কে “সাদূক” বলা হয়েছে, তাঁর হাদীস পরীক্ষার আগে দলীলযোগ্য নয়। যে ব্যক্তি মনে করেন, “সাদূক” বলা হলে তাঁর হাদীস হাসান; তিনি ভুল করেছেন। কারণ হাসান হাদীস দিয়ে দলীল দেওয়া যায়; অথচ এই (সাদূক) রাবীর হাদীস পরীক্ষার আগে দলীলযোগ্য নয়। এটাই জারহ ও তা’দীলের ইমামদের পরিভাষা অনুযায়ী সঠিক মত। তবে হাফিয ইবনু হাজারের “তাকরীবুত তাহযীব” গ্রন্থে “সাদূক” শব্দের ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব পরিভাষা থাকতে পারে। ওয়াল্লাহু আ’লাম।


তৃতীয় পরিচ্ছেদ সমাপ্ত: সারসংক্ষেপ
الفَصْلُ الثَّالِثُ: مَرَاتِبُ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيْلِ
স্তর তা’দীল জারহ
অতিশয় নির্ভরযোগ্যতা (أَثْبَتُ النَّاسِ)
→ দলীলযোগ্য ✓
নমনীয় সমালোচনা (لَيِّنُ الْحَدِيْثِ)
→ শুধু ই’তিবার
জোরসহ নির্ভরযোগ্যতা (ثِقَةٌ ثِقَةٌ)
→ দলীলযোগ্য ✓
দলীলযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট ঘোষণা (ضَعِيْفٌ)
→ শুধু ই’তিবার
একক গুণ দ্বারা নির্ভরযোগ্যতা (ثِقَةٌ)
→ দলীলযোগ্য ✓
হাদীস লেখাই নিষিদ্ধ (لَا يُكْتَبُ حَدِيْثُهُ)
→ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত ✗
যাবতের ইঙ্গিত ছাড়া তা’দীল (صَدُوْقٌ)
→ পরীক্ষাসাপেক্ষে
মিথ্যার অভিযোগ (مُتَّهَمٌ بِالْكَذِبِ)
→ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত ✗
কোনো ইঙ্গিতই নেই (فُلَانٌ شَيْخٌ)
→ পরীক্ষাসাপেক্ষে (৪ এর চেয়ে দুর্বল)
সরাসরি মিথ্যাবাদী (كَذَّابٌ، وَضَّاعٌ)
→ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত ✗
সমালোচনার কাছাকাছি (صَالِحُ الْحَدِيْثِ)
→ শুধু ই’তিবার
মিথ্যায় অতিশয়তা (أَكْذَبُ النَّاسِ)
→ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত ✗

দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত: সারসংক্ষেপ
البَابُ الثَّانِي: صِفَةُ مَنْ تُقْبَلُ رِوَايَتُهُ وَمَا يَتَعَلَّقُ بِذٰلِكَ مِنَ الجَرْحِ وَالتَّعْدِيْلِ
পরিচ্ছেদ মূল বিষয়বস্তু
প্রথম পরিচ্ছেদ
রাবী ও তাঁর গ্রহণযোগ্যতার শর্তসমূহ
রাবী গ্রহণের দুটি শর্ত: ‘আদালাহ ও যাবত। ‘আদালাহ প্রমাণের উপায়, যাবত যাচাইয়ের পদ্ধতি, জারহ ও তা’দীলের নিয়মাবলি (কারণসহ জারহ, একজনের কথায় প্রমাণ, সাংঘর্ষিক হলে জারহের প্রাধান্য), তাওবাকারীর বর্ণনা, পারিশ্রমিক গ্রহণকারী, অবহেলাকারী ও বর্ণনা করে ভুলে যাওয়া সংক্রান্ত ১৩টি মাসআলা।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
জারহ ও তা’দীলের কিতাবসমূহ
কিতাবগুলোর শ্রেণিবিভাগ (বিষয়বস্তু অনুসারে ও পরিধি অনুসারে) এবং ৮টি প্রসিদ্ধ কিতাবের পরিচিতি: আত-তারীখুল কাবীর, আল-জারহু ওয়াত তা’দীল, আস-সিকাত, আল-কামিল, আল-কামাল, মীযানুল ই’তিদাল, তাহযীবুত তাহযীব, তাকরীবুত তাহযীব।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
জারহ ও তা’দীলের স্তরসমূহ
তা’দীলের ৬টি স্তর (সর্বোচ্চ নির্ভরযোগ্যতা থেকে সমালোচনার কাছাকাছি পর্যন্ত) এবং জারহের ৬টি স্তর (নমনীয় সমালোচনা থেকে চরম মিথ্যাবাদী পর্যন্ত); প্রতিটি স্তরে ব্যবহৃত শব্দাবলি এবং সেই স্তরের হুকুম।


Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *