চতুর্থ অধ্যায়: ইসনাদ এবং তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনা; ১ম অংশ| তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

البَابُ الرَّابِعُ: الإِسْنَادُ وَمَا يَتَعَلَّقُ بِهِ

চতুর্থ অধ্যায়: ইসনাদ এবং তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনা

الفَصْلُ الأَوَّلُ: لَطَائِفُ الإِسْنَادِ

প্রথম পরিচ্ছেদ: ইসনাদের বিশেষত্বসমূহ (লাতাইফুল ইসনাদ)

المَبْحَثُ الأَوَّلُ: الإِسْنَادُ العَالِيْ وَالنَّازِلُ

প্রথম মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): উঁচু ইসনাদ ও নিচু ইসনাদ

ভূমিকা

تَمْهِيْدٌ

الإِسْنَاد আল-ইসনাদ এই উম্মতের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য; পূর্ববর্তী কোনো উম্মতের কাছে এটি ছিল না। এটি একটি সুদৃঢ় ও জোরালো সুন্নাত। তাই মুসলিমের উচিত হাদীস ও সংবাদসমূহ বর্ণনায় ইসনাদের উপর নির্ভর করা।

সালাফদের বক্তব্য

ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন: “ইসনাদ দীনের অন্তর্ভুক্ত। যদি ইসনাদ না থাকত, তাহলে যে যা ইচ্ছা তা বলতে পারত।”

সুফিয়ান সাওরী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “ইসনাদ হলো মু’মিনের অস্ত্র।”

ইসনাদে العُلُوّ আল-‘উলুওউচ্চতা অন্বেষণ করাও একটি সুন্নাত। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল রহিমাহুল্লাহ বলেন: “উঁচু ইসনাদ অন্বেষণ সালাফদের থেকে চলে আসা সুন্নাত।”

কারণ ‘আব্দুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর শিষ্যরা কূফা থেকে মদীনায় সফর করতেন, ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর কাছ থেকে শিখতেন ও শুনতেন। এই কারণেই হাদীস অন্বেষণে সফর (রিহলাহ) মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অনেক সাহাবী উঁচু ইসনাদ অন্বেষণে সফর করেছেন; তাঁদের মধ্যে আবূ আইয়ূব ও জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা উল্লেখযোগ্য।


সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

ক. ভাষাগত অর্থে:

العَالِيْ আল-‘আলী শব্দটি العُلُوّ (‘উলুও; উচ্চতা) থেকে ইসমু ফা’ইল; যা النُّزُوْل (নুযূল; নিচে নামা) এর বিপরীত।

النَّازِل আন-নাযিল শব্দটি النُّزُوْل (নুযূল) থেকে ইসমু ফা’ইল; যা ‘উলুও এর বিপরীত।

খ. পারিভাষিক অর্থে:

উঁচু ইসনাদ

আল-ইসনাদ আল-‘আলী

যে ইসনাদে রাবীদের সংখ্যা কম; একই হাদীসের অন্য একটি ইসনাদের তুলনায় যেটিতে রাবীদের সংখ্যা বেশি।

নিচু ইসনাদ

আল-ইসনাদ আন-নাযিল

যে ইসনাদে রাবীদের সংখ্যা বেশি; একই হাদীসের অন্য একটি ইসনাদের তুলনায় যেটিতে রাবীদের সংখ্যা কম।

অনুবাদকের কথা

সহজ কথায়, রাবী যত কম (অর্থাৎ সনদের দৈর্ঘ্য যত ছোট), ইসনাদ তত উঁচু। আর রাবী যত বেশি (অর্থাৎ সনদের দৈর্ঘ্য যত লম্বা), ইসনাদ তত নিচু। কারণ রাবী যত কম হবেন, ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও তত কম, এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে পৌঁছানোর পথ তত সংক্ষিপ্ত। এজন্যই মুহাদ্দিসগণ উঁচু ইসনাদকে পছন্দ করতেন।


‘উলুও এর প্রকারভেদ

أَقْسَامُ العُلُوِّ

‘উলুও পাঁচ প্রকারে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো عُلُوٌّ مُطْلَقٌ ‘উলুও মুতলাকসর্বোচ্চ উচ্চতা, আর বাকি চারটি হলো عُلُوٌّ نِسْبِيٌّ ‘উলুও নিসবীতুলনামূলক উচ্চতা

‘উলুও এর পাঁচ প্রকার
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকটবর্তী হওয়া (সহীহ ও পরিচ্ছন্ন ইসনাদসহ)
এটিই ‘উলুও মুতলাক। ‘উলুও এর সকল প্রকারের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ।
হাদীসের কোনো ইমামের নিকটবর্তী হওয়া
যদিও সেই ইমাম থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত সংখ্যা বেশি হয়। যেমন আল-আ’মাশ, ইবনু জুরাইজ, ইমাম মালিক প্রমুখের নিকটবর্তী হওয়া; সেই সাথে ইসনাদ সহীহ ও পরিচ্ছন্ন হওয়া।
কুতুবুস সিত্তাহ বা অন্যান্য নির্ভরযোগ্য কিতাবের রিওয়ায়াতের তুলনায় নিকটবর্তী হওয়া
মুতাআখখিরীন (পরবর্তী যুগের আলিমগণ) এই প্রকারের প্রতি ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন; যা চারটি উপ-প্রকারে বিভক্ত: মুওয়াফাকাহ, বাদাল, মুসাওয়াত, এবং মুসাফাহাহ।

তৃতীয় প্রকারের চারটি উপ-প্রকার:

আল-মুওয়াফাকাহ (সমন্বয়)

المُوَافَقَةُ

المُوَافَقَة আল-মুওয়াফাকাহ হলো: কোনো সংকলকের (মুসান্নিফের) শায়খ পর্যন্ত পৌঁছানো, তবে সেই সংকলকের সূত্র ছাড়া অন্য সূত্রে; যেখানে রাবীদের সংখ্যা সংকলকের সূত্রের তুলনায় কম।

হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ শারহুন নুখবাহ (شَرْحُ النُّخْبَةِ) গ্রন্থে যে উদাহরণ দিয়েছেন

ইমাম বুখারী কুতাইবাহ থেকে, তিনি ইমাম মালিক থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন।

দৃশ্য ১: যদি আমরা এই হাদীস ইমাম বুখারীর সূত্রে বর্ণনা করি[১], তাহলে আমাদের ও কুতাইবাহর মাঝে ৮ জন রাবী থাকবেন।

দৃশ্য ২: কিন্তু যদি আমরা একই হাদীস আবুল ‘আব্বাস আস-সাররাজ[২], কুতাইবাহ থেকে এই সূত্রে বর্ণনা করি, তাহলে আমাদের ও কুতাইবাহর মাঝে থাকবেন ৭ জন রাবী।

এভাবে আমরা ইমাম বুখারীর নির্দিষ্ট শায়খ (কুতাইবাহ) এর ক্ষেত্রে তাঁর সাথে মুওয়াফাকাহ অর্জন করলাম; একই সাথে তাঁর পর্যন্ত পৌঁছানোর ইসনাদে ‘উলুও পেলাম[৩]


আল-বাদাল (বিকল্প)

البَدَلُ

البَدَل আল-বাদাল হলো: কোনো সংকলকের শায়খের শায়খ পর্যন্ত পৌঁছানো, তবে সেই সংকলকের সূত্র ছাড়া অন্য সূত্রে; যেখানে রাবীদের সংখ্যা সংকলকের সূত্রের তুলনায় কম।

হাফিয ইবনু হাজারের উদাহরণ

ধরুন সেই একই ইসনাদ আমাদের কাছে অন্য একটি সূত্রে পৌঁছে; আল-কা’নাবী[৪] থেকে, তিনি ইমাম মালিক থেকে। এক্ষেত্রে আল-কা’নাবী এই সনদে কুতাইবাহর বিকল্প (বাদাল) হিসেবে আসছেন।

অনুবাদকের কথা

মুওয়াফাকাহ ও বাদালের পার্থক্য সহজে বুঝতে: মুওয়াফাকাহ তে আমরা সংকলকের একই শায়খ (যেমন কুতাইবাহ) পর্যন্ত পৌঁছাই অন্য পথে। আর বাদাল এ আমরা সংকলকের শায়খের শায়খ (যেমন মালিক) পর্যন্ত পৌঁছাই; কিন্তু সেখানে সংকলকের শায়খের (কুতাইবাহর) জায়গায় অন্য কেউ (যেমন আল-কা’নাবী) বসেন। অর্থাৎ মালিকের আগের রাবী বদলে যায়।


আল-মুসাওয়াত (সমতা)

المُسَاوَاةُ

المُسَاوَاة আল-মুসাওয়াত হলো: কোনো একজন রাবী থেকে শেষ পর্যন্ত ইসনাদের রাবীদের সংখ্যা সেই একই সংকলকের ইসনাদের সংখ্যার সমান হওয়া।

হাফিয ইবনু হাজারের উদাহরণ

ধরুন ইমাম নাসাঈ একটি হাদীস বর্ণনা করলেন, যেখানে তাঁর ও নবী ﷺ এর মাঝে ১১ জন রাবী আছেন। এখন একই হাদীস যদি আমাদের কাছে অন্য একটি ইসনাদে পৌঁছে, যেখানে আমাদের ও নবী ﷺ এর মাঝেও ১১ জন রাবী আছেন, তাহলে আমরা সংখ্যার দিক থেকে ইমাম নাসাঈর সমান হলাম।


তথ্যসূত্র ও টীকা

[১] অর্থাৎ ইমাম বুখারীর সূত্রে।

[২] তিনি ইমাম বুখারীর অন্যতম শায়খ।

[৩] শারহুন নুখবাহ (شَرْحُ النُّخْبَةِ), পৃষ্ঠা ৬১।

[৪] আল-কা’নাবী ইমাম বুখারীর শায়খের শায়খ।


আল-মুসাফাহাহ

المُصَافَحَةُ

المُصَافَحَة আল-মুসাফাহাহ হলো: কোনো একজন রাবী থেকে শেষ পর্যন্ত ইসনাদের সংখ্যা সেই সংকলকের ছাত্রের ইসনাদের সংখ্যার সমান হওয়া।

এটাকে “মুসাফাহাহ” (করমর্দন) নামকরণ করা হয়েছে; কারণ সাধারণত পরস্পর সাক্ষাৎকারী ব্যক্তিদের মধ্যে করমর্দনের রেওয়াজ প্রচলিত।

অনুবাদকের কথা

মুসাওয়াত ও মুসাফাহাহর পার্থক্য সহজভাবে: মুসাওয়াত এ আমাদের ইসনাদের রাবীদের সংখ্যা সংকলকের নিজের ইসনাদের সমান হয়। আর মুসাফাহাহ এ আমাদের ইসনাদের রাবীদের সংখ্যা সংকলকের ছাত্রের ইসনাদের সমান হয়। অর্থাৎ মুসাফাহাহতে আমরা যেন সংকলকের ছাত্রের সমপর্যায়ে দাঁড়াই; যেন তাঁর সাথে করমর্দন করলাম।


রাবীর মৃত্যু আগে হওয়ার কারণে ‘উলুও

العُلُوُّ بِتَقَدُّمِ وَفَاةِ الرَّاوِيْ
ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহর উদাহরণ

ইমাম নববী বলেন: “যে হাদীস আমি তিনজন রাবীর মাধ্যমে বাইহাকী থেকে, তিনি হাকিম থেকে বর্ণনা করি; সেটি তার চেয়ে উঁচু যে হাদীস আমি তিনজন রাবীর মাধ্যমে আবূ বকর ইবনু খালাফ থেকে, তিনি হাকিম থেকে বর্ণনা করি। কারণ বাইহাকীর মৃত্যু ইবনু খালাফের মৃত্যুর আগে হয়েছে।”[৫]

অনুবাদকের কথা

অর্থাৎ দুটি ইসনাদে যদি রাবীদের সংখ্যা সমান হয়, এবং উভয়ই একই শায়খ (এখানে হাকিম) পর্যন্ত পৌঁছায়; তবুও যে ইসনাদের মাধ্যমিক রাবী আগে ইন্তিকাল করেছেন, সেটি উঁচু বলে গণ্য হবে। কারণ আগে ইন্তিকালকারী রাবী সম্ভবত সেই শায়খ থেকে আগে শুনেছেন, তখন শায়খের স্মৃতি ও দবত উন্নত অবস্থায় ছিল।


শ্রবণ আগে হওয়ার কারণে ‘উলুও

العُلُوُّ بِتَقْدِيْمِ السَّمَاعِ

অর্থাৎ শায়খের কাছ থেকে আগে শোনার কারণে ‘উলুও। যিনি আগে শুনেছেন, তিনি পরে শ্রবণকারীর চেয়ে ‘আলী (উঁচু) হবেন।

উদাহরণ

ধরুন দুইজন ব্যক্তি একই শায়খের কাছ থেকে শুনেছেন। তাঁদের একজন ৬০ বছর আগে শুনেছেন, আর অন্যজন ৪০ বছর আগে শুনেছেন। উভয়ের সংখ্যা সমান। এক্ষেত্রে প্রথমজন দ্বিতীয়জনের চেয়ে ‘আলী হবেন।

এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য যদি শায়খ পরবর্তীতে اِخْتَلَطَ ইখতালাতস্মৃতি বিভ্রান্ত হওয়া হয়ে থাকেন, অথবা বার্ধক্যজনিত কারণে দবতে দুর্বলতা এসে থাকে।


নুযূলের প্রকারভেদ

أَقْسَامُ النُّزُوْلِ

নুযূলের প্রকারও পাঁচটি। এগুলো ‘উলুও এর বিপরীত থেকে বোঝা যায়; ‘উলুও এর প্রতিটি প্রকারের বিপরীতে নুযূলের একটি প্রকার রয়েছে।

সহজ সূত্র

প্রতিটি ‘উলুও এর উল্টোটাই একটি নুযূল। যেমন: ক) রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে দূরত্ব, খ) ইমাম থেকে দূরত্ব, গ) কিতাবের রিওয়ায়াত থেকে দূরত্ব (মুওয়াফাকাহ, বাদাল, মুসাওয়াত, মুসাফাহাহর বিপরীত), ঘ) রাবীর মৃত্যু পরে হওয়া, ঙ) শ্রবণ পরে হওয়া।


‘উলুও উত্তম, নাকি নুযূল?

هَلِ العُلُوُّ أَفْضَلُ أَمِ النُّزُوْلُ؟
সাধারণ নীতি

‘উলুও উত্তম

জমহূরের বিশুদ্ধ মতে ‘উলুও নুযূলের চেয়ে উত্তম; কারণ এতে হাদীসে ত্রুটির সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। নুযূল অপছন্দনীয়। ইবনুল মাদীনী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “নুযূল অশুভ।” তবে এটি তখনই প্রযোজ্য, যখন দুই ইসনাদ শক্তির দিক থেকে সমান।

Also Read:  দ্বিতীয় অধ্যায়: রাবীর বৈশিষ্ট্য ও জারহ-তা'দীল | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

ব্যতিক্রম

কখনো নুযূল উত্তম

যদি নিচু ইসনাদে বিশেষ কোনো ফায়দা (উপকার) থাকে[৬], তাহলে সেই নুযূল উঁচু ইসনাদের চেয়ে উত্তম হয়।


এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ

أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

সাধারণভাবে উঁচু বা নিচু ইসনাদ বিষয়ক কোনো স্বতন্ত্র গ্রন্থ নেই। তবে আলিমগণ কিছু ছোট ছোট গ্রন্থ (আজযা) রচনা করেছেন, যেগুলোকে তাঁরা الثُّلَاثِيَّات আস-সুলাসিয়্যাত নামে অভিহিত করেছেন।

অনুবাদকের কথা

সুলাসিয়্যাত (الثُّلَاثِيَّات) মানে “ত্রিকযুক্ত সনদ”। অর্থাৎ এমন হাদীস যেখানে সংকলক ও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাঝে মাত্র তিনজন রাবী রয়েছেন। এটি উঁচু ইসনাদের সবচেয়ে চমকপ্রদ উদাহরণ; কারণ তিনজন রাবীর মাধ্যমে সরাসরি সংকলক পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। এ থেকে বোঝা যায় আলিমগণ উঁচু ইসনাদকে কতটা গুরুত্ব দিতেন।

সুলাসিয়্যাতের উদাহরণ:

সুলাসিয়্যাতুল বুখারী (ثُلَاثِيَّاتُ البُخَارِيِّ)

সংকলক: হাফিয ইবনু হাজার রহিমাহুল্লাহ

সুলাসিয়্যাতু আহমাদ ইবনু হাম্বাল (ثُلَاثِيَّاتُ أَحْمَدَ بْنِ حَنْبَلٍ)

সংকলক: আস-সাফারীনী রহিমাহুল্লাহ

তথ্যসূত্র ও টীকা

[৫] আত-তাকরীব বি-শারহিত তাদরীব (التَّقْرِيْبُ بِشَرْحِ التَّدْرِيْبِ), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬৮। উল্লেখ্য, বাইহাকী ৪৫৮ হিজরীতে এবং ইবনু খালাফ ৪৮৭ হিজরীতে ইন্তিকাল করেছেন।

[৬] যেমন, যদি নিচু ইসনাদের রাবীরা উঁচু ইসনাদের রাবীদের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য (আওসাক) হন, অথবা বেশি স্মৃতিধর (আহফায) হন, অথবা বেশি ফকীহ হন।

المَبْحَثُ الثَّانِي: المُسَلْسَلُ

দ্বিতীয় মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): আল-মুসালসাল

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

ক. ভাষাগত অর্থে: المُسَلْسَل আল-মুসালসাল শব্দটি السِّلْسِلَة (আস-সিলসিলাহ; শিকল) থেকে ইসমু মাফ’ঊল। সিলসিলাহ মানে এক জিনিসের সাথে অন্য জিনিসের সংযোগ; যেমন লোহার শিকল। শিকলের সাথে সাদৃশ্যের কারণে এই নামকরণ করা হয়েছে; সংযোগ ও প্রতিটি অংশের মধ্যে সামঞ্জস্যের দিক থেকে।

খ. পারিভাষিক অর্থে: মুসালসাল হলো এমন ইসনাদ যেখানে রাবীরা পরপর একই صِفَة সিফাতবৈশিষ্ট্য বা حَالَة হালাতঅবস্থা অনুসরণ করেন; কখনো রাবীদের ক্ষেত্রে, আবার কখনো রিওয়ায়াতের ক্ষেত্রে[৭]


সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ মুসালসাল হলো সেই ইসনাদ যেখানে রাবীরা নিম্নোক্ত যেকোনো একটি বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে একাত্ম:

ক. রাবীদের একটি অভিন্ন সিফাতে অংশগ্রহণ।
খ. রাবীদের একটি অভিন্ন হালাতে অংশগ্রহণ।
গ. রিওয়ায়াতের একটি অভিন্ন সিফাতে অংশগ্রহণ।

প্রকারভেদ

أَنْوَاعُهُ

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, মুসালসাল তিন প্রকার:

মুসালসালের তিন প্রধান প্রকার
আল-মুসালসাল

┣━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━╋━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━┫
ক. রাবীদের হালাত অনুসারে
بِأَحْوَالِ الرُّوَاةِ
  • মৌখিক (কাওলী)
  • কর্মমূলক (ফি’লী)
  • উভয় একসাথে
খ. রাবীদের সিফাত অনুসারে
بِصِفَاتِ الرُّوَاةِ
  • মৌখিক সিফাত
  • কর্মমূলক সিফাত
গ. রিওয়ায়াতের সিফাত অনুসারে
بِصِفَاتِ الرِّوَايَةِ
  • আদায়ের শব্দ অনুসারে
  • সময় অনুসারে
  • স্থান অনুসারে

রাবীদের হালাত অনুসারে মুসালসাল

المُسَلْسَلُ بِأَحْوَالِ الرُّوَاةِ

রাবীদের হালাত তিন ধরনের হতে পারে: মৌখিক (কাওলী), কর্মমূলক (ফি’লী), অথবা মৌখিক ও কর্মমূলক উভয় একসাথে।

১. রাবীদের মৌখিক হালাত অনুসারে মুসালসাল:

উদাহরণ: মু’আযের হাদীস

মু’আয ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ তাঁকে বলেছেন:

يَا مُعَاذُ، إِنِّيْ أُحِبُّكَ، فَقُلْ فِيْ دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ: اللّٰهُمَّ أَعِنِّيْ عَلٰى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ

“হে মু’আয, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি প্রতি সালাতের শেষে বলবে: হে আল্লাহ, আপনার যিকির, শুকরিয়া ও উত্তম ইবাদতে আমাকে সাহায্য করুন।”[৮]

এই হাদীসের প্রতিটি রাবী পরবর্তী রাবীকে বর্ণনা করার সময় বলতেন: “আমিও তোমাকে ভালোবাসি, তাই তুমি বলবে…” এভাবে কথাটি শিকলের মতো চলমান ছিল।

২. রাবীদের কর্মমূলক হালাত অনুসারে মুসালসাল:

উদাহরণ: আবূ হুরাইরাহর হাদীস

আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: আবুল কাসিম ﷺ আমার হাতে তাঁর হাত জড়িয়ে ধরে (شَبَّكَ بِيَدِيْ) বললেন:

خَلَقَ اللهُ الأَرْضَ يَوْمَ السَّبْتِ

“আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন শনিবারে।”[৯]

এই হাদীসের প্রতিটি রাবী পরবর্তী রাবীকে হাদীসটি বর্ণনা করার সময় তাঁর হাতে হাত জড়িয়ে ধরতেন। এভাবে ক্রিয়াটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিকলের মতো চলমান ছিল।

৩. রাবীদের মৌখিক ও কর্মমূলক উভয় হালাত একসাথে:

উদাহরণ: আনাসের হাদীস

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا يَجِدُ العَبْدُ حَلَاوَةَ الإِيْمَانِ حَتّٰى يُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ، حُلْوِهِ وَمُرِّهِ

“বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের স্বাদ পাবে না, যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো-মন্দ, মিষ্টি-তিক্ততায় বিশ্বাস করে।”[১০]

এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দাড়ি ধরে বললেন: “আমি তাকদীরের ভালো-মন্দ, মিষ্টি-তিক্ততায় ঈমান এনেছি।”

এই হাদীসের প্রতিটি রাবী বর্ণনার সময় নিজের দাড়ি ধরে একই কথা বলতেন। অর্থাৎ কর্ম (দাড়ি ধরা) ও বক্তব্য উভয়ই একসাথে চলমান ছিল।


রাবীদের সিফাত অনুসারে মুসালসাল

المُسَلْسَلُ بِصِفَاتِ الرُّوَاةِ

রাবীদের সিফাত দুই ধরনের: মৌখিক (কাওলী) ও কর্মমূলক (ফি’লী)।

১. রাবীদের মৌখিক সিফাত অনুসারে মুসালসাল:

যেমন সূরা সাফ পাঠ সংক্রান্ত মুসালসাল হাদীস; যেখানে প্রতিটি রাবী বর্ণনার সময় বলেছেন: “অমুক এটা এভাবে পড়েছেন।”

অনুবাদকের কথা

হাফিয ‘ইরাকী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “রাবীদের মৌখিক সিফাত ও মৌখিক হালাত একে অপরের কাছাকাছি; বরং একই রকম।” অর্থাৎ এই দুটি প্রকারের মধ্যে পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম।

২. রাবীদের কর্মমূলক সিফাত অনুসারে মুসালসাল:

ক. নামের মিল: যেমন “মুহাম্মাদগণের” মুসালসাল (সনদের প্রতিটি রাবীর নাম মুহাম্মাদ)।
খ. পেশা বা মর্যাদার মিল: যেমন ফকীহদের মুসালসাল অথবা হাফিযদের মুসালসাল।
গ. এলাকার মিল: যেমন দিমাশকীদের মুসালসাল (সনদের প্রতিটি রাবী দামেস্কের), অথবা মিসরীদের মুসালসাল।

রিওয়ায়াতের সিফাত অনুসারে মুসালসাল

المُسَلْسَلُ بِصِفَاتِ الرِّوَايَةِ

রিওয়ায়াতের সিফাত তিনটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে: আদায়ের শব্দ, সময়, অথবা স্থান।

১. আদায়ের শব্দ অনুসারে মুসালসাল:
যেমন এমন হাদীস যেখানে প্রতিটি রাবী বলেছেন: سَمِعْتُ (সামি’তু) অথবা أَخْبَرَنَا (আখবারানা)।
২. সময় অনুসারে মুসালসাল:
যেমন এমন হাদীস যা প্রতিটি রাবী ‘ঈদের দিনে বর্ণনা করেছেন।
৩. স্থান অনুসারে মুসালসাল:
যেমন মুলতাযামে দু’আ কবুল হওয়া সংক্রান্ত মুসালসাল হাদীস (যা প্রতিটি রাবী ঐ স্থানে বর্ণনা করেছেন)।

তথ্যসূত্র ও টীকা

[৭] আত-তাকরীব মা’আত তাদরীব (التَّقْرِيْبُ مَعَ التَّدْرِيْبِ): ২/১৮৭।

[৮] আবূ দাউদ, কিতাবুল উইত্‌র: ২/৮৬, হাদীস নং ১৫২২।

[৯] হাকিম, মা’রিফাতু ‘উলূমিল হাদীস (مَعْرِفَةُ عُلُوْمِ الحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ৪২। মুসালসাল সনদে বর্ণিত।

[১০] হাকিম, মা’রিফাতু ‘উলূমিল হাদীস (مَعْرِفَةُ عُلُوْمِ الحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ৪০। মুসালসাল সনদে বর্ণিত।

মুসালসালের ফায়দাসমূহ

مِنْ فَوَائِدِهِ

মুসালসালের একটি ফায়দা হলো: এটি রাবীদের দবতের (নির্ভুলতার) প্রতি অতিরিক্ত যত্নের প্রমাণ বহন করে।


পুরো ইসনাদে কি মুসালসাল থাকা শর্ত?

هَلْ يُشْتَرَطُ وُجُوْدُ التَّسَلْسُلِ فِيْ جَمِيْعِ الإِسْنَادِ؟

না, এটি শর্ত নয়। মুসালসাল ইসনাদের মাঝখানে বা শেষে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মুহাদ্দিসগণ বলেন: “এটি অমুক পর্যন্ত মুসালসাল।”


মুসালসাল ও সিহহার (বিশুদ্ধতার) মধ্যে সম্পর্ক নেই

لَا ارْتِبَاطَ بَيْنَ التَّسَلْسُلِ وَالصِّحَّةِ
গুরুত্বপূর্ণ নীতি

মুসালসাল সনদ খুব কমই ত্রুটিমুক্ত থাকে; হয় তাসালসুলে (ধারাবাহিকতায়) ত্রুটি থাকে, অথবা দুর্বলতা (দুয়ফ) থাকে। তবে মূল হাদীসটি মুসালসাল সূত্র ছাড়া অন্য সূত্রে সহীহ হতে পারে।

অনুবাদকের কথা

এই বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ রাখা জরুরি। কোনো হাদীস মুসালসাল হওয়া মানেই সেটা সহীহ, এমন ভাবা ভুল। মুসালসাল একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য মাত্র; যা শিকলের মতো একটি ধারাবাহিকতা দেখায়। কিন্তু হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ভর করে রাবীদের ‘আদালাহ, দবত এবং সনদের ইত্তিসাল (সংযোগ) এর উপর। একটি মুসালসাল হাদীসের সনদে দুর্বল রাবী থাকতে পারেন, তখন সেই সনদ দুর্বল হবে; যদিও মূল হাদীস অন্য সূত্রে সহীহ হতে পারে।


এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ

أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আল-মুসালসালাতুল কুবরা (المُسَلْسَلَاتُ الكُبْرٰى)

সুয়ূতী রহিমাহুল্লাহ
এতে ৮৫টি হাদীস অন্তর্ভুক্ত।

আল-মানাহিলুস সালসালাহ ফিল আহাদীসিল মুসালসালাহ (المَنَاهِلُ السَّلْسَلَةُ فِيْ الأَحَادِيْثِ المُسَلْسَلَةِ)

মুহাম্মাদ ‘আব্দুল বাকী আল-আইয়ূবী রহিমাহুল্লাহ
এতে ২১২টি হাদীস অন্তর্ভুক্ত।

المَبْحَثُ الثَّالِثُ: رِوَايَةُ الأَكَابِرِ عَنِ الأَصَاغِرِ

তৃতীয় মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): বড়দের থেকে ছোটদের বর্ণনা গ্রহণ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

ক. ভাষাগত অর্থে: الأَكَابِر আল-আকাবির হলো أَكْبَر (আকবার; বড়) এর বহুবচন। আর الأَصَاغِر আল-আসাগির হলো أَصْغَر (আসগার; ছোট) এর বহুবচন। অর্থ: বড়দের ছোটদের কাছ থেকে বর্ণনা গ্রহণ।

খ. পারিভাষিক অর্থে: এমন ব্যক্তি থেকে বর্ণনা গ্রহণ করা, যিনি বর্ণনাকারীর চেয়ে বয়সে ও তবকায় ছোট, অথবা ইলম ও হিফযে নিম্ন।


Also Read:  চতুর্থ অধ্যায়: ইসনাদ এবং তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনা; ২য় অংশ | তাইসীরু মুসতালাহিল হাদীস

সংজ্ঞার ব্যাখ্যা

شَرْحُ التَّعْرِيْفِ

অর্থাৎ একজন রাবী এমন ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যিনি তাঁর চেয়ে বয়সে ছোট এবং طَبَقَة তবকাহপ্রজন্ম / স্তর তে নিম্ন। তবকায় নিম্ন হওয়ার উদাহরণ: সাহাবীগণ তাবি’ঈনদের কাছ থেকে বর্ণনা করা ইত্যাদি।

অথবা এমন ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যিনি ইলম ও হিফযে তাঁর চেয়ে নিম্ন; যেমন একজন ‘আলিম হাফিয এমন কোনো শায়খের কাছ থেকে বর্ণনা করেন যাঁর বয়স হয়তো বেশি, কিন্তু ইলম ও হিফযে তিনি সেই ‘আলিমের চেয়ে নিম্ন।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

লক্ষ রাখতে হবে যে, শুধু বয়সে বড় হওয়া বা তবকায় অগ্রবর্তী হওয়াই “বড়দের থেকে ছোটদের বর্ণনা” নামকরণের জন্য যথেষ্ট নয়; সাথে ইলমেও সমতা বা শ্রেষ্ঠত্ব থাকতে হবে। নিচের উদাহরণগুলো এটি পরিষ্কার করবে।


প্রকারভেদ ও উদাহরণ

أَقْسَامُهَا وَأَمْثِلَتُهَا

এটি তিন প্রকার:

বড়দের থেকে ছোটদের বর্ণনা গ্রহণের তিন প্রকার
বয়স ও তবকায় বড় (সাথে ইলম ও হিফযেও)
রাবী বয়সে বড় এবং তবকায় অগ্রবর্তী; সাথে ইলম ও হিফযেও শ্রেষ্ঠ।
মর্যাদায় বড়, তবে বয়সে নয়
যেমন: একজন ‘আলিম হাফিয এমন শায়খের কাছ থেকে বর্ণনা করেন যিনি বয়সে বড় কিন্তু হাফিয নন।
উদাহরণ: ইমাম মালিক, ‘আব্দুল্লাহ ইবনু দীনার থেকে বর্ণনা করা[১১]
বয়স ও মর্যাদা উভয়েই বড়
অর্থাৎ বর্ণনাগ্রহীতার চেয়ে বয়সেও বড় এবং ইলমেও শ্রেষ্ঠ।
উদাহরণ: আল-বারকানী, খতীব আল-বাগদাদী থেকে বর্ণনা করা[১২]

বড়দের থেকে ছোটদের বর্ণনা গ্রহণের আরো উদাহরণ

مِنْ رِوَايَةِ الأَكَابِرِ عَنِ الأَصَاغِرِ

ক. সাহাবীদের তাবি’ঈনদের কাছ থেকে বর্ণনা:

যেমন ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস, ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার, ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর এবং ‘আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম (যাঁদেরকে “আল-‘আবাদিলাহ” বলা হয়) এবং অন্যরা, কা’ব আল-আহবার থেকে বর্ণনা করা।

খ. তাবি’ঈদের তাবি’ তাবি’ঈনদের কাছ থেকে বর্ণনা:

যেমন: ইয়াহইয়া ইবনু সা’ঈদ আল-আনসারী, ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করা।

এটি জানার ফায়দাসমূহ

مِنْ فَوَائِدِهِ

ক. যেন ধারণা না হয় যে, যাঁর থেকে বর্ণনা নেওয়া হয়েছে তিনিই সবসময় বর্ণনাগ্রহীতার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বড়; কারণ এটাই সাধারণ নিয়ম।

খ. যেন ধারণা না হয় যে সনদে কোনো উল্টোপাল্টা (ইনকিলাব) ঘটেছে; কারণ সাধারণ নিয়ম হলো ছোটরা বড়দের থেকে বর্ণনা করেন।

অনুবাদকের কথা

সাধারণত আমরা ধারণা করি, কোনো সনদে যদি অমুক ব্যক্তি “অমুক থেকে” বর্ণনা করেন, তাহলে দ্বিতীয় ব্যক্তি (যাঁর থেকে বর্ণনা) প্রথম ব্যক্তির চেয়ে বড় বা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এই ধরনের বর্ণনায় তা উল্টো ঘটে: বড় জন ছোট জন থেকে বর্ণনা করেন। এটি না জানলে কেউ মনে করতে পারেন সনদে ভুল বা উল্টাপাল্টা হয়েছে। তাই এই প্রকার চেনা জরুরি, যাতে সনদের সঠিকতা নিয়ে ভুল সন্দেহ না হয়।


এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ

أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

মা রাওয়াহুল কিবারু ‘আনিস সিগার ওয়াল আবাউ ‘আনিল আবনা (مَا رَوَاهُ الكِبَارُ عَنِ الصِّغَارِ وَالآبَاءُ عَنِ الأَبْنَاءِ)

হাফিয আবূ ইয়া’কূব ইসহাক ইবনু ইবরাহীম আল-ওয়াররাক রহিমাহুল্লাহ
“বড়দের ছোটদের থেকে এবং পিতাদের পুত্রদের থেকে বর্ণনা” বিষয়ক সংকলন।

তথ্যসূত্র ও টীকা

[১১] কারণ ইমাম মালিক হলেন একজন ইমাম হাফিয; আর ‘আব্দুল্লাহ ইবনু দীনার ছিলেন কেবল একজন শায়খ ও রাবী। যদিও ‘আব্দুল্লাহ ইবনু দীনার বয়সে ইমাম মালিকের চেয়ে বড় ছিলেন।

[১২] কারণ আল-বারকানী বয়সে খতীব আল-বাগদাদীর চেয়ে বড় এবং মর্যাদায়ও বেশি; তিনি ছিলেন খতীবের শায়খ ও শিক্ষক এবং তাঁর চেয়ে অধিক ‘আলিম।

المَبْحَثُ الرَّابِعُ: رِوَايَةُ الآبَاءِ عَنِ الأَبْنَاءِ

চতুর্থ মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): পিতাদের পুত্রদের কাছ থেকে বর্ণনা গ্রহণ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

হাদীসের সনদে এমন একজন পিতা থাকা, যিনি হাদীসটি তাঁর পুত্র থেকে বর্ণনা করেন।


উদাহরণ

مِثَالُهُ
আল-‘আব্বাস ও ফাদলের হাদীস

আল-‘আব্বাস ইবনু ‘আব্দিল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তাঁর পুত্র আল-ফাদল থেকে বর্ণনা করেন:

أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ جَمَعَ بَيْنَ الصَّلَاتَيْنِ بِالمُزْدَلِفَةِ

“রাসূলুল্লাহ ﷺ মুযদালিফায় দুই সালাত একত্রে আদায় করেছেন।”[১৩]


এটি জানার ফায়দা

مِنْ فَوَائِدِهِ

যাতে কেউ মনে না করেন যে, সনদে কোনো উল্টাপাল্টা (ইনকিলাব) বা ভুল ঘটেছে। কারণ সাধারণ নিয়ম হলো পুত্র পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেন। এই প্রকার এবং পূর্ববর্তী প্রকার (বড়দের থেকে ছোটদের বর্ণনা) আলিমগণের বিনয়ের প্রমাণ বহন করে; তাঁরা যেকোনো ব্যক্তির কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করতেন; সে ব্যক্তি মর্যাদা বা বয়সে তাঁদের চেয়ে নিম্ন হলেও।


এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ

أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

রিওয়ায়াতুল আবাই ‘আনিল আবনা (رِوَايَةُ الآبَاءِ عَنِ الأَبْنَاءِ)

খতীব আল-বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ

المَبْحَثُ الخَامِسُ: رِوَايَةُ الأَبْنَاءِ عَنِ الآبَاءِ

পঞ্চম মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): পুত্রদের পিতাদের কাছ থেকে বর্ণনা গ্রহণ

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

হাদীসের সনদে এমন একজন পুত্র থাকা, যিনি হাদীসটি শুধু তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন; অথবা তাঁর পিতা, তিনি দাদা থেকে বর্ণনা করেন।


এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক

أَهَمُّهُ

এই প্রকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সেই সনদসমূহ যেখানে পিতা বা দাদার নাম উল্লেখ করা হয়নি। কারণ সেই নাম জানার জন্য গবেষণা প্রয়োজন হয়।


প্রকারভেদ

أَنْوَاعُهُ

ক. শুধু পিতার কাছ থেকে বর্ণনা (দাদা বাদে):

এই প্রকার অনেক বেশি পাওয়া যায়।

উদাহরণ

আবুল ‘উশারা, তাঁর পিতার কাছ থেকে বর্ণনা[১৪]

খ. পিতা, তিনি দাদার কাছ থেকে; অথবা পিতা, তিনি দাদা, তিনি দাদার ঊর্ধ্বতন পুরুষ থেকে:

উদাহরণ: ‘আমর ইবনু শু’আইবের সনদ

‘আমর ইবনু শু’আইব, তাঁর পিতার কাছ থেকে, তিনি দাদার কাছ থেকে বর্ণনা[১৫]


এটি জানার ফায়দাসমূহ

مِنْ فَوَائِدِهِ

ক. পিতা বা দাদার নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে সেই নাম অনুসন্ধান করা।

খ. “দাদা” বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে তা নির্ণয় করা; তিনি পুত্রের দাদা, নাকি পিতার দাদা?

অনুবাদকের কথা

‘আমর ইবনু শু’আইবের সনদের জটিলতাটি লক্ষ করুন। সনদে লেখা থাকে: “‘আমর ইবনু শু’আইব, তাঁর পিতা থেকে, তিনি তাঁর দাদা থেকে।” এখন প্রশ্ন হলো, “দাদা” বলতে কার দাদা বোঝানো হয়েছে? ‘আমরের দাদা? নাকি শু’আইবের দাদা?

যদি “দাদা” বলতে ‘আমরের দাদা বোঝায়, তাহলে তিনি মুহাম্মাদ; যিনি সাহাবী নন। কিন্তু আলিমগণ গবেষণা ও অনুসরণের মাধ্যমে নির্ধারণ করেছেন যে, এখানে “দাদা” বলতে শু’আইবের দাদা অর্থাৎ ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বোঝানো হয়েছে; যিনি প্রসিদ্ধ সাহাবী। ফলে এই সনদ মারফূ’ এবং হুজ্জাহ।


এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ

أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

রিওয়ায়াতুল আবনা ‘আন আবাইহিম (رِوَايَةُ الأَبْنَاءِ عَنْ آبَائِهِمْ)

আবূ নসর ‘উবাইদুল্লাহ ইবনু সা’ঈদ আল-ওয়াইলী রহিমাহুল্লাহ

জুযউ মান রাওয়া ‘আন আবীহি ‘আন জাদ্দিহি (جُزْءُ مَنْ رَوٰى عَنْ أَبِيْهِ عَنْ جَدِّهِ)

ইবনু আবী খাইসামাহ রহিমাহুল্লাহ

আল-ওয়াশিউল মু’লাম ফীমান রাওয়া ‘আন আবীহি ‘আন জাদ্দিহি ‘আনিন নবী ﷺ (الوَشْيُ المُعْلَمُ فِيْمَنْ رَوٰى عَنْ أَبِيْهِ عَنْ جَدِّهِ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ)

হাফিয আল-‘আলাঈ রহিমাহুল্লাহ

তথ্যসূত্র ও টীকা

[১৩] খতীব বর্ণনা করেছেন; যেমনটি সাখাবী উল্লেখ করেছেন, পৃষ্ঠা ৪১০। হাদীসের মূল সহীহাইন ও অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত।

[১৪] তাঁর নাম এবং তাঁর পিতার নাম সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে; সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মত হলো তিনি উসামাহ ইবনু মালিক।

[১৫] ‘আমরের পূর্ণ বংশধারা এরূপ: “‘আমর ইবনু শু’আইব ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু ‘আব্দিল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস।” সুতরাং ‘আমরের দাদা হলেন মুহাম্মাদ। কিন্তু আলিমগণ অনুসন্ধান ও গবেষণার মাধ্যমে পেয়েছেন যে, “জাদ্দিহি” (তাঁর দাদা) শব্দের সর্বনাম শু’আইবকে নির্দেশ করে। সুতরাং “তাঁর দাদা” বলতে ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বোঝানো হয়েছে; যিনি প্রসিদ্ধ সাহাবী।

المَبْحَثُ السَّادِسُ: المُدَبَّجُ وَرِوَايَةُ الأَقْرَانِ

ষষ্ঠ মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): আল-মুদাব্বাজ ও আকরানদের পারস্পরিক বর্ণনা

আকরানের সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُ الأَقْرَانِ

ক. ভাষাগত অর্থে: الأَقْرَان আল-আকরান হলো قَرِيْن (কারীন) এর বহুবচন, যার অর্থ সঙ্গী বা সাথী; যেমনটি আল-কামূস গ্রন্থে রয়েছে[১৬]

খ. পারিভাষিক অর্থে: এমন রাবীগণ যাঁরা বয়সে ও ইসনাদে পরস্পর নিকটবর্তী[১৭]


আকরানদের বর্ণনার সংজ্ঞা (রিওয়ায়াতুল আকরান)

تَعْرِيْفُ رِوَايَةِ الأَقْرَانِ

رِوَايَةُ الأَقْرَانِ রিওয়ায়াতুল আকরান হলো: দুই কারীনের (সমসাময়িক ব্যক্তির) মধ্যে একজন অন্যজন থেকে বর্ণনা করা[১৮]

Also Read:  Al-I'tibār, Al-Mutābi'and Ash-Shāhid (Explainded)

উদাহরণ

সুলাইমান আত-তাইমীর মিস’আর ইবনু কিদাম থেকে বর্ণনা। তাঁরা দুজন কারীন (সমসাময়িক); কিন্তু আমরা মিস’আরের পক্ষ থেকে আত-তাইমী থেকে কোনো বর্ণনার খবর পাই না।


আল-মুদাব্বাজের সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُ المُدَبَّجِ

ক. ভাষাগত অর্থে: المُدَبَّج আল-মুদাব্বাজ শব্দটি ইসমু মাফ’ঊল, যা التَّدْبِيْج (আত-তাদবীজ; সাজানো/সৌন্দর্যবর্ধন) থেকে এসেছে। এই শব্দটি دِيْبَاجَتَيِ الوَجْهِ দীবাজাতায়িল ওয়াজহিমুখের দুই গাল থেকে গৃহীত। যেমন দুই গাল পরস্পর সমান, তেমনি মুদাব্বাজে রাবী ও যাঁর থেকে বর্ণনা করা হয়েছে তাঁরা পরস্পর সমান; এই সাদৃশ্যের কারণেই এই নামকরণ।

খ. পারিভাষিক অর্থে: দুই কারীনের মধ্যে প্রত্যেকেই একে অপর থেকে বর্ণনা করবেন[১৯]

অনুবাদকের কথা

রিওয়ায়াতুল আকরান ও মুদাব্বাজের পার্থক্য সহজে বুঝতে:

রিওয়ায়াতুল আকরান: দুই সমসাময়িকের মধ্যে শুধু একজন অন্যজন থেকে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ এটা একমুখী

মুদাব্বাজ: দুই সমসাময়িক পরস্পর থেকে বর্ণনা করেন। অর্থাৎ এটা দ্বিমুখী। এটি রিওয়ায়াতুল আকরানের একটি বিশেষ রূপ। সুতরাং প্রতিটি মুদাব্বাজ আকরানের বর্ণনা, কিন্তু প্রতিটি আকরানের বর্ণনা মুদাব্বাজ নয়।


মুদাব্বাজের উদাহরণসমূহ

أَمْثِلَةُ المُدَبَّجِ
সাহাবীদের মধ্যে

‘আইশাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, এবং আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ‘আইশাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণনা করেন।

তাবি’ঈনদের মধ্যে

আয-যুহরী ‘উমার ইবনু ‘আব্দিল ‘আযীয থেকে বর্ণনা করেন, এবং ‘উমার ইবনু ‘আব্দিল ‘আযীয আয-যুহরী থেকে বর্ণনা করেন।

তাবি’ তাবি’ঈনদের মধ্যে

ইমাম মালিক আল-আওযা’ঈ থেকে বর্ণনা করেন, এবং আল-আওযা’ঈ ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করেন।


এটি জানার ফায়দাসমূহ

مِنْ فَوَائِدِهِ

ক. যেন সনদে রাবীর সংখ্যা বেশি আছে বলে ভ্রম না হয়[২০]

খ. যেন এই ভ্রম না হয় যে, সনদে “‘আন” (عَنْ; থেকে) এর জায়গায় “ওয়াও” (وَ; এবং) থাকার কথা ছিল[২১]


এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ

أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আল-মুদাব্বাজ (المُدَبَّجُ)

ইমাম দারাকুতনী রহিমাহুল্লাহ

রিওয়ায়াতুল আকরান (رِوَايَةُ الأَقْرَانِ)

আবুশ শায়খ আল-আসবাহানী রহিমাহুল্লাহ

তথ্যসূত্র ও টীকা

[১৬] আল-কামূস (القَامُوْسُ), খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৬০।

[১৭] ‘উলূমুল হাদীস (عُلُوْمُ الحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ৩০৯। ইসনাদে নিকটবর্তী হওয়ার অর্থ হলো, তাঁরা এমন শায়খদের কাছ থেকে হাদীস নিয়েছেন যাঁরা একই তবকার।

[১৮] ‘উলূমুল হাদীস (عُلُوْمُ الحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ৩১০।

[১৯] ‘উলূমুল হাদীস (عُلُوْمُ الحَدِيْثِ), পৃষ্ঠা ৩০৯।

[২০] কারণ সাধারণ নিয়ম হলো ছাত্র শায়খ থেকে বর্ণনা করে। তাই কেউ যদি তাঁর কারীন থেকে বর্ণনা করেন, এই বিষয়ে যিনি অধ্যয়ন করেননি তিনি হয়তো মনে করবেন যে, উল্লিখিত কারীনের নামটি নাসিখের (কপিকারের) পক্ষ থেকে অতিরিক্ত যোগ।

[২১] অর্থাৎ এই সনদ শুনে বা পড়ে কেউ যেন ভুল করে মনে না করেন যে, মূল বর্ণনা ছিল: “হাদ্দাসানা অমুক ওয়া (এবং) অমুক”, এবং লেখক ভুল করে “‘আন (থেকে)” লিখেছেন।

المَبْحَثُ السَّابِعُ: السَّابِقُ وَاللَّاحِقُ

সপ্তম মাবহাস (আলোচ্য বিষয়): আস-সাবিক ওয়াল লাহিক (আগের ও পরের রাবী)

সংজ্ঞা

تَعْرِيْفُهُ

ক. ভাষাগত অর্থে: السَّابِق আস-সাবিক হলো ইসমু ফা’ইল, যা السَّبْق (আস-সাবক; অগ্রগামিতা) থেকে; অর্থ হলো আগের। আর اللَّاحِق আল-লাহিক হলো ইসমু ফা’ইল, যা اللَّحَاق (আল-লাহাক; পশ্চাৎগামিতা) থেকে; অর্থ হলো পরের। এখানে উদ্দেশ্য হলো: যে রাবী মৃত্যুতে আগে এবং যে রাবী মৃত্যুতে পরে।

খ. পারিভাষিক অর্থে: একই শায়খ থেকে বর্ণনায় দুইজন রাবী অংশগ্রহণ করবেন, তাঁদের দুজনের মৃত্যুর মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান থাকবে[২২]


উদাহরণ

مِثَالُهُ
প্রথম উদাহরণ: মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক আস-সাররাজের শায়খত্ব

মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক আস-সাররাজ[২৩] থেকে বর্ণনায় দুইজন রাবী অংশগ্রহণ করেছেন:

সাবিক (আগের): ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ (ইন্তিকাল ২৫৬ হিজরী)
লাহিক (পরের): আবুল হাসান আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-খাফফাফ আন-নায়সাবূরী (ইন্তিকাল ৩৯৩ হিজরী)
ব্যবধান: ১৩৭ বছর বা তারও বেশি[২৪]
দ্বিতীয় উদাহরণ: ইমাম মালিকের শায়খত্ব

ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনায় দুইজন রাবী অংশগ্রহণ করেছেন:

সাবিক (আগের): ইমাম আয-যুহরী রহিমাহুল্লাহ (ইন্তিকাল ১২৪ হিজরী)
লাহিক (পরের): আহমাদ ইবনু ইসমা’ঈল আস-সাহমী রহিমাহুল্লাহ (ইন্তিকাল ২৫৯ হিজরী)
ব্যবধান: ১৩৫ বছর।
অনুবাদকের কথা

দ্বিতীয় উদাহরণটি একটু খেয়াল করে দেখুন। এখানে লক্ষণীয় যে, আয-যুহরী ইমাম মালিকের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন; কারণ আয-যুহরী তাবি’ঈদের অন্তর্ভুক্ত আর ইমাম মালিক তাবি’ তাবি’ঈনদের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আয-যুহরীর ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করা আসলে “বড়দের ছোটদের থেকে বর্ণনা” (রিওয়ায়াতুল আকাবির ‘আনিল আসাগির) এর অন্তর্ভুক্ত; যা আমরা পূর্ববর্তী মাবহাসে পড়েছি।

অন্যদিকে আস-সাহমী ইমাম মালিকের চেয়ে বয়সে ছোট ছিলেন; তদুপরি আস-সাহমী দীর্ঘ আয়ু পেয়েছিলেন; তাঁর বয়স প্রায় ১০০ বছরে পৌঁছেছিল। এই কারণেই তাঁর মৃত্যু ও আয-যুহরীর মৃত্যুর মধ্যে এত বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে।

আরো স্পষ্টভাবে বললে: সাবিক রাবী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি শায়খের শিক্ষক-শ্রেণির, আর লাহিক রাবী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি শায়খের ছাত্র এবং এই ছাত্র দীর্ঘ আয়ু পেয়েছেন।


এটি জানার ফায়দাসমূহ

مِنْ فَوَائِدِهِ

ক. অন্তরে উঁচু ইসনাদের মাধুর্য প্রতিষ্ঠা করা।

খ. যেন লাহিকের (পরের রাবীর) সনদে বিচ্ছিন্নতা (ইনকিতা’) আছে বলে ভ্রম না হয়।

অনুবাদকের কথা

দ্বিতীয় ফায়দাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আস-সাহমী যদি বলেন: “আমি ইমাম মালিক থেকে বর্ণনা করছি”; এবং সাহমী ইন্তিকাল করেছেন ২৫৯ হিজরীতে, আর মালিক ইন্তিকাল করেছেন ১৭৯ হিজরীতে; তাহলে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে সনদে ইনকিতা’ (বিচ্ছিন্নতা) আছে। কারণ সাধারণত একজন ছাত্র তাঁর শায়খের প্রায় ৮০ বছর পরে জীবিত থাকেন না। কিন্তু এই মাবহাসের জ্ঞান থাকলে বোঝা যাবে, এটি ইনকিতা’ নয়; বরং সাহমী দীর্ঘ আয়ু পেয়েছেন বলে এমনটি সম্ভব হয়েছে। সুতরাং এই প্রকার জানা থাকলে সনদের বিশুদ্ধতা নিয়ে ভুল সন্দেহ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।


এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ

أَشْهَرُ المُصَنَّفَاتِ فِيْهِ

আস-সাবিক ওয়াল লাহিক (السَّابِقُ وَاللَّاحِقُ)

খতীব আল-বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ

তথ্যসূত্র ও টীকা

[২২] আত-তাকরীব মা’আত তাদরীব (التَّقْرِيْبُ مَعَ التَّدْرِيْبِ): ২/২৬২।

[২৩] আস-সাররাজ ২১৬ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৩১৩ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। তিনি ৯৭ বছর জীবিত ছিলেন।

[২৪] ইমাম বুখারী ২৫৬ হিজরীতে ইন্তিকাল করেছেন। আবুল হাসান আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ আল-খাফফাফ আন-নায়সাবূরী ৩৯৩ হিজরীতে ইন্তিকাল করেছেন; কেউ বলেন ৩৯৪, কেউ বলেন ৩৯৫ হিজরী।


প্রথম পরিচ্ছেদ সমাপ্ত: সারসংক্ষেপ
الفَصْلُ الأَوَّلُ: لَطَائِفُ الإِسْنَادِ
মাবহাস মূল বিষয়বস্তু
প্রথম মাবহাস
উঁচু ও নিচু ইসনাদ
ইসনাদের গুরুত্ব ও সালাফদের বক্তব্য। ‘উলুও এর ৫ প্রকার (রাসূলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত, ইমাম পর্যন্ত, কিতাবের সাথে সম্পর্কিত ৪ উপ-প্রকার: মুওয়াফাকাহ/বাদাল/মুসাওয়াত/মুসাফাহাহ, রাবীর মৃত্যু আগে, শ্রবণ আগে)। নুযূলের ৫ প্রকার তার বিপরীত। সাধারণত ‘উলুও উত্তম; তবে নুযূলে বিশেষ ফায়দা থাকলে ব্যতিক্রম। সুলাসিয়্যাত গ্রন্থসমূহ।
দ্বিতীয় মাবহাস
আল-মুসালসাল
শিকলের সাদৃশ্যে নামকরণ। ৩ প্রকার: রাবীদের হালাত অনুসারে (মৌখিক, কর্মমূলক, উভয়), রাবীদের সিফাত অনুসারে, রিওয়ায়াতের সিফাত অনুসারে (আদায়ের শব্দ, সময়, স্থান)। মুসালসাল ও সিহহার মধ্যে সম্পর্ক নেই; মুসালসাল সনদ খুব কমই ত্রুটিমুক্ত।
তৃতীয় মাবহাস
বড়দের থেকে ছোটদের বর্ণনা
রাবী বয়সে, তবকায় বা ইলমে শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও নিম্নতর ব্যক্তি থেকে বর্ণনা। ৩ প্রকার। উদাহরণ: মালিক থেকে ‘আব্দুল্লাহ ইবনু দীনার, বারকানী থেকে খতীব আল-বাগদাদী। সনদের উল্টাপাল্টা মনে করার ভুল থেকে রক্ষা।
চতুর্থ মাবহাস
পিতাদের পুত্রদের থেকে বর্ণনা
আল-‘আব্বাস ইবনু ‘আব্দিল মুত্তালিবের তাঁর পুত্র ফাদল থেকে মুযদালিফার সালাতের হাদীস। আলিমদের বিনয়ের প্রমাণ।
পঞ্চম মাবহাস
পুত্রদের পিতাদের থেকে বর্ণনা
২ প্রকার: শুধু পিতা থেকে (আবুল ‘উশারা), এবং পিতা থেকে দাদা থেকে (‘আমর ইবনু শু’আইবের বিখ্যাত সনদ; যেখানে “দাদা” বলতে ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে বোঝায়)।
ষষ্ঠ মাবহাস
মুদাব্বাজ ও আকরানের বর্ণনা
আকরান: সমসাময়িক রাবীগণ। রিওয়ায়াতুল আকরান একমুখী, মুদাব্বাজ দ্বিমুখী। উদাহরণ: ‘আইশাহ ও আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা, যুহরী ও ‘উমার ইবনু ‘আব্দিল ‘আযীয, মালিক ও আওযা’ঈ। সনদে বাড়তি রাবী মনে করার ভুল থেকে রক্ষা।
সপ্তম মাবহাস
আস-সাবিক ও আল-লাহিক
একই শায়খ থেকে দুই রাবীর বর্ণনা; তাঁদের মৃত্যুর মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান (১০০+ বছর)। উদাহরণ: আস-সাররাজ (শায়খ) থেকে বুখারী ও খাফফাফ (১৩৭ বছর ব্যবধান); মালিক (শায়খ) থেকে যুহরী ও সাহমী (১৩৫ বছর ব্যবধান)। লাহিকের সনদে ইনকিতা’ মনে করার ভুল থেকে রক্ষা।

Discover more from Debunking Misguidance

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *